সম্পাদকীয়/ অস্তিত্ব রক্ষার আকুতি: নদের নাব্য পুনরুদ্ধার ও অবৈধ বালু দস্যুতা রোধে চাই জরুরি পদক্ষেপ
সাতক্ষীরা জেলায় বিশ্ব নদীকৃত্য দিবস উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে নদী বাঁচানোর যে সম্মিলিত সুর উচ্চারিত হয়েছে, তা কেবল আনুষ্ঠানিকতার অংশ নয়; বরং এ অঞ্চলের প্রকৃতি, জীবন ও জীবিকা রক্ষায় একটি অস্তিত্ব রক্ষার আকুতি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণবিন্দু কপোতাক্ষ, বেতনা, খোলপেটুয়া, মরিচ্চাপ ও ইছামতির মতো নদীগুলো আজ পলি জমাকরণ, অবৈধ দখল ও ভয়াবহ দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। অপরিকল্পিত পরিকাঠামো নির্মাণ এবং নদীকেন্দ্রিক সমন্বিত ধারণার অভাবে বহু নদী ইতিমধ্যেই তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে বদ্বীপে রূপ নিচ্ছে। এর সরাসরি কুফল পড়ছে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং ভূপ্রকৃতির ওপর; যা প্রতিনিয়ত তীব্র জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সংকট বাড়িয়ে তুলছে।
নদীগুলোর এই প্রাকৃতিক দুর্দশার সঙ্গে যখন যোগ হয় মনুষ্যসৃষ্ট লোভ ও দস্যুতা, তখন পরিস্থিতি অতিমাত্রায় আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। শ্যামনগরের খোলপেটুয়া নদী থেকে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের যে খবর সামনে এসেছে, তা উপকূলীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি। জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র নদীভাঙনের কারণে উপকূলবাসী যেখানে প্রতিদিন ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে থাকেন, সেখানে ড্রেজার দিয়ে রাতের অন্ধকারে অবৈধ বালু উত্তোলন কোনোভাবেই সাধারণ অপরাধ নয়; এটি সম্পূর্ণ উপকূলীয় এলাকাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার সামিল। ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ স্পষ্ট নির্দেশ করেÑকৃষিজমি, বাঁধ বা জনবসতি হুমকির মুখে পড়লে কোনো অবস্থাতেই বালু তোলা যাবে না। অথচ প্রকাশ্যে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার করে ও প্রশাসনিক তদারকির আড়ালে এই নৈরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সাতক্ষীরার নদ-নদী রক্ষা না হলে কেবল জলপ্রবাহই বন্ধ হবে না, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং, নদী বাঁচানোর পদক্ষেপকে কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এ নদী ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় সরকারকে সর্বাগ্রে বাস্তবমুখী ভূমিকা নিতে হবেÑ ১. আইন প্রয়োগ ও নৈশ অভিযান: খোলপেটুয়া নদীতে ড্রেজার চালক ও বালু চক্রের বিরুদ্ধে দিনে সতর্কতার পাশাপাশি রাতে ঝটিকা অভিযান জোরদার করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
২. উচ্ছেদ ও নাব্য পুনরুদ্ধার: সরকারি নদী ও খালের অবৈধ দখল অবিলম্বে উচ্ছেদ করতে হবে এবং বৈজ্ঞানিক পন্থায় পলি অপসারণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবহমানতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
৩. সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা: জলাবদ্ধতা ও নোনা পানির আগ্রাসন প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণ, গবেষক ও সিভিল সোসাইটিকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিবেশবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।
নদী কোনো স্থাবর জমি নয়, এটি একটি প্রবাহমান জীবন্ত সত্তা। সাতক্ষীরার জীবন ও প্রকৃতি বাঁচাতে নদীগুলোকে দখল, দূষণ এবং বালু খেকো চক্রের হাত থেকে মুক্ত করা সময়ের প্রধান দাবি। অবিলম্বে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের নদীগুলোকে প্রবহমান রাখা হোকÑতবেই বাঁচবে উপকূল, বাঁচবে সাতক্ষীরা।









