প্রসঙ্গ: জনস্বার্থের খাল ও দখলদারির সংস্কৃতি
সম্পাদকীয়
উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজীবন ও পরিবেশ সুরক্ষায় উন্মুক্ত জলাশয় বা খালের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মতো লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় সুপেয় ও মিষ্টি পানির আধার হিসেবে খালের গুরুত্ব জীবন-মরণ প্রশ্নের মতো। সম্প্রতি শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ জেলেখালী খালের পুনঃখনন এবং তা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক জলাশয় ব্যবস্থাপনা ও দখলদারির এক উদ্বেগজনক চিত্রকে আবারও সামনে এনেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৫ একর জমিতে বিস্তৃত এই জেলেখালী খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় এলাকায় প্রতিবছর জলাবদ্ধতা তৈরি হতো।
বর্ষা মৌসুমে কৃষি মাঠের পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় কৃষকের ফসল ও বীজতলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হতো। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টি পানির অভাবে বোরো চাষ ব্যাহত হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় জেলেখালী গ্রামবাসী ও কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং গণস্বাক্ষরের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে বেসরকারি অর্থায়নে খালের ২.২ কিলোমিটার উন্মুক্ত অংশ পুনঃখনন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্টÑপানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে মিষ্টি পানির জোগান নিশ্চিত করা।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, খালের খননকাজ শেষ হতে না হতেই পূর্বের দখলদারদের পক্ষ থেকে খালের একটি অংশে মাছের পোনা ছেড়ে তা পুনরায় দখলের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, এই দখলের কারণে এলাকায় একধরনের ভীতি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। খালের পাশে নিজেদের জমিতে মাটি ফেলতে দিয়ে যে কৃষকেরা খালের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করলেন, এখন দখলদারদের কারণে তাঁদের সেই পানির অধিকারই হুমকির মুখে পড়েছে। খালের পানি যদি অবরুদ্ধ বা ইজারাভুক্ত হয়ে পড়ে, তবে সাধারণ কৃষকেরা সেখান থেকে এক ফোঁটা পানিও ব্যবহারের সুযোগ পাবেন নাÑএই আশঙ্কা অত্যন্ত যৌক্তিক।
অভিযুক্ত দখলদার পক্ষ থেকে আইনি নিষেধাজ্ঞা বা মামলার অজুহাত তোলা হলেও, জনস্বার্থের চেয়ে কোনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ বড় হতে পারে না। এই খালটি শুধু মাছ চাষের ক্ষেত্র নয়, এটি পুরো এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং বোরো ও আমন ধান চাষের একমাত্র রক্ষাকবচ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং কৃষকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, খালটি যদি আবার কোনো প্রভাবশালী মহলের হস্তগত হয়, তবে এলাকার পুরো কৃষি অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে।









