শহীদ স. ম. আলাউদ্দীন: আলোকবর্তিকা ও এক বেদনাকাতর মহাকাব্য
এসএম শহীদুল ইসলাম
যে মাটিতে জন্ম নেয় কালজয়ী মানুষ, সে মাটির বুক চিঁরে কখনো কখনো বয়ে যায় অন্তহীন বেদনার নদী। সাতক্ষীরার রূপালী নদী বেতনা আর সুন্দরবনের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা অবহেলিত জনপদটিকে যিনি নিজের মেধা, শ্রম আর রক্ত দিয়ে তিলোত্তমা করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম. আলাউদ্দীন। তিনি শুধু একটি নাম নন; তিনি ছিলেন একটি মানচিত্র, একটি আন্দোলন এবং সাতক্ষীরার অবরুদ্ধ মানুষের মুক্তির নিশান। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, যে মানুষটি আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ ছিলেন, যাঁর হৃদয় স্পন্দিত হতো দুঃখী-মেহনতী মানুষের জন্য, তাঁরই জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হলো একবিংশ শতাব্দীর ঠিক প্রাক্কালে, ১৯৯৬ সালের এক কালরাত্রিতে। ঘাতকের একটি তাজা বুলেট স্তব্ধ করে দিল সাতক্ষীরার উন্নয়নের মহীরূহকে। আজ ৩০ বছর পরেও তার সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি।
১৯৪৫ সালের ২৯ আগস্ট (বাংলা ১৩৫২ সালের ১৫ ভাদ্র)। সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আলো ছড়িয়ে জন্ম নেন স. ম. আলাউদ্দীন। পিতা মরহুম সৈয়দ আলী সরদার এবং মাতা সখিনা খাতুনের চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ সন্তান।
মেধাবী ও দৃঢ়চেতা আলাউদ্দীনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ১৯৬২ সালে কলারোয়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক (এসএসসি) এবং ১৯৬৪ সালে সাতক্ষীরা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পাস করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি খুলনার ঐতিহ্যবাহী ব্রজলাল (বিএল) কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে সেখান থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে, কর্মব্যস্ততা ও রাজনীতির শত আবর্তের মধ্যেও শিক্ষার প্রতি অনুরাগের কারণে ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর মনের ভেতর এক গভীর মানবিক ও প্রগতিশীল দর্শনের জন্ম দিয়েছিল।
স. ম. আলাউদ্দীনের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য এবং আপসহীন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন; এটাই ছিল তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্রদের এগারো দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৮ সালের গণআন্দোলনে তিনি রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালের প্রথম দিকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তালা-কলারোয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তিনি কিছুকাল জাসদের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও ১৯৮০ সালে পুনরায় তাঁর প্রিয় দল আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে তিনি বহু বছর তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সুনামের সাথে পালন করেন। রাজনীতির এই কণ্টকাকীর্ণ পথে স্বৈরাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘকাল তিনি ঢাকা, খুলনা ও যশোর কারাগারে বন্দি ছিলেন, যেখানে জেলখানার ভেতরেও তিনি বন্দিদের অধিকার আদায়ে অনশন ধর্মঘট করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মার্চে যখন বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন স. ম. আলাউদ্দীন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। অনেক জনপ্রতিনিধি যখন ভারতে আশ্রয় নিয়ে কেবল রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করছিলেন, তখন স. ম. আলাউদ্দীন নিজের জীবনকে বাজি রেখে সরাসরি রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন সশস্ত্র যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।
৯নং সেক্টরের অধীনে তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের দুরূহ কাজটি তিনি নিজ কাঁধে তুলে নেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) এম. এ. জলিল তাঁর বিখ্যাত “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” গ্রন্থে স. ম. আলাউদ্দীনের এই অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশলের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন। স্বাধীনতার জন্য নিজের সর্বস্ব বাজি রাখা এই মানুষটি তৎকালীন যশোর সামরিক আদালতের চোখে ছিলেন এক ‘বিপজ্জনক বিদ্রোহী’। তাঁর অনুপস্থিতিতে সামরিক আদালত তাঁকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদ- দেয় এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা করে। কিন্তু কোনো ভয়ই তাঁকে দেশমাতৃকার মুক্তি অর্জনের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
স্বাধীনতার পর স. ম. আলাউদ্দীন তালার জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে পাটকেলঘাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রচলিত পুঁথিগত শিক্ষা দিয়ে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। তাই তিনি আধুনিক, কর্মমুখী ও আত্মনির্ভরশীল শিক্ষার এক যুগান্তকারী মডেল প্রবর্তন করেন।
১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ” এবং নিজে এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। তাঁর এই শিক্ষা দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল: ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি অষ্টম শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। হাতে-কলমে কৃষি, মৎস্য চাষ, হস্তশিল্প ও ইলেকট্রনিক্স প্রশিক্ষণ দেওয়া। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেরা আয় করবে ও সঞ্চয় করবে, যাতে স্নাতক শেষ করে তারা চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই উদ্যোক্তা হতে পারে।
স. ম. আলাউদ্দীনকে ‘সাতক্ষীরার রূপকার’ বলা মোটেও অতিশয়োক্তি নয়। সাতক্ষীরার অর্থনীতি, ব্যবসা ও অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের পেছনে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তিনি যা ভাবতেন, তা বাস্তবায়ন করে ছাড়তেন।
তিনি সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের কাপাসডাঙ্গায় ‘আলাউদ্দীন ফুডস্ এন্ড কেমিক্যাল’ নামে একটি আধুনিক বিস্কুট ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেন, যা হাজারো বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কীর্তি হলো ভোমরা স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা। তাঁর একক প্রচেষ্টা এবং দূরদর্শিতার কারণে আজ ভোমরা স্থলবন্দর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। তিনি সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং ভোমরা স্থলবন্দর ব্যবহারকারী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
তিনি কৃষিকে একটি লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে ‘গুচ্ছ সেচ কোম্পানি’র ধারণা প্রবর্তন করেন। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন এবং জলাবদ্ধতা দূরীকরণে বেতনা নদী খননসহ মহাসড়ক ডবল লেনে উন্নীত করার দাবিতে তিনি আমৃত্যু লড়াই করেছেন।
জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খানের তত্ত্বাবধানে নিজস্ব জমি দান করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নগরঘাটা শিশু হাসপাতাল’। এছাড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতি, গণ-আদালত ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাতক্ষীরা জেলা সভাপতি হিসেবে সমাজ থেকে অন্যায় ও মৌলবাদ দূরীকরণে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
সাতক্ষীরার গণমানুষের মুখপত্র হিসেবে এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অবরুদ্ধ কণ্ঠস্বরকে ফুটিয়ে তুলতে ১৯৯৫ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দৈনিক পত্রদূত’। তিনি নিজেই ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। অত্যন্ত নিরপেক্ষ, সাহসী এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে অল্প দিনেই পত্রিকাটি সাতক্ষীরার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং সাতক্ষীরার সুষম উন্নয়নের দাবিতে তাঁর কলম ছিল আপসহীন তরবারি। কিন্তু এই কলমই একসময় তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। শোষক আর কালোবাজারিদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া ‘পত্রদূত’ অফিসই শেষ পর্যন্ত তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।
১৯৯৬ সালের ১৯ জুন। তখন ঘড়িতে রাত ১০টা ২৩ মিনিট। সাতক্ষীরা শহরের দৈনিক পত্রদূত কার্যালয়ে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে নিজের টেবিলে কাজ করছিলেন সম্পাদক স. ম. আলাউদ্দীন। চারদিকে তখন এক থমথমে নীরবতা। ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে এলো ঘাতকের নির্মম, নৃশংস বুলেট। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আততায়ীর সেই তাজা বুলেট বিদ্ধ করল এই মহান জননেতার বুক। নিজের প্রিয় পত্রিকা অফিসের মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন সাতক্ষীরার আশার প্রদীপ। রাত ১০টা ৩০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নিভে গেল সাতক্ষীরার ভাগ্যাকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি। এই নৃশংস হত্যাকা- শুধু একটি মানুষের মৃত্যু ছিল না, এটি ছিল সাতক্ষীরার সামগ্রিক অগ্রযাত্রার বুকে এক মরণাঘাত।
মানুষ মরে যায়, কিন্তু তাঁর কীর্তি অমর। স. ম. আলাউদ্দীন আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু সাতক্ষীরার বাতাসে আজও তাঁর নিঃশ্বাসের স্পন্দন অনুভূত হয়। মোটর সাইকেলে চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে মেঠোপথ ধরে গ্রামের সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনা সেই মাটির মানুষটিকে সাতক্ষীরাবাসী কোনোদিন ভুলবে না।
প্রতি বছর ১৯ জুন এলে তাঁর মাজার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়; অশ্রুসিক্ত নয়নে মানুষ তাঁর কবর জিয়ারত করে। তিনি যে আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং স্বাবলম্বী সাতক্ষীরার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নকে ধারণ করাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন। ঘাতকের বুলেট তাঁর শরীরকে ধ্বংস করতে পেরেছে, কিন্তু তাঁর আদর্শ, চেতনা এবং সাতক্ষীরার মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসাকে মুছে ফেলতে পারেনি। হে অকুতোভয় বীর, হে আধুনিক সাতক্ষীরার রূপকার, এই ঋণী জাতি আপনাকে চিরকাল সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করবে। আপনার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আপনি আমাদের ইতিহাসের গর্ব, আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস। লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত









