ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডারে বিপন্ন জানমাল!
এম শফিকুল ইসলাম
প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। নৈমিত্তিক দুর্ঘটনা আর বিয়োগান্ত পরিস্থিতির মধ্যে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মানহীন সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার। সড়কে চলতে থাকা বাস, ট্রাক বা ছোট-বড় যানবাহনে থাকা এই মানহীন সিলিন্ডারগুলো যেন চলন্ত তাজা বোমা। অন্যদিকে রান্নার কাজে ঘরে ঘরে থাকা অসচেতনতা আর ত্রুটিযুক্ত এলপিজি সিলিন্ডারও রূপ নিয়েছে প্রাণঘাতী পণ্যে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির অভাবে আশঙ্কাজনক এই পরিস্থিতি দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একটি গ্যাস সিলিন্ডারের কার্যমেয়াদ সাধারণত ১০ থেকে ২০ বছর। তবে আইন অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর পর রিটেস্টিং (পুনঃপরীক্ষা) করা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে দেশে পাঁচ লক্ষাধিক যানবাহন সিএনজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে চলাচল করছে। তবে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় অসংখ্য মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার পরীক্ষা ছাড়াই মেয় পার করে চলছে। একই সঙ্গে ভারত, ইতালি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা ভালো মানের সিলিন্ডারের পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফালোভী চক্রের হাত ধরে বাজারে ঢুকছে নি¤œমানের যন্ত্রাংশ।
অননুমোদিত সিএনজি কনভারসন সেন্টারে অদক্ষ কারিগর দিয়ে সিলিন্ডার সংযোজন ও মেরামত করার ফলে ঝুঁকি বাড়ছে দ্বিগুণ। পর্যবেক্ষণ বলছে, মূল সিলিন্ডার সহজে বিস্ফোরিত না হলেও সিলিন্ডারে ব্যবহৃত ত্রুটিপূর্ণ হোসপাইপ, রেগুলেটর কিংবা দুর্বল গ্যাস ভালভের লিকেজ থেকেই ঘটাচ্ছে বড় ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনা। যানবাহনে রিফিল করার সময় চাপ সহ্য করতে না পেরে দুর্বল সিলিন্ডার বিকট শব্দে ফেটে আহত ও নিহত হওয়ার একাধিক ঘটনাও ঘটেছে।
বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও সেখানেও বাজার ছেয়ে গেছে মানহীন পণ্যে। পরিবহনে নিরাপত্তাহীনতা, অনিয়ম এবং অসচেতনতার সুযোগে নি¤œমানের সামগ্রী পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ঘরে। অর্থ খরচ করে ভোক্তারা নিজের অজান্তেই ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন প্রাণঘাতী পণ্য। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিতই ঘটছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনা, যাতে অপূরণীয় জীবনের ক্ষতির পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বিপুল সম্পদ।
বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা রোধে বিশেষজ্ঞরা একাধিক জরুরি পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন:
নিয়মিত মনিটরিং: সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে সিলিন্ডারের মান ও রিটেস্টিং সার্টিফিকেট যাচাই বাধ্যতামূলক করা এবং অনিয়ম পেলেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
মানসম্মত সরঞ্জাম: মানহীন হোসপাইপ, দুর্বল রেগুলেটর ও গ্যাস ভালভের বিক্রি ও ব্যবহার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
সচেতনতা সৃষ্টি: ভোক্তাদের সিলিন্ডারের মেয়াদ ও নিরাপত্তা বিধি সম্পর্কে সচেতন করা এবং পাঁচ বছর পর পর রিটেস্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা।
অবৈধ ওয়ার্কশপ বন্ধ: অদক্ষ কারিগর দিয়ে পরিচালিত অননুমোদিত সিএনজি কনভারসন সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো।
নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি কাটিয়ে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে, সড়ক ও বাসাবাড়িতে তাজা বোমার মতো ছড়িয়ে থাকা এসব সিলিন্ডারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। লেখক: সাংবাদিক ও নাট্যকার












