শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

ম্যানগ্রোভ ইকো ট্যুরিজম ও সাতক্ষীরার যুবসমাজের অর্থনৈতিক মুক্তি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ণ
ম্যানগ্রোভ ইকো ট্যুরিজম ও সাতক্ষীরার যুবসমাজের অর্থনৈতিক মুক্তি

মো. মামুন হাসান
সাতক্ষীরা আজ কেবল একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক অনন্য এবং অফুরন্ত অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রবেশদ্বার। পৃথিবীর একক বৃহত্তম ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পশ্চিম তোরণ হওয়ার সুবাদে এই অঞ্চলের যে বৈশ্বিক পরিচিতি রয়েছে, তাকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার মাহেন্দ্রক্ষণ এখনই। প্রথাগত পর্যটনের সীমাবদ্ধতা ভেঙে প্রকৃতি, মানুষ, সংস্কৃতি এবং আধুনিক অর্থনৈতিক দর্শনের যে অপূর্ব মেলবন্ধন এখানে সম্ভব, তা বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে সাতক্ষীরাকে একটি শীর্ষস্থানীয় ও অত্যন্ত লাভজনক গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বর্তমান বিশ্বের সচেতন পর্যটকেরা এখন আর যান্ত্রিক বিলাসবহুল হোটেলের চার দেয়ালে বন্দী থাকতে চান না; তারা খুঁজছেন প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য, শেকড়ের অভিজ্ঞতা এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার সক্রিয় অংশীদারিত্ব। এই বৈস্ময়কর বৈশ্বিক চাহিদার সবচেয়ে সময়োপযোগী, পরিবেশবান্ধব ও বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় রূপ হলো ইকো ট্যুরিজম এবং কমিউনিটি ভিত্তিক হোমস্টে পর্যটন। কোস্টা রিকা, নেপাল, ভূটান ও থাইল্যান্ডের মতো সফল রাষ্ট্রগুলো বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, পর্যটন তখনই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই এবং সবচেয়ে বেশি লাভজনক হয়, যখন স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে সরাসরি সাধারণ মানুষকে এর অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা যায়।
এই প্রগতিশীল বৈশ্বিক বাস্তবতাকে ধারণ করে সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত উপকূলে একটি যুগান্তকারী অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেছে স্থানীয় তরুণদের নিজস্ব মেধা ও শ্রমে গড়ে ওঠা ‘ট্যুরিজম’। এটি কেবল একটি প্রথাবদ্ধ ট্যুর গাইড সেবা নয়, এটি আসলে তৃণমূলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি শক্তিশালী গ্রিন ফিল্ড মডেল। এই দর্শনের মূল সৌন্দর্য হলো, এখানে পর্যটকদের শুধু সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখিয়ে বিদায় করা হয় না, বরং তাদের নদী, ম্যানগ্রোভের জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামের জীবন্ত অংশ করে তোলা হয়। ‘র ট্যুরিজম’ পর্যটকদের সরাসরি নিয়ে যায় জেলেদের পাড়ায়, উত্তাল নদীপথে, গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী বাজারে এবং সরাসরি উপকূলীয় হেঁশেলে। এই মডেলটি একটি যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সত্য উন্মোচন করেছে যে, পর্যটনের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা যদি সরাসরি স্থানীয় মানুষের হাতে থাকে, তবে পর্যটন খাতের আয় শহরের বড় বহুজাতিক সিন্ডিকেট বা বিলাসবহুল রিসোর্টের পকেটে না গিয়ে সরাসরি প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায়। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতির মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট বা আবর্তনের হার বহুগুণ বেড়ে যায় এবং প্রতিটি টাকা সরাসরি গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
এই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে যদি সুন্দরবন সংলগ্ন প্রতিটি গ্রামকে পরিকল্পিত উপায়ে পরিবেশবান্ধব হোমস্টে ইকো ইউনিটে রূপান্তর করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ টেকসই অর্থনৈতিক মডেলে পরিণত হবে। পর্যটকেরা যখন শহরের যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে মাটির তৈরি বা পরিবেশবান্ধব কাঠের কুটিরে থাকবেন, স্থানীয় বিশুদ্ধ উপাদান দিয়ে তৈরি খাবার খাবেন এবং মানুষের সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেবেন, তখন পর্যটন একটি সম্পূর্ণ নতুন জীবন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এই হোমস্টে মডেলটিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে প্রতিটি বাড়িকে সুনির্দিষ্ট থিমে সজ্জিত করা সম্ভব। যেমন জেলে জীবনভিত্তিক হোমস্টে যেখানে পর্যটক মাছ ধরার বাস্তব কৌশল শিখবেন; মৌয়াল জীবনভিত্তিক হোমস্টে যেখানে সুন্দরবনের খাঁটি মধু সংগ্রহের রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও প্রক্রিয়া জানা যাবে; কিংবা কৃষিভিত্তিক হোমস্টে যেখানে পর্যটকেরা সরাসরি মাঠে কৃষিকাজে অংশ নেবেন। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক দিক হলো স্থানীয় নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কিচেন ট্যুরিজমের বিকাশ। উপকূলীয় নারীরা তাদের সনাতনী রন্ধনশিল্পের মাধ্যমে পর্যটকদের আতিথেয়তা প্রদান করে সরাসরি আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি তাদের তৈরি বিখ্যাত নকশিকাঁথা, মাটির নান্দনিক সামগ্রী, গোলপাতার হস্তশিল্প, খাঁটি সুন্দরবনের মধু এবং ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মাছ সরাসরি চড়া দামে পর্যটকদের কাছে বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। এটি গ্রামীণ নারীদের ঘরের ভেতর থেকেই স্বাধীন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত করবে, যা গ্রামীণ নারী ও শিশু স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার উন্নয়নে এক অভূতপূর্ব সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
অর্থনৈতিক লাভজনকতাকে প্রিমিয়াম স্তরে নিয়ে যেতে রাতভিত্তিক এক্সপেরিয়েন্স ইকো ট্যুরিজম এবং অ্যাডভেঞ্চার প্যাকেজ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সুন্দরবনের শান্ত নদী ও খালের বুকে জোসনা রাতে কাঠের নৌকায় ঐতিহ্যবাহী নৌভ্রমণ, সম্পূর্ণ ওজোনস্তর ও ধূলিকণামুক্ত আকাশের নিচে তারা পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় উপাদান দিয়ে তৈরি ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের মতো বিশেষ প্যাকেজগুলো উচ্চবিত্ত দেশি এবং বিদেশি ইকো ট্যুরিস্টদের বিপুলভাবে আকর্ষণ করবে। এই ধরনের উচ্চ মূল্যের সেবা থেকে অত্যন্ত স্বল্প পরিচালন খরচে বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এর সঙ্গে সুন্দরবনের নদী ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ শব্দ ও ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বোট ট্যুরিজম এবং বনের প্রান্ত ঘেঁষে সুন্দরবন সাইকেল ট্রেইল চালু করা গেলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ আয়কারী ইকো ট্যুরিজম পণ্য হিসেবে বিকশিত হবে। ফিশারম্যান ফর এ ডে কিংবা মধু সংগ্রহ অভিজ্ঞতা ট্যুরের মতো রোমাঞ্চকর ইকো অ্যাডভেঞ্চারের জন্য আধুনিক পর্যটকেরা চড়া মূল্য দিতে সদা প্রস্তুত থাকেন, যার শতভাগ সরাসরি প্রান্তিক জেলে, মৌয়াল ও গাইডদের ঘরে পৌঁছাবে।
এই ত্রিমাত্রিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় সামাজিক সুফল আসবে যুবসমাজের ব্যাপক কর্মসংস্থান ও মেধা পাচার রোধের মাধ্যমে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা এই উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষিত ও আধা শিক্ষিত তরুণরা আর শুধুমাত্র গতানুগতিক চাকরির আশায় দিন না গুনে হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ ইকো গাইড, ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর, হোমস্টে ম্যানেজার, ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার এবং সফল পর্যটন উদ্যোক্তা। সাতক্ষীরাকে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ প্লাস্টিকমুক্ত পরিকল্পিত ম্যানগ্রোভ হোমস্টে জোন হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও আতিথেয়তার মানদ- পূরণ করবে। সারা বছর এই লাভজনক ধারা সচল রাখতে পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ইকো ফটোগ্রাফি ক্যাম্প, ম্যানগ্রোভ জীববৈচিত্র্য শিক্ষাসফর এবং বার্ষিক সুন্দরবন উৎসবের মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যা অফ সিজন বা মন্দা মৌসুমেও স্থানীয় অর্থনীতিকে সমভাবে সচল ও চাঙ্গা রাখবে।
তবে এই অপরিসীম অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাবনাকে একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে হলে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। জেলা প্রশাসনের দূরদর্শী নেতৃত্বে বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাতক্ষীরা কমিউনিটি ট্যুরিজম কাউন্সিল গঠন করা প্রয়োজন। এই কাউন্সিল ডিজিটাল সেন্ট্রালাইজড বুকিং অ্যাপ, পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব নৌযানের লাইসেন্স প্রদান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও জামানতবিহীন সবুজ ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল চালিকাশক্তি তথা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মতো বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি কমিউনিটি গাইডেন্স, খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে নিয়মিত পেশাদার সার্টিফিকেট কোর্স চালু করে স্থানীয় যুবসমাজকে বিশ্বমানের পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মডেলটিতে অর্থনৈতিক লাভ যত বেশি হবে, সুন্দরবনের পরিবেশগত সুরক্ষাও তত বেশি জোরদার হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা এই অঞ্চলে রেসপন্সিবল ট্যুরিজম বা দায়িত্বশীল পর্যটন নীতিমালার অধীনে প্রতিটি পর্যটকের মাধ্যমে একটি করে ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ, প্লাস্টিক বর্জন এবং স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণ ও কমিউনিটি ফান্ডে বাধ্যতামূলক প্রতীকী অনুদানের ব্যবস্থা থাকবে। এর ফলে পর্যটকেরা কেবল প্রকৃতির ভোক্তা হবেন না, বরং তারা সুন্দরবন রক্ষার সক্রিয় অর্থায়নকারীতে পরিণত হবেন। স্থানীয় মানুষ যখন বুঝতে পারবেন যে সুন্দরবন অক্ষুণ্ন ও জীবন্ত থাকলে তাদের অর্থনৈতিক আয় এবং সামাজিক মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তখন তারা নিজেরাই বন ও বন্যপ্রাণী নিধনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবেন। প্রতি বছর সেরা ইকো উদ্যোক্তা, সেরা নারী উদ্যোক্তা ও সেরা পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে সাতক্ষীরা ইকো ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড প্রদানের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা যাবে।
পরিশেষে দৃঢ়ভাবে বলা যায়, একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ক্ষতিকারক ভারী শিল্পকারখানাই কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র পথ হতে পারে না। জ্ঞান, সংস্কৃতি, পরিবেশ রক্ষা এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশীদারিত্বের মাধ্যমে গড়ে ওঠা গ্রিন ইকোনমি বা সবুজ অর্থনীতিই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। সাতক্ষীরার প্রকৃত উন্নয়ন ও টেকসই সমৃদ্ধি কোনো পরিবেশ বিধ্বংসী শিল্পায়নে নয়, বরং সুন্দরবনের ছায়ায় গড়ে ওঠা এই মানবিক, সামাজিক ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক ইকো ও কমিউনিটি ট্যুরিজমের মধ্যেই নিহিত। এখন প্রয়োজন শুধু রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা, কার্যকর সরকারি বেসরকারি সমন্বিত বিনিয়োগ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আজ সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে আগামী দিনের সাতক্ষীরা শুধু সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র বাংলাদেশের বুকে জলবায়ু সহনশীল টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

 

Ads small one

সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: আশাশুনির ‘সাতপোয়া’ ও ‘পাঙ্গাসমারি’ খাল খনন প্রকল্প

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১:২২ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: আশাশুনির ‘সাতপোয়া’ ও ‘পাঙ্গাসমারি’ খাল খনন প্রকল্প

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নে সরকারি অর্থ ব্যয়ে ‘সাতপোয়া’ ও ‘পাঙ্গাসমারি’ খাল খনন প্রকল্পে যে ধরনের অনিয়ম, জবরদখল ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে, তা জনমনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। জনস্বার্থে গৃহীত একটি সরকারি প্রকল্প কীভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে, বড়দলের ঘটনা তারই এক নিকৃষ্ট উদাহরণ।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খালের খননকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় সেখানে আড়াআড়িভাবে নেট-পাটা (বাঁশের বেড়া ও জাল) দিয়ে মাছ চাষের পাঁয়তারা চলছে। এর ফলে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা খালের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সরকারি খাস জমি পুনরুদ্ধার না করে এবং খাস খালের ওপর থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খালের মাটি সরকারি জমিতে ফেলার নিয়ম থাকলেও, প্রভাবশালীদের সুবিধা দিতে সাধারণ মানুষের ভোগদখলীয় ও রেকর্ডীয় ফসলি জমি এবং বসতবাড়ির ওপর ইচ্ছেমতো মাটির স্তূপ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।
যেকোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মূল শর্ত হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। অথচ বড়দলের এই প্রকল্পে খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা গভীরতা কত—তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা খোদ জনপ্রতিনিধিদের জানানো হয়নি। প্রকল্পের বিবরণী বা সিডিউল দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে দেওয়ার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ গোপনে, নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দায়সারাভাবে কাজ শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরাও এই অনিয়ম ও জবরদখলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
খাল খনন করার মূল উদ্দেশ্য হলো জলাবদ্ধতা দূর করা, কৃষি কাজের সুবিধা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা। কিন্তু বড়দলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি বরাদ্দের টাকার অপচয় ও সাধারণ মানুষের জমি জবরদখলের এক ‘হরিলুট’ চলছে। আমরা মনে করি, এই অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে খালের নেট-পাটা উচ্ছেদ করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের রেকর্ডীয় জমি থেকে অবৈধভাবে ফেলা মাটি অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের জরুরি ও আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

আষাঢ়ের সজল আবহে সাতক্ষীরায় রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১:২০ পূর্বাহ্ণ
আষাঢ়ের সজল আবহে সাতক্ষীরায় রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ

পত্রদূত ডেস্ক: আষাঢ়ের সজল বিকেল। প্রকৃতির ক্যানভাসে তখন মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি। এমন এক বর্ষণমুখর মায়াবী আবহে বাংলা সাহিত্যের দুই ধ্রুবতারাÑরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সুর আর বাণীতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন।
শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল সাড়ে চারটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত অগ্নিবীণা সাতক্ষীরা জেলা সংসদের আয়োজনে উদ্যাপিত হয় এই রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী। সাহিত্য আলোচনা, কবিতা আবৃত্তি আর বর্ষার সজল হাওয়ার সঙ্গে বরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীতের মূর্ছনায় মেতে ওঠেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে অনুষ্ঠানে ‘ধূমকেতু’ প্রকাশনার রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী বিশেষ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নয়, তাঁরা বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। নিজেদের অসামান্য মেধা ও সৃষ্টিকে তাঁরা অকাতরে বিলিয়ে গেছেন মানুষের কল্যাণে। অথচ বর্তমান সময়ে অনেক বুদ্ধিজীবীকে এই দুই মহান স্রষ্টাকে সাম্প্রদায়িকতার সংকীর্ণ গ-িতে আটকে রাখার অপচেষ্টা করতে দেখা যায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিল্পের কোনো বিভেদ নেই, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতার মুক্তিতে এই দুই কবির সৃষ্টিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কবি সৌহার্দ্য সিরাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক ড. শাহেদ মন্তাজ। অগ্নিবীণা সাতক্ষীরা জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব সবুজের সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে নজরুলের জীবন ও কর্মের ওপর মুখ্য আলোচকের বক্তব্য দেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. জাকির হোসেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আলোচনা করেন সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ বাসুদেব বসু, অধ্যাপক আব্দুল হামিদ, জেলা কালচারাল অফিসার ফাইজা হোসেন অন্বেষা, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কাশেম এবং অগ্নিবীণা জেলা সংসদের সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ সরকার। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করেন কবি ও প্রাবন্ধিক শুভ্র আহমেদ।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কিশোরী মোহন সরকার, কবি শহীদুর রহমান এবং দেবহাটার ফেয়ার মিশনের পরিচালক আব্দুল কাদের মহিউদ্দিন।
মননশীল আলোচনা পর্বের পর শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। আষাঢ়ের মেঘমন্দ্রিত সন্ধ্যায় গুণী কণ্ঠশিল্পীদের পরিবেশনায় রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীতের সুধায় সিক্ত হন উপস্থিত সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমীরা। রাত দশটা পর্যন্ত চলা এই আয়োজন যেন বর্ষার স্নিগ্ধ প্রকৃতি আর সাহিত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছিল।

ইজারাপ্রাপ্ত জলমহাল লুটপাটের অভিযোগে আশাশুনিতে সংবাদ সম্মেলন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ
ইজারাপ্রাপ্ত জলমহাল লুটপাটের অভিযোগে আশাশুনিতে সংবাদ সম্মেলন

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনিতে সরকারি ইজারাপ্রাপ্ত ‘একসরা খাল’ জলমহাল ভোগদখলে বাধা প্রদান, মাছ লুট ও নেট-পাটা কেটে দেওয়ার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৪ জুলাই) সন্ধ্যায় আশাশুনি প্রেসক্লাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ওই জলমহালের তত্ত্বাবধায়ক (কেয়ারটেকার) এবং আনুলিয়া ইউনিয়নের উত্তর একসরা গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহিনুর রহমান।
লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, গত ৯ এপ্রিল আনুলিয়া ইউনিয়নের একসরা মৌজার ১১ দশমিক ৮৬ একরের জলমহালটি সরকারি ইজারা পরিশোধ সাপেক্ষে ১৪৩৩-৩৫ বাংলা সন পর্যন্ত ‘মহিষাডাঙ্গা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি’র অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়। গত ১০ মে সমিতি তাঁকে এই জলমহালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর পর থেকে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে এটি ভোগদখল করে আসছিলেন। কিন্তু আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. রুহুল কুদ্দুস ও তাঁর অনুসারীরা জলমহালটি থেকে তাঁদের তাড়িয়ে দিতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেন।
শাহিনুর রহমান অভিযোগ করেন, গত ২ জুলাই বেলা ১১টার দিকে ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে তাঁর অনুসারীরা জলমহালের নেট-পাটা কেটে দেয়। এতে ঘেরে থাকা বাগদা, গলদা, হরিনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৬ লাখ টাকার মাছ নদীতে ভেসে যায়। এর পরও ক্ষান্ত না হয়ে তারা খ্যাপলা ও টানা জাল দিয়ে আরও প্রায় ১ লাখ টাকার মাছ লুট করে নিয়ে যায়। বর্তমানে তারা স্লুইসগেটে জাল পেতে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ৫ আগস্টের পর থেকে ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস এলাকার একাধিক মৎস্যঘের ও জমি জবরদখল এবং লুটপাট চালিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি ইজারাপ্রাপ্ত জলমহালটিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ এবং ক্ষয়ক্ষতির বিচারে প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।