সম্পাদকীয়/ ভোমরা বন্দরে রাজস্ব সম্ভাবনা ও বাস্তবতার কষ্টিপাথর
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন অন্যতম নিকটবর্তী বাণিজ্যিক পথ ভোমরা স্থলবন্দর কেন্দ্রিক রাজস্ব আহরণ ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রতি এক দ্ব্যর্থক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই বন্দরের কাস্টমস হাউসের জন্য ২,৩৮৩ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে; অন্যদিকে দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের প্রভাবে সার্বিক বাণিজ্যপ্রবাহে দৃশ্যমান স্থবিরতা বিরাজ করছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) ২৭৪ কোটি ৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের চিত্র যেমন ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে, তেমনি উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানি কমে যাওয়ার প্রবণতা বন্দরের ভবিষ্যৎ আয়ের স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করে।
অর্থনীতির বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে একটি স্থলবন্দরের পূর্ণ সম্ভাবনার সঠিক সদ্ব্যবহার কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা অবকাঠামোগত দক্ষতা ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপর সমানভাবে নির্ভরশীল। জুলাই মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও আগস্টে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা প্রমাণ করে যে সুযোগ পেলে এই বন্দর রাজস্ব আদায়ে আশাব্যঞ্জক অবদান রাখতে সক্ষম। কিন্তু এ সাময়িক সফলতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি ধারাবাহিক রাখা জরুরি।
ভোমরা কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ, কর ব্যবস্থার আধুনিক সংস্কার এবং ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বন্দর সেবা চালু করার মতো পদক্ষেপগুলো এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর না হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে না। অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি নিশ্চিত করতে বন্দরকেন্দ্রিক ডিজিটাল ছাড়পত্র ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ওপারে ঘোজাডাঙা বন্দরের সঙ্গে লজিস্টিক সহায়তার সমন্বয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
ভোমরা স্থলবন্দর কেবল রাজস্ব সংগ্রহের কেন্দ্র নয়, এটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম স্তম্ভ। বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ যদি হয় ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্বাসন করা, তবে ভোমরার মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর বাধা দূর করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, আমলাতান্ত্রিক সংস্কার ও স্থলবন্দরের পূর্ণ আধুনিকায়ন বিলম্বিত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাব্য সুফল হাতছাড়া হয়ে যাবে। আমরা আশা করব, সরকার ও সংশ্লিষ্ট বন্দর কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপে নিয়ে ভোমরা স্থলবন্দরের অচলাবস্থা কাটাবেন এবং রাজসৃ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দৃশ্যমান সংস্কার তরান্বিত করবেন।









