সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

তালায় দলিত’র প্রকল্প অবহিতকরণ সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ
তালায় দলিত’র প্রকল্প অবহিতকরণ সভা

‎তালা প্রতিনিধি: ‎তালায় বেসরকারি সংস্থা দলিত’র ইনক্লুসিভ ডিজিটাল পাথওয়েজ ফর ডিজঅ্যাডভান্টেজড ভালনারেবল কমিউনিটি প্রকল্পের অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দলিত’র আয়োজনে এবং দাতা সংস্থা ফান্ডাজিঅন সানজিনো- ইতালির সহযোগীতায় অনুষ্ঠিত অবহিতকরণ সভায় সভাপতিত্ব করেন, দলিত’র হেড অব প্রোগ্রাম (ইনক্লুশন এন্ড লাইভলিহুড) নিতাই চন্দ্র দাস।

‎প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জান্নাতুল আফরোজ স্বর্না। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, তালা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক, খেশরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম লাল্টু, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আশুতোষ কুমার বিশ্বাস ও উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা (অঃ দাঃ) মো. শরিফুল ইসলাম।

 

দলিত’র টেকনোলজি এডুকেটের পবিত্র দাস’র সঞ্চালনায় এসময় অন্যান্যের মধ্যে ফাইনান্স ও এডমিন কৃষ্ণ পদ দাস, প্রজেক্ট অফিসার জয়ন্ত কুমার দাস ও কমিউনিটি নারী নেত্রী স্বরসতী দাসসহ ২৭ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

‎সভায় দলিত সংশ্লিষ্ট ইনক্লুসিভ ডিজিটাল পাথওয়েজ ফর ডিজঅ্যাডভান্টেজড ভালনারেবল কমিউনিটি প্রকল্পের মেয়াদ, বাজেট এবং কর্ম পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।

 

 

 

 

Ads small one

অফসিজন তরমুজ চাষ: উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৫ অপরাহ্ণ
অফসিজন তরমুজ চাষ: উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

Oplus_131072

সম্পাদকীয়

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার লবণাক্ততা-কবলিত অঞ্চল দেবহাটায় অসময়ে বা অফসিজনে তরমুজ চাষের যে সুবাতাস বইছে, তা নিঃসন্দেহে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এবং মাটিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে যেখানে প্রচলিত দানাদার শস্য বা শাকসবজি ফলানো ক্রমেই দুরূহ হয়ে উঠছিল, সেখানে বিকল্প ও লাভজনক এই তরমুজ চাষে স্থানীয় বেকার যুবক, শিক্ষার্থী, সাধারণ কৃষক এবং বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ এক আশাব্যঞ্জক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

সাধারণত দেবহাটার মতো এলাকায় মৎস্যঘেরের প্রাচুর্য বেশি। ফলে চাষযোগ্য সমতল জমির অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও স্থান-সংকুলান পদ্ধতির অংশ হিসেবে ঘেরের পাড়ে মাচা তৈরি করে তরমুজ চাষের যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও উদ্ভাবনী। এতে বাড়তি কোনো জমির প্রয়োজন হচ্ছে না, আবার এক সময়ের অনাবাদী কিংবা অনুৎপাদনশীল ঘেরের পাড়গুলো মূল্যবান কৃষিপণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলাটিতে বিগত বছরের ৩০ হেক্টরের জায়গায় ৩৭ হেক্টর জমিতে তৃপ্তি, ব্ল্যাক বেবি, সুগারকুইন ও বাংলালিংক জাতের তরমুজ চাষ হওয়া প্রমাণ করে যে, এই অসময়ের ফসলটির জনপ্রিয়তা ও উপযোগিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই ইতিবাচক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের সঠিক সময়ে নেওয়া কার্যকর পদক্ষেপ। কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার, মাচা তৈরির খরচ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার কারণে সাধারণ কৃষক ও বেকার তরুণরা ঝুঁকিমুক্তভাবে এই চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। বিশেষ করে, উপকূলীয় লবণাক্ত মাটিতে যেখানে সাধারণ সবজি বেঁচে থাকা কঠিন, সেখানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষ করা অফসিজন তরমুজ ফলিয়ে কৃষকদের কয়েক লাখ টাকা মুনাফা অর্জনের গল্পগুলো আমাদের কৃষি ব্যবস্থার রূপান্তরের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অফসিজন তরমুজ চাষের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই ফল একদিকে কৃষকদের হাতে ভালো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিচ্ছে, অন্যদিকে নারী ও শিক্ষার্থীদের আত্মকর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। পড়াশোনার পাশাপাশি বা গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে তরমুজ চাষে অংশ নিয়ে গ্রামীণ নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।

তবে এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই এবং আরও সম্প্রসারিত করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। তা হলোÑ ১. বাজারজাতকরণ ও হিমাগার সুবিধা: অসময়ে উৎপাদিত তরমুজ যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য সরাসরি বাজারজাতকরণের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। ২. মানসম্পন্ন বীজ ও উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন জোগান: সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে যেন সস্তা ও নি¤œমানের বীজ প্রবেশ করতে না পারে, তা নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। ৩. প্রযুক্তি ও গবেষণার সম্প্রসারণ: লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও যেন ফলন ব্যাহত না হয়, সে জন্য পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষি বিজ্ঞানীদের নিয়মিত গবেষণা জারি রাখতে হবে।

অফসিজন তরমুজ চাষের সাফল্য স্রেফ একটি আঞ্চলিক অর্জন নয়; এটি দেশের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকার জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল। স্থানীয় প্রশাসনের সময়োপযোগী সহায়তা, কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্ভাবনী পরামর্শ এবং কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমÑএ তিনে মিলে যেভাবে বেকারত্ব দূর হচ্ছে ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সরকারি সহযোগিতার এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে উপকূলীয় এই কৃষি বিপ্লব রূপ নেবে জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতার এক অনন্য উদাহরণে।

 

মাদক: কী হচ্ছে, আর হচ্ছে না/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৬ অপরাহ্ণ
মাদক: কী হচ্ছে, আর হচ্ছে না/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া তথ্য আমাদের সামনে মাদকের ভয়াবহতার একটি নির্মম ছবি তুলে ধরেছে। পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকা-ের সূত্রপাত; পরে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি নিছক একটি হত্যাকা- নয়। এর ভেতরে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্নÑমাদকের বিরুদ্ধে এত অভিযান, এত গ্রেপ্তার, এত প্রচার-প্রচারণার পরও মাদক কেন কমছে না? আমরা কী করছি, আর কী করছি নাÑএই দুই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।

 

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে। মাদক উদ্ধার হচ্ছে। মামলা হচ্ছে। গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে মাদকও ছড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ আমরা হয়তো মাদকের দৃশ্যমান অংশটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, কিন্তু এর গভীর শিকড়ে যথেষ্ট আঘাত করতে পারছি না। সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যেও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্পষ্ট। অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক মানুষ সেবা নিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মাদকাসক্তকে চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি তাকে মাদক সরবরাহকারী ব্যক্তির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাচ্ছে কি না। যদি না যায়, তাহলে চিকিৎসা শেষে সে আবার একই পরিবেশে ফিরে গিয়ে পুনরায় মাদকে জড়িয়ে পড়তে পারে।

 

মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেইÑআমরা অনেক সময় মাদকসেবীকে দেখি, কিন্তু মাদকের ব্যবসাকে দেখি না।একজন তরুণ কোথা থেকে ইয়াবা পেল? কে তাকে দিল? কে বিক্রি করল? সেই বিক্রেতার পেছনে কে? মাদক পরিবহনের সঙ্গে কারা যুক্ত? অর্থের লেনদেন কোথায় হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আরেকটি বিষয়ও ভাবতে হবে। মাদক এখন শুধু কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা বয়সের মানুষের সমস্যা নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রÑসব জায়গায় এর ঝুঁকি রয়েছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে মাদক কেনাবেচার পদ্ধতিও বদলাচ্ছে। ফলে পুরোনো পদ্ধতিতে নতুন মাদকের বাজার মোকাবিলা করা কঠিন। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকলেও চলবে না।

 

পরিবারকে জানতে হবে সন্তানের বন্ধু কারা, সে কোথায় যায়, আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন হচ্ছে কি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফল নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে না; শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, হতাশা, একাকিত্ব ও ঝুঁকিপূর্ণ বন্ধুত্বের বিষয়েও নজর দিতে হবে। তবে এখানে একটি সতর্কতাও জরুরি। মাদকাসক্ত মানুষকে শুধু ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। কেউ যদি আসক্ত হয়ে পড়ে, তাকে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা মাদককে ব্যবসা হিসেবে চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে। রংপুরের হত্যাকা- আমাদের আরও ভয়াবহ একটি বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

 

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, হত্যার পরও অভিযুক্তরা ওই বাড়িতে অবস্থান করে, প্রমাণ নষ্ট ও ঘটনাকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু নেশাগ্রস্ততার নয়; এর সঙ্গে অপরাধবোধের অবক্ষয়, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং অপরাধ আড়াল করার মানসিকতাও যুক্ত হতে পারে। অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট মামলার অভিযুক্তদের আচরণ দিয়ে সব মাদকসেবীকে বিচার করা যাবে না। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সতর্ক করেÑমাদকের সঙ্গে যখন অপরাধী মানসিকতা যুক্ত হয়, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিতÑআমরা কি শুধু মাদক ধরছি, নাকি মাদকের বাজারও ভাঙছি? আমরা কি শুধু অভিযান পরিচালনা করছি, নাকি সীমান্ত ও সরবরাহ পথ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছি? আমরা কি শুধু মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করছি, নাকি বড় কারবারিদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করছি? আমরা কি শুধু মাদকবিরোধী সভা করছি, নাকি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করছি? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নÑমাদকাসক্ত একজন মানুষকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারছি কি?

 

মাদকের বিরুদ্ধে সফলতা শুধু কত কেজি মাদক উদ্ধার হলো বা কতজন গ্রেপ্তার হলোÑএই হিসাব দিয়ে মাপা উচিত নয়। সফলতার আসল মাপকাঠি হলো, নতুন কতজন তরুণ মাদকে জড়াল না, কতজন আসক্ত মানুষ সুস্থ জীবনে ফিরল এবং মাদকের ব্যবসার বড় নেটওয়ার্ক কতটা দুর্বল হলো। রংপুরের চারটি প্রাণের মর্মান্তিক পরিণতি তাই আমাদের জন্য শুধু শোকের বিষয় নয়, সতর্ক হওয়ারও সময়। মাদককে ‘ছোটখাটো সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পরিবার ভাঙে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করে, অপরাধ বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। এখন প্রয়োজন মাদকের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্থানীয় সমাজÑসবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই আমাদের নতুন করে হিসাব করতে হবেÑকী করছি, কী হচ্ছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, কী হচ্ছে না। কারণ মাদক কমছে না, অথচ আমাদের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজ যে তরুণটি মাদকের প্রথম ট্যাবলেটটি হাতে নিচ্ছে, তাকে থামানোর সুযোগ হয়তো এটাই শেষ সুযোগ। আগামীকাল সেই সুযোগ আর নাও থাকতে পারে। লেখক: সংবাদকর্মী

 

 

রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস: এক জাতির বেদনা, মানবতার পরীক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪০ অপরাহ্ণ
রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস: এক জাতির বেদনা, মানবতার পরীক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা

সাকিবুর রহমান বাবলা

২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য শুধুমাত্র একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; এটি তাদের অস্তিত্বের সংগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মৃতি, জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদের বেদনা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার প্রতীক। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহ সহিংসতা শুরু হয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেই ঘটনার স্মরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা প্রতি বছর ২৫ আগস্টকে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। একটি দিন, একটি জাতির কান্না।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতেও রোহিঙ্গারা দিনটিকে শোক, স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের দাবির দিন হিসেবে পালন করে। তাদের কাছে এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেরও প্রতীক।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের শত শত বছর ধরে বসবাসকারী একটি মুসলিম জাতিগত জনগোষ্ঠী হলেও দেশটির সরকার কখনোই তাদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মেনে নেয়নি। পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় মূল্যবোধ, অতিথিপরায়ণতা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সহমর্মিতা রোহিঙ্গা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় বাণিজ্য ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজনৈতিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার শিকার হয়ে তারা আজ নিজেদের দেশেই পরবাসীতে পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ১৭৮৫ সালে আরাকান বার্মার শাসনের অধীনে চলে যাওয়ার পর থেকেই ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগমন এবং পরবর্তী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে রাখাইনে জাতিগত বিভাজন বৃদ্ধি পায়।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিস্থিতিকে সবচেয়ে জটিল করে তোলে। এই আইনে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, ফলে তারা রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার যে অধ্যায় শুরু হয়, তা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভিযানে শত শত গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। অসংখ্য নারী ও কিশোরী যৌন সহিংসতার শিকার হন। ঘরবাড়ি, মসজিদ, বিদ্যালয়, বাজার এবং জীবিকার উৎস ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষ জঙ্গল, পাহাড়, নদী ও সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুততম গণপালায়নের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

সীমিত সম্পদ ও জনসংখ্যার চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এই জনসংখ্যার চাপ কমাতে সরকার অনেক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করেছে এবং ইউএনএইচসিআর, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ও সেবা প্রদানে ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মিয়ানমারে সংঘটিত ঘটনাকে গণহত্যার অভিযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলমান রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করছে। এছাড়া জাতিসংঘের তদন্তকারী সংস্থাসমূহ প্রমাণ সংগ্রহ ও অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের এই ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের দাবিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গাম্বিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ জোরালোভাবে সমর্থন জুগিয়ে চলেছে।

মানবাধিকারের মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রহীনতার কারণে তারা আইনি সুরক্ষা পায় না, ভূমির মালিকানা দাবি করতে পারে না, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না এবং বহু ক্ষেত্রে মৌলিক সেবাও গ্রহণ করতে পারে না। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, শরণার্থী আইন এবং মানবিক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি শরণার্থী সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুরা সীমিত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো তীব্র দৈনন্দিন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এর পাশাপাশি, ঐতিহাসিক গণহত্যা ও নৃশংসতার কারণে সৃষ্ট সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক দূর্যোগ এই পুরো প্রজন্মকে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন—রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল; নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন; মানবাধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা; শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি; দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন। যতদিন পর্যন্ত রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না হবে এবং রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হবে, ততদিন তাদের প্রত্যাবর্তন টেকসই হবে না।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে এবং দেশটির সাথে সব ধরনের অস্ত্র বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সময়সীমা ও গ্যারান্টি ভিত্তিক কূটনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।

২৫ আগস্ট শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি আত্মসমালোচনার দিন। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বৈষম্য, ঘৃণা, জাতিগত বিদ্বেষ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন কতটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আজ যখন বিশ্ব মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং মানব মর্যাদার কথা বলে, তখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব। রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস তাই শুধু শোকের নয়; এটি মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ উচ্চারণের এবং একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন।