সম্পাদকীয়/ বাল্যবিয়েকে ‘লাল কার্ড’: দেবহাটার আলো ছড়াক সর্বত্র
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার দেবহাটায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কিশোরী ও অভিভাবক সমাবেশের চিত্রটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ভাবনার জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ‘আর নয় বাল্যবিয়ে, এগিয়ে যাব স্বপ্ন নিয়ে’Ñএই দৃঢ় অঙ্গীকারকে পাথেয় করে সখীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যখন কিশোরীরা বাল্যবিবাহকে সামাজিক ও সামাজিকভাবে ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন করেছে, তখন তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে আত্মনির্ভরশীলতার এক প্রদীপ্ত ঘোষণা। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) পরিচালিত ইরেসপো প্রকল্পের আওতায় সঞ্চয়ের বিপরীতে শিক্ষা-স্বাস্থ্য উপকরণ ও প্রণোদনার চেক হস্তান্তরের এই উদ্যোগ প্রান্তিক সমাজে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলাগুলোতে বাল্যবিয়ের ঝুঁকি ঐতিহাসিকভাবেই বেশি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অসংরক্ষিত পরিবেশ এবং দারিদ্র্যের কারণে বহু পরিবার কন্যাশিশুকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করে। এই বাস্তবতা বদলাতে প্রথাগত প্রশাসনিক তৎপরতা বা আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রেষণা ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা যে কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে, দেবহাটার ঘটনাটি তারই প্রমাণ। প্রকল্পের অধীনে কিশোরীদের ২০০ টাকা সঞ্চয়ের বিপরীতে সরকারের ৪০০ টাকা অনুদানের যে কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তা কেবল একটি আর্থিক সহায়তা নয়; এটি তাদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং আত্মপরিচয় গড়ার জোরালো প্রেরণা। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের হাত ধরে জমাকৃত সঞ্চয় ও প্রণোদনার অর্থ তুলে দেওয়ার ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে, একটু সচেতনতা ও আর্থিক অনুঘটক থাকলে অভিভাবকেরাও কন্যাশিশুকে বিয়ের পিঁড়িতে না বসিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ধরে রাখতে আগ্রহী হন।
দেবহাটার দুটি বিদ্যালয়ের প্রায় দুই শতাধিক কিশোরী যে একযোগে বাল্যবিয়ে না করার শপথ নিয়েছে, তা তাদের মানসিক ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ নির্দেশ করে। তবে এটি কেবল শুরু। বাল্যবিয়ে রুখতে হলে প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতা, মেয়েদের সুরক্ষা, স্থানীয় পর্যায়ে ঝরে পড়া রোধ এবং কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে।
প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের এই মডেলটি যদি জেলার প্রতিটি প্রান্তিক ইউনিয়ন এবং সারা দেশে সম্প্রসারিত করা যায়, তবেই বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব। সখীপুরের কিশোরীদের এই লাল কার্ড যেন কেবল প্রতীকী না থেকে সমাজ পরিবর্তনের এক অপ্রতিরোধ্য হাতিয়ারে পরিণত হয়Ñসেজন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রতিনিধি ও সর্বস্তরের নাগরিক সমাজকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যেতে হবে।









