শিশু অধিকার দিবসে শিশুদের ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত
এম. এম হায়দার আলী
একটি শিশুর হাসির চেয়ে নির্মল দৃশ্য পৃথিবীতে খুব কমই আছে। সেই হাসির মধ্যে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা এবং একটি দেশের আগামী দিনের প্রতিচ্ছবি। আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক-কেউ হবে শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ সাংবাদিক, কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। তাই শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও অন্যতম প্রধান শর্ত।
শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি সেই জায়গা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত হলে ১৫০ জন শিশু ফুল দিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য-‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এমন একটি আয়োজনে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটায়। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই আয়োজন থেকে শিশুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্র কী ধরনের বাস্তব অঙ্গীকার গ্রহণ করে এবং সেই অঙ্গীকার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। কারণ শিশুদের ভবিষ্যৎ কেবল একটি দিনের অনুষ্ঠান, বক্তব্য কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত। শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’Ñপ্রতিপাদ্যটি তাই অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ শিশুর ভবিষ্যৎ বলতে শুধু তার হাতে বই তুলে দেওয়া বোঝায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নিরাপদ ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার, খেলাধুলার সুযোগ, নির্মল পরিবেশ, নিরাপদ চলাচল, সাইবার নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং ভয়মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার।
আমরা প্রায়ই বলি-‘শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু নিজেদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হবে, সেই ভবিষ্যৎকে আমরা কতটা নিরাপদ করে তুলতে পেরেছি ? একদিকে রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত শিশুদের নিয়ে নানা আয়োজন হচ্ছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে, ছবি আঁকা হচ্ছে, স্মারক উপহার দেওয়া হচ্ছে, স্মরণিকা প্রকাশিত হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের কোনো কোনো প্রান্তে এখনো এমন শিশু আছে, যার কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়ার চেয়ে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। কেউ শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, কেউ বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে, কেউ বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে, কেউ নির্যাতনের ভয় নিয়ে বেড়ে উঠছে। আবার কেউ মাদক, সহিংসতা, সাইবার অপরাধ কিংবা মানব পাচারের ঝুঁকিতে পড়ছে। এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন উন্নয়নের সুফল সমাজের সবচেয়ে অসহায় শিশুটির কাছেও পৌঁছে যায়। শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশু যেমন সুযোগ পাবে, প্রত্যন্ত চর, উপকূল, নদীভাঙন কিংবা দুর্গম এলাকার শিশুটিও তেমন সুযোগ পাবে,এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তিও এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অর্ধশতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও মানসিক বিকাশে ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শিশুর পৃথিবীও বদলে গেছে। একসময় শিশুর বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল মাঠ, গল্পের বই, রেডিও কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখন শিশুর হাতে স্মার্টফোন, সামনে ইন্টারনেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন পৃথিবী। তাই শিশু অধিকার রক্ষার সংজ্ঞাটিও এখন আরও বিস্তৃত।
একটি শিশুকে শুধু শারীরিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, প্রতারণা, অনলাইন আসক্তি ও ডিজিটাল অপরাধ থেকেও সুরক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সুফল ব্যবহারের সুযোগও দিতে হবে।
প্রযুক্তিকে ভয় দেখিয়ে দূরে রাখা নয়, বরং নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। শিশুর অধিকার মানে তার কথা বলার অধিকারও। শিশুকে শুধু নির্দেশ পালনকারী হিসেবে দেখলে চলবে না। তার স্বপ্ন কী, সে কী হতে চায়, কোন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে,সেসব কথাও শুনতে হবে। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়ের যে কর্মসূচি রয়েছে, তার গুরুত্ব এখানেই। রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকেরা যদি শিশুদের সরাসরি কথা শোনেন, তাহলে বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝার সুযোগ আরও বাড়ে। তবে সেই মতবিনিময়ের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হবে তখনই, যখন শিশুদের উত্থাপিত বিষয়গুলো নীতি ও বাস্তব কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হবে।
শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশও জরুরি। স্কুলে যাওয়া-আসার নিরাপত্তা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, নিরাপদ খেলার মাঠ, সড়কে নিরাপদ চলাচল,এসবও শিশু অধিকারের অংশ। শহরের অনেক এলাকায় খেলার মাঠ সংকুচিত হচ্ছে। গ্রামের অনেক শিশুরও নিরাপদ খেলাধুলার জায়গা নেই। অথচ খেলাধুলা কোনো বিলাসিতা নয়; শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অপরিহার্য অংশ। শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করানোই শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না।
একজন শিশুকে মানবিক, সৎ, দায়িত্বশীল, বিজ্ঞানমনস্ক ও সহনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত। তার প্রশ্ন করার অধিকার থাকতে হবে, ভুল থেকে শেখার সুযোগ থাকতে হবে এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার শিক্ষা থাকতে হবে। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুদের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। একটি শিশু কোন পরিবারে জন্মেছে, সেটি তার নিজের পছন্দ নয়। তাই পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিশু যেন শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি কিংবা নিরাপদ শৈশব থেকে বঞ্চিত না হয়,এ দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের।
বিশেষ করে পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, এতিম, সুবিধাবঞ্চিত শিশু, শ্রমে নিয়োজিত শিশু এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি প্রয়োজন। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না; সেই নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু অধিকার দিবস তাই শুধু ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়। এটি নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করার দিনÑআমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের প্রাপ্য অধিকার দিতে
পারছি ? একটি শিশু যখন ক্ষুধার্ত থাকে, তখন তার কাছে সুন্দর বক্তৃতার মূল্য কম। একটি শিশু যখন বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, তখন তার হাতে স্মারক তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তার জন্য শুধু সহানুভূতি নয়,দ্রুত বিচার, মানসিক সহায়তা ও কার্যকর সুরক্ষা প্রয়োজন। একটি শিশু যখন বাল্য বিবাহের মুখে পড়ে, তখন পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। শিশুর অধিকার বাস্তবায়নে তাই প্রয়োজন রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের কাছে এই দিবসের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হতে পারে, শিশুদের নিয়ে ঘোষিত প্রতিটি অঙ্গীকার যেন বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ নেয়। কারণ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার কাজ কোনো একক ব্যক্তি বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়; তবে রাষ্ট্রের নীতি ও নেতৃত্ব এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আজকের শিশু আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের চোখে যে স্বপ্ন, সেই স্বপ্নের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে আগামী দিনের রাষ্ট্র। তাই শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তার পাশে নিরাপদ পরিবার তৈরি করতে হবে, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে, খেলাধুলার মাঠ দিতে হবে এবং তাকে ভয়মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে।
শিশু একাডেমির ৫০ বছরের পথচলা আমাদের অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর শিশু অধিকার দিবস আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে শেখায়। সেই ভবিষ্যৎ যেন কেবল অনুষ্ঠানের মঞ্চে উচ্চারিত সুন্দর শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা যেন প্রতিটি শিশুর জীবনে বাস্তব অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমাদের প্রত্যাশা একটাই, শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সত্যিই সুরক্ষিত। শিশুর অধিকার হোক কাগজের অঙ্গীকার নয়, বাস্তব জীবনের নিশ্চয়তা। কারণ আজকের শিশুকে আমরা যেমন বাংলাদেশ দেব, আগামীকাল সেই শিশুই আমাদের তেমন বাংলাদেশ ফিরিয়ে দেবে। শিশুর হাসি বাঁচুক, শৈশব বাঁচুক,সুরক্ষিত হোক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট












