মুক্তমত/ দলের ঊর্ধ্বে দেশ: পদ নয় অপরাধের লাইসেন্স
এম.এম হায়দার আলী
রাজনীতিতে ক্ষমতা আসে, ক্ষমতা যায়। পদ আসে, পদও একদিন চলে যায়। কিন্তু মানুষের কাছে একটি রাজনৈতিক দলের যে দায়, তার মেয়াদ কোনো নির্বাচনী সময় সূচিতে বাঁধা নয়। সেই দায়ের নাম জবাবদিহি। আর সেই জবাবদিহি যখন নিজের দলের মানুষটির ক্ষেত্রেও সমান ভাবে কার্যকর হয়, তখন রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটি কিছুটা হলেও শক্ত হয়।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ঘটনার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আইনগত তদন্তও চলছে। কিন্তু এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গত ১ অক্টোবর তার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা সামনে এনেছে।
বার্তাটি হলো, দলের পরিচয় কারও জন্য দায়মুক্তির ঢাল হতে পারে না। এখানেই রাজনীতির আসল পরীক্ষা। কারণ নিজের দলের মানুষকে শাসন করা সহজ নয়। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক সুবিধা থাকে, কিন্তু নিজের দলের জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের ঘরকেই প্রশ্ন করা। সেই জায়গায় নেতৃত্বের দৃঢ়তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি পরীক্ষা। রাড্ডার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের বিষয়টিই সামনে আসেনি।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ও যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন নেতা-কর্মীকে বহিষ্কারের কথাও এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আইন। কিন্তু সাংগঠনিক পর্যায়ে যে বার্তা সামনে এসেছে, সেটি স্পষ্ট, পদ-পদবি মানেই অপরাধের লাইসেন্স নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বার্তাটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের দূরত্ব তৈরি হয় তখনই, যখন দলের নাম ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
চাঁদাবাজি, দখল, ভয়ভীতি, নৈরাজ্য কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি। একজন কর্মীর অন্যায়ের দায় অবশ্যই পুরো দলের ওপর চাপানো যায় না। কিন্তু দলের নাম, পদ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে দল যদি দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যায়, অন্যায় করলে পরিচয় রক্ষা করবে না। এখানে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণা কিংবা সংবাদে প্রকাশিত কোনো তথ্য, কোনোটিই আদালতের রায়ের বিকল্প নয়। তদন্তের নিরপেক্ষতা, প্রমাণের মূল্য এবং আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই শেষ কথা। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোগ উঠলে তদন্ত না করে বসে থাকাও সমাধান নয়। অভিযোগের তদন্ত হবে, সত্য-মিথ্যা যাচাই হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা হবে, এই তিনটি ধাপই একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। আজ দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় বাস্তব আচরণ। তারা দেখতে চায়, ক্ষমতায় থাকা মানুষটির জন্য যে আইন, সাধারণ মানুষের জন্যও সেই আইন। তারা দেখতে চায়, দলের পতাকা কারও অন্যায়ের আড়াল নয়। রাজনীতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই, ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না; মানুষের প্রতি দায়িত্বই একজন রাজনীতিককে বড় করে।
যে নেতা নিজের দলের অন্যায়কে অন্যায় বলতে পারেন, তার কাছেই সাধারণ মানুষ জবাবদিহির আশা করতে পারে। আর যে সংগঠন নিজের ঘরের অনিয়মকে আড়াল না করে তদন্ত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি করে, সেই সংগঠনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। আজ যদি দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো সাধারণ মানুষের জমি দখল করে, কাল কেউ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে, অন্য কেউ ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সরকারি সম্পদে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কারণ রাজনৈতিক দল জনগণের জন্য, জনগণ কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
ক্ষমতার রাজনীতিতে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ ছাড়। একবার ছাড় দেওয়া হলে দ্বিতীয়বার অন্যায় করার সাহস বাড়ে। তৃতীয়বার সেটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। আর এক সময় মানুষ ধরে নেয়, রাজনীতির ছায়ায় থাকলে আইনকে পাশ কাটানো যায়। এই ধারণাটিই ভাঙতে হবে। প্রয়োজনে নিজের দলের এমপি, চেয়ারম্যান, নেতা কিংবা কর্মী, যেই হোক, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হতে হবে। সত্য প্রমাণিত হলে আইন ও সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকেও সম্মানের সঙ্গে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটাই ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য। একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু তার জনসমর্থনে নয়; তার আত্মশুদ্ধির ক্ষমতার মধ্যেও। ভুল হলে ভুল স্বীকার করা, অন্যায় হলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিজের মানুষকেও জবাবদিহির আওতায় আনা, এসবই রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ।
আজ দেশের মানুষ এমন রাজনীতি দেখতে চায়, যেখানে দল ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, মানুষের সেবার প্রতিষ্ঠান; যেখানে পদ মর্যাদার অলংকার নয়, দায়িত্বের প্রতীক; যেখানে দলীয় পরিচয় নিরাপত্তার দেয়াল নয়, বরং আরও বড় জবাবদিহির কারণ। তারেক রহমানের নির্দেশে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ এবং রাড্ডার ঘটনাকে ঘিরে সাংগঠনিক ব্যবস্থাগুলো সেই বৃহত্তর আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। এসব পদক্ষেপের আইনগত ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন অবশ্যই সময় ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। তবে নীতিগত ভাবে একটি কথা পরিষ্কার, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের ওপরে কোনো দল, কোনো পদ, কোনো ব্যক্তি থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার চেয়ারটি কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।
আজ যে চেয়ারকে ঘিরে এত আলো, কাল সেখানে অন্য কেউ বসবেন। কিন্তু মানুষের মনে একজন রাজনীতিকের যে পরিচয়টি থেকে যায়, তা হলো, তিনি ক্ষমতার সময়ে কেমন আচরণ করেছিলেন। তাই সময়ের দাবি একটাই, দলের আগে দেশ, পদের আগে দায়িত্ব, পরিচয়ের আগে আইন। রাজনীতির এই তিনটি শব্দ যদি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা পায়, তবে ক্ষমতার চেহারা বদলাবে না শুধু, বদলাবে মানুষের রাজনীতির প্রতি আস্থার ভাষাটাও। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর এমন মহতী ও জনকল্যাণ মুখী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। মানুষের কল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যখন মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন তা শুধু একটি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এমন জনবান্ধব উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট









