রাস্তায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে কোরবানির চামড়া
কোরবানির ঈদ এলেই দেশের এতিমখানা, মাদ্রাসা ও দরিদ্র মানুষের জন্য বড় একটি আশার নাম পশুর চামড়া। একসময় কোরবানির চামড়া ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু গত কয়েক বছরের মতো এবারও সেই চিত্রে ফিরেনি স্বস্তি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবারও কাঁচা চামড়া রাস্তায় পড়ে নষ্ট হতে দেখা গেছে। প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষ।
সরকার চলতি বছর গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বাড়ালেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না বিক্রেতারা। বরং অনেক ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় প্রতি পিসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দাম পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে ছাগলের চামড়া। কোথাও কোথাও মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে ছাগলের চামড়া, আবার অনেক জায়গায় বিনামূল্যেও কেউ নিতে চায়নি।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, কলাবাগান, শ্যামলী, মালিবাগ, মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগ এলাকার বিভিন্ন অস্থায়ী সংগ্রহকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে শত শত কাঁচা চামড়া। পিকআপ, অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশায় করে চামড়া এনে বিক্রির অপেক্ষায় বসে আছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন। মানিকনগর বিশ্বরোড সংলগ্ন এলাকায় মসজিদের সামনে চামড়া পড়ে রয়েছে। শুধু মানিক নগর এলাকায়, বিভিন্ন এলাকায় চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। জানা গেছে, ট্যানারি মালিকরা চামড়ার দাম কম বলার কারণে বিনা পয়সায় সংগ্রহ করা চামড়া সাভার নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
বলিয়ারপুর এলাকা থেকে ৩০ পিস চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী পরেশ বলেন, “৭০০ টাকা দরে যে চামড়া কিনেছি, আড়তে এসে সেই চামড়ার দাম বলছে ৬০০ টাকা। লাভ তো দূরে থাক, গাড়ি ভাড়াই পকেট থেকে যাবে।”
সাভারের একটি ডেইরি ফার্ম থেকে চামড়া কিনে সায়েন্সল্যাবে আসা রতন ব্যাপারি ও মোহাম্মদ রাসেল জানান, তারা প্রতিটি চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে কিনেছিলেন। কিন্তু বাজারে এসে ৫০০ টাকার বেশি দাম পাচ্ছেন না। রতন ব্যাপারি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলছে। আমরা ৭০০ টাকা পর্যন্ত দরে কিনে এনেছি, এখন ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে বলছে।”
একই অভিযোগ করেন মিজানুর রহমান। তার ভাষায়, “প্রায় ৪ লাখ টাকার চামড়া এনেছি। কিন্তু সবাই একই দাম বলছে। বাজারে প্রতিযোগিতা নেই।”
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কাঁচা চামড়ার দাম আরও পড়ে যায়। কারণ কাঁচা চামড়া দ্রুত সংরক্ষণ না করলে তা নষ্ট হতে শুরু করে। ফলে বিক্রেতারা শেষ পর্যন্ত কম দামেই চামড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
সায়েন্সল্যাব এলাকায় বিকেল ৫টার পর কিছু চামড়া প্রতি পিস মাত্র সাড়ে ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। হাতিরপুল এলাকার একটি মাদ্রাসার দুই ছাত্র ১০টি গরুর চামড়া ওই দামে বিক্রি করেন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “সকালে কোরবানি দেওয়া পশুর চামড়া সন্ধ্যার পর থেকেই নষ্ট হতে শুরু করে। ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে গুণগত মান কমে যায় এবং দামও কমে যায়।”
মাটিতে পুঁতে ফেলার শঙ্কা
২০১৯ সাল থেকে কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি না হওয়া চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। গত বছরও বহু মানুষ চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে চাপা দিয়েছেন। এবারও সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “গত বছর অনেকেই চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। পরে মাটিতে পুঁতে রাখতে হয়েছিল। এবারও দাম খুব কম। বিক্রি না হলে আবারও পুঁতে রাখতে হবে।”
খুলনায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। শের-ই-বাংলা রোড এলাকায় বড় গরুর কাঁচা চামড়া ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং ছোট গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। রাস্তার ওপর ধুলা-ময়লার মধ্যেই চামড়া স্তূপ করে রাখতে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের।
সরকার দাম বাড়ালেও বাস্তবতা ভিন্ন
চলতি বছর সরকার ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। এছাড়া খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ চামড়া বিক্রি হয়েছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই দাম কার্যকর করার কোনও ব্যবস্থা নেই। ট্যানারি মালিকরা কম দাম দিলে বাধ্য হয়ে তারাও কম দামে চামড়া কিনছেন।
মালিবাগ এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কাইয়ুম বলেন, “ট্যানারি মালিকরা আগেই বলে দিয়েছেন বেশি দামে চামড়া নেবেন না। তাই আমরা বেশি দামে কিনতে পারছি না।”
ছাগলের চামড়ায় ভয়াবহ সংকট
সবচেয়ে করুণ অবস্থা ছাগলের চামড়ার। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছাগলের চামড়া ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও বিনামূল্যেও নিয়ে যেতে দেখা গেছে।
ধানমন্ডি এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, “ছাগলের চামড়া তো প্রায় কেউ নিতে চাচ্ছে না। অনেকে বিনা টাকায় দিয়ে দিচ্ছেন।” ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংরক্ষণ খরচ ও প্রক্রিয়াজাত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ছাগলের চামড়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন ক্রেতারা।
ট্যানারি মালিকদের যুক্তি
চামড়ার বাজারে মন্দার পেছনে ব্যবসায়িক সংকট, রফতানি আদেশ কমে যাওয়া এবং পুরোনো স্টকের চাপকে দায়ী করছেন ট্যানারি মালিকরা। আজমীর লেদারের মালিক মো. শহিদুল্লাহ বলেন, “আমাদের কারখানায় এখনো ৫০ হাজার পিসের বেশি পুরোনো স্টক পড়ে আছে। ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় অনেকের মূলধন অর্ধেক হয়ে গেছে।”
হেমায়েতপুরের আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আজিজুর রহমান বলেন, “মূল সমস্যা অর্থসংকট। ট্যানারিগুলোর কাছে আমাদের বিপুল টাকা বাকি পড়ে আছে। ব্যাংক ঋণও সহজে পাওয়া যায় না।”
তবে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা দাবি করছেন, গত বছরের তুলনায় দাম কমেনি। বিটিএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, “এ বছর আমি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছি। বাজার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।”
কেন বারবার সংকটে চামড়া খাত?
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের চামড়া খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— ট্যানারিগুলোর অর্থসংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি মূল্য কমে যাওয়া, পরিবেশগত মানদণ্ড ও এলডাব্লিউজি সনদের অভাব,চীনের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে সিন্ডিকেট ও সমন্বয়হীনতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে না পারলে এবং মাঠপর্যায়ে মনিটরিং জোরদার না হলে প্রতিবছর একই সংকট তৈরি হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এতিমখানা, মাদ্রাসা, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও সাধারণ কোরবানিদাতারা।
আশার বদলে হতাশা
একসময় কোরবানির চামড়া ছিল দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বড় সহায়। কিন্তু এখন সেই চামড়াই পরিণত হয়েছে দুর্ভোগে। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা চামড়া, ক্রেতাহীন ছাগলের চামড়া এবং লোকসানে পড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘশ্বাস যেন দেশের চামড়া শিল্পের গভীর সংকটকেই সামনে এনে দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষায়, “সরকার দাম বাড়িয়েছে কাগজে-কলমে, কিন্তু বাস্তবে সেই দামের কোনো অস্তিত্ব নেই।”






