সম্পাদকীয়/ নদী ও জলাশয় রক্ষায় চাই কঠোর পদক্ষেপ
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে দুটি সাম্প্রতিক ঘটনায়। একদিকে সদর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত বেতনা নদীতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খননকাজ চালানোর পর পলি জমে নাব্যতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বেআইনি আড় জালের জন্য। অন্যদিকে শ্যামনগরের অন্তাখালী খালে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয়েছে ক্ষতিকর চায়না দুয়ারী ও বুলেট নেট জাল, যা পরে জনসম্মুখে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ঘটনা দুটি ভিন্ন উপজেলার হলেও তাদের মূল সংকট অভিন্নÑআইন অমান্য করে ক্ষতিকর জালের অবাধ ব্যবহার এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস সাধন।
বেতনা নদী সাতক্ষীরা অঞ্চলের নিষ্কাশন ব্যবস্থার অন্যতম মূল ধমনি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নদীটি খনন করার মূল উদ্দেশ্য ছিল জোয়ার-ভাটা স্বাভাবিক রাখা এবং এলাকাকে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করা। কিন্তু সদর উপজেলার বিনেরপোতা, শাল্যে, মাছখোলা ও কামারডাঙ্গা এলাকায় নদীর এক তীর থেকে অন্য তীর পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে আড় জাল পেতে রাখা হচ্ছে। এর ফলে পানির গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দ্রুত পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই প্রবণতা রোধ করা না গেলে স্লুইসগেট দিয়ে বিলের পানি নদীতে নিষ্কাশিত হতে পারবে না, যার খেসারত দিতে হবে পুরো সাতক্ষীরা অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে।
অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ফাঁসের চায়না দুয়ারী কিংবা বুলেট জালের মতো প্রাণঘাতী জালের সয়লাব দেশের মৎস্য সম্পদের জন্য এক নীরব মহামারি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কেবল বড় মাছই ধরা পড়ে না, রেনু পোনা থেকে শুরু করে জলজ সব কীটপতঙ্গ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যায়। শ্যামনগরে মৎস্য বিভাগের অভিযানে এই ক্ষতিকর জাল জব্দ ও ধ্বংস করার ঘটনা ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। কিন্তু সাময়িক অভিযান চালিয়ে এমন ভয়াবহ প্রবণতা স্থায়ীভাবে থামানো কঠিন।
নদী বা খাল পুনঃখননে যে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় হয়, অসচেতনতা ও গুটিকয়েক সুযোগসন্ধানী লোকের প্রভাবে যদি তার সুফল নষ্ট হয়, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে কেবল প্রথাগত অভিযানে সীমাবদ্ধ না থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। সেগুলো হলোÑ বেতনা নদীসহ স্পর্শকাতর নদ-নদীগুলোতে নিয়মিত তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের টহল জোরদার করতে হবে। নদীতে অবৈধভাবে জাল স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ক্ষতিকর চায়না দুয়ারী বা অন্যান্য নিষিদ্ধ জাল বাজারে বেচাকেনা ও প্রস্তুত বন্ধে এর উৎসমুখ ও কারখানাগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নদী রক্ষা ও মাছের প্রজনন সুরক্ষায় ইউপি সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা বাড়িয়ে পাহারাদার কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং দেশীয় মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করে নদী ও জলাশয়গুলোকে দখল ও ক্ষতিকর ফাঁদের হাত থেকে মুক্ত রাখা এখনই সময়ের বড় দাবি।












