সম্পাদকীয়/ জলাবদ্ধতার অভিশাপ কাটিয়ে সম্ভাবনার আলো: সাতক্ষীরার পানি ফল চাষ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় বছরের পর বছর ধরে অগণিত একর জমি আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টির পানিতে থইথই করে। অপরিকল্পিত নদী ভরাট, অপ্রতুল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বেড়িবাঁধের জটিলতায় হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার শিকার। এতে ঐতিহ্যবাহী ধানচাষ বন্ধ হয়ে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের জীবন-জীবিকা প্রায় থমকে দাঁড়ানোর উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু সাতক্ষীরার পরিশ্রমী ও উদ্ভাবনী কৃষকেরা জলাবদ্ধতার এই দীর্ঘ অভিশাপকেই রূপান্তরিত করেছেন অর্থনৈতিক আশার আলোয়। অকেজো পতিত জলাশয়ে পানি ফল (পানি সিংড়া) চাষের মাধ্যমে যে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটছে, তা আজ গোটা দেশের জন্যই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর জেলায় যেখানে ১৬৪ হেক্টর জমিতে পানি ফলের চাষ হয়েছিল, চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০ হেক্টরে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই পতিত জমি থেকেই প্রায় ১০০ কোটি টাকার পানি ফল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি কেবল এক হাজার একর জলমগ্ন জমির সদ্ব্যবহারই নয়; বরং এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন রূপান্তরের গতি এসেছে। সামান্য বিনিয়োগে প্রতি বিঘায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ করে যেখানে প্রায় দেড় লাখ টাকার ফল বেচাকেনা হচ্ছে, সেখানে প্রান্তিক কৃষকের হাঁফ ছেড়ে বাঁচার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
এই কৃষি বৈচিত্র্যের সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক দিকটি হলো গ্রামীণ কর্মসংস্থান, বিশেষ করে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ। জলমগ্ন জমি পরিচর্যা থেকে ফল সংগ্রহ ও বিপণনের কাজে স্থানীয় শত শত নারী ও পুরুষ শ্রমিক প্রতিদিনের নিশ্চিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয় বাজার থেকে শুরু করে পাইকারি ব্যবসায়ী পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে (সাপ্লাই চেইন) যুক্ত প্রতিটি ধাপে আয় ও কর্মসংস্থানের নিত্যনতুন দুয়ার খুলছে। এর পাশাপাশি এই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল জেলা শহরের গ-ি পেরিয়ে দেশের অন্যান্য স্থানে পৌঁছে পুষ্টির চাহিদাও মেটাচ্ছে।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথ পুরোপুরি নিষ্কণ্টক নয়। মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিলে দেখা যায়, কৃষকেরা নিজস্ব উদ্যোগে ঝুঁকি নিয়ে এই চাষে নেমেছেন। চাষিদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের সরবরাহ, কীটনাশক ও সার ব্যবস্থাপনা, আর সবচেয়ে বড় কথাÑকৃষি ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত পচনশীল এই ফল বাজারজাতকরণের জন্য উপযুক্ত পরিবহন ও শীতলীকরণ বা হিমাগার সুবিধাও এখন সময়ের দাবি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সঠিক বাজার সংযোগ গড়ে তুলতে না পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষক প্রকৃত মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
সাতক্ষীরার জলাবদ্ধতা একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত সংকট, যার স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের যে প্রয়াস কৃষকেরা দেখাচ্ছেন, তা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার দাবি রাখে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যদি পানি ফল চাষিদের উন্নত প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেয়, তবে সাতক্ষীরার অবহেলিত জলাবদ্ধ অঞ্চল কেবল ১০০ কোটি টাকার পানি ফলই নয়, দেশের নীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) ও জলজ কৃষির অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।












