সম্পাদকীয়/ উপকূলীয় মৎস্যজীবী নারীদের ঘামে ভেজা জীবন: স্বীকৃতি, সুরক্ষা ও টেকসই সমাধানের তাগিদ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জনপদে ভোরের সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় জীবনসংগ্রামের এক নিরবচ্ছিন্ন অধ্যায়। সংসারের রান্নাবান্না ও সন্তানদের দেখাশোনা শেষ করেই শ্যামনগরসহ উপকূলের অসংখ্য নারী হাতে জাল তুলে নিয়ে নেমে পড়েন রূপসা, কালিন্দী বা খোলপেটুয়ার মতো প্রমত্তা নদীতে। জোয়ার-ভাটার গতিপথ মেপে হাঁটু কিংবা কোমরপানিতে ঘণ্টা পর ঘণ্টা জাল টেনে তাঁদের সংগ্রহ করতে হয় বাগদা-গলদার রেণু ও নদীর ছোট মাছ। পরিবারকে দুমুঠো অন্ন জোগানোর এই নিত্যদিনের লড়াই কেবল এক দারিদ্র্যের রূপকথা নয়; এটি তাঁদের অপরিসীম আত্মনির্ভরতা, সহনশীলতা ও দায়বদ্ধতার গল্প।
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজকাঠামোয় উপকূলীয় নারীদের এই অবদান কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑযে নারীদের ঘামে ভেজা পরিশ্রমে উপকূলীয় সংসারের চাকা ঘোরে, তাঁদের শ্রম আজও সমাজে যথাযথ স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা পায় না। রোদ, বৃষ্টি আর নোনা পানির দীর্ঘ শারীরিক ক্লান্তি সহ্য করে অর্জিত জলজ সম্পদের ন্যায্যমূল্য পান না তাঁরা। স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও আরতদারদের দাপটে তাঁদের পাওয়া অর্থের অঙ্ক থাকে অত্যন্ত নগণ্য, যা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তদুপরি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির শিকার এসব উপকূলীয় নারী। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বেড়িবাঁধ ভাঙন এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে বছরে বহু দিন নদী বন্ধ থাকে। কোনো সঞ্চয় না থাকায় কয়েক দিনের এই কর্মবিরতি তাঁদের ঠেলে দেয় তীব্র খাদ্যসংকটে। সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীর নোনা পানির প্রভাবে বিভিন্ন চর্মরোগ ও জরায়ুজনিত নানা শারীরিক জটিলতা। একদিকে অনিশ্চিত জীবিকা, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকিÑএ দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন।
উপকূলীয় নারীদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামকে টেকসই সমাধানে রূপ দিতে হলে সমন্বিত নীতি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, এসব মৎস্যজীবী নারীকে ‘শ্রমিক’ ও ‘মৎস্যজীবী’ হিসেবে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় এনে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। দুর্যোগকালীন সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী ও খাদ্যসহায়তার তালিকায় তাঁদের অগ্রাধিকার প্রদান আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, দাদনপ্রথা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ থেকে বাঁচাতে সহজ শর্তে ও সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, শুধু মাছ ধরার ওপর নির্ভরতা কমাতে নারীবান্ধব বিকল্প কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজনÑযেমন উপকূলীয় জলবায়ুসহনশীল হাঁস-মুরগি বা ছাগল পালন, হস্তশিল্প এবং বিকল্প কৃষিকাজ। একই সাথে স্থানীয় বাজারব্যবস্থায় তাঁদের উৎপাদিত বা সংগৃহীত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে যৌথ বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
নদী বাঁচলে যেমন উপকূলীয় জনপদ বাঁচবে, তেমনি নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে উপকূলের সামগ্রিক অর্থনীতি। উপকূলের মৎস্যজীবী নারীদের এই অসামান্য শ্রমকে অবহেলায় ফেলে রাখা মানে কেবল কয়েকটি পরিবারকে সংকটে রাখা নয়, বরং আমাদের গ্রামীণ ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে রাখা। সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল, স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে এখনই এই নারীদের পাশে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই উপকূলের এসব অদম্য নারীদের জীবনসংগ্রাম অবশেষে এক স্থায়ী স্বস্তির মুখ দেখবে।









