মুক্তমত/ সাম্প্রতিক দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
আজহারুল ইসলাম সাদী
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আগের বছরের তুলনায় কিছুটা দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার, তবে সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়েছে।
সরকারি তথ্য ও চিত্র অনুযায়ীÑ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২,৬০৭টি খুনের ঘটনা ঘটলেও, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২,৩৩২টিতে। এ সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১১,২৬৯টি থেকে কমে ৯,৩৪৫টিতে এসেছে। ধর্ষণ মামলা ৪,৬৬৬টি থেকে কমে ৪,৪৭২টিতে দাঁড়িয়েছে। দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টিতে নেমে এসেছে। লুট হওয়া অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি, পুলিশের ওপর হামলা এবং রাজনৈতিক চাপে পুলিশ বাহিনী এখনো সম্পূর্ণভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মব জাস্টিস বা দলবদ্ধ হামলা পুরোপুরি থামেনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে কর্মসূচি পালন করছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নত করতে এবং মাঠপর্যায়ে আস্থা ফেরাতে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ দিকনির্দেশনা ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা ‘নিয়ন্ত্রণে আছে, অবনতি হয়নি’ বলা হলেও এখনো উদ্বেগ কেন?
ছিনতাই, চাঁদাবাজির খবর প্রায় প্রতিদিনই অনলাইনসহ পত্রিকার পাতায় উঠে আসে। দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটি। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি আরো উন্নত করতে এরকম বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটি।
বর্তমান সময়ে সাতক্ষীরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তৎপর রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে অপরাধমূলক কর্মকা-, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং আলোচিত কিছু মামলা নিয়ে জনমনে আলোচনা রয়েছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরায় জেলা জজ আদালতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মাদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরায় মারামারি ঠেকাতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে জাকারিয়া খান নামের এক কলেজছাত্র নিহত হন। এ ঘটনায় প্রধান আসামি নাহিদসহ চার জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই হত্যাকা-টি জেলায় কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঢাকা আদালতে তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে। এছাড়া জুলাই ২০২৬-এ সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলামকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সাতক্ষীরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন সমাজের মধ্যে তীব্র দ্বিমত ও সচেতন মহলের সমালোচনা বিদ্যমান। একদিকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ বিভিন্ন সমন্বয় সভার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি করছে, অন্যদিকে সচেতন নাগরিক সমাজ অপরাধের ধরন পরিবর্তন, মাদক ও সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
এই দুই পক্ষের অবস্থান এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. সচেতন সমাজের প্রধান সমালোচনা ও উদ্বেগ: সাতক্ষীরার সুশীল সমাজ, সাংবাদিক এবং সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে: স্থানীয় সচেতন মহলের বড় অভিযোগ হলো সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বা প্রভাবশালীদের নামে অবাধে চাঁদাবাজি চলছে। এটি সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তি তৈরি করছে।
সীমান্ত জেলা হওয়ায় সাতক্ষীরায় মাদক চোরাচালান ও স্থানীয় পর্যায়ে যুবসমাজের মধ্যে মাদকের বিস্তার নিয়ে সচেতন সমাজ ক্রমাগত সমালোচনা করে আসছে। তারা মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পদক্ষেপ এখনো শতভাগ কার্যকর নয়।
সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র: সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ছিনতাই এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে নাগরিক সমাজ অভিযোগ তুলছে। শহরের অভ্যন্তরে লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল এবং অনিয়ন্ত্রিত ইজিবাইক চলাচলের কারণে সৃষ্ট তীব্র যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সচেতন সমাজ সমালোচনা মুখর।
২. প্রশাসনের বক্তব্য ও গৃহীত পদক্ষেপ: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসন সচেতন সমাজের এই সমালোচনা ও দাবিগুলোকে আমলে নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানাচ্ছে।
মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা: জেলার আইন প্রণেতা (এমপি), পুলিশ সুপার এবং সিভিল সার্জনদের উপস্থিতিতে নিয়মিত সমন্বয় সভা করা হচ্ছে। এসব সভায় সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাত্রিকালীন বিশেষ মহড়া এবং মাদকবিরোধী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। লেকভিউ রিসোর্ট এলাকা সহ বিভিন্ন স্পট থেকে চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা চলছে বলে জেলা পুলিশ দাবি করছে। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট












