সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সরকারি খাল ইজারা,উন্নয়ন নাকি স্থানীয়দের অধিকার হরণ?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
সরকারি খাল ইজারা,উন্নয়ন নাকি স্থানীয়দের অধিকার হরণ?

মো. খলিলুর রহমান

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্েযর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো সরকারি উন্মুক্ত খালগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি খাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষ, কৃষক এবং পরিবেশবাদীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জনসাধারণের মনে এখন একটাই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত সরকারি খাল কেন ইজারা দেওয়া হবে?

ভূমি মন্ত্রণালয় তথ্যসুত্র বলছে, সরকারি জলমহাল বা খাল ইজারা দেওয়ার পেছনে মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে যেমন সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি,উন্মুক্ত খালগুলো থেকে মাছ চাষ বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। রক্ষণাবেক্ষণ ও অবৈধ দখল রোধ, ইজারা গ্রহীতা খালের দেখভাল করবেন, যার ফলে অনেকে মনে করেন এর মাধ্যমে খালের অবৈধ দখলদারিত্ব কমবে এবং খালের নাব্যতা বজায় থাকবে। পরিকল্পিত মৎস্য চাষ করে যুব সমাজ বা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে স্বাবলম্বী করতে অনেক সময় শর্তসাপেক্ষে খাল ইজারা দেওয়া হয়। প্রকৃত পক্ষে এসব উদ্দেশ্য কাগজে কলমে সীমাবব্ধ থাকে।

সরেজমিন পরিদর্শন কালে বিভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে সামনে কাগজে কলমে সরকারের রাজস্ব আদায় ও আইন শৃঙ্খলার উদ্দেশ্যটি ইতিবাচক মনে হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত এবং অত্যন্ত জনদুর্ভোগপূর্ণ। ইজারা দেওয়ার পর উন্মুক্ত খালের চরিত্র বদলে সেটি একটি বাণিজ্যিক পুঁজিপতিদের ঘেরে পরিণত হয়, যার মাশুল দিতে হয় স্থানীয় লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে।কৃত্রিম সেচ সংকট ও কৃষির অপূরণীয় ক্ষতিকোনো একটি খাল ইজারা হওয়ার পরপরই ইজারা গ্রহীতারা বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য খালের বিভিন্ন পয়েন্টে আড়াআড়ি বাঁধ, নেট-পাটা বা বাঁশের ঘের তৈরি করেন। এর ফলে খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

 

শুষ্ক মৌসুমে (বোরো বা আমন চাষের সময়) যখন কৃষকদের জমিতে সেচের পানির তীব্র প্রয়োজন হয়, তখন ইজারাদাররা মাছের ক্ষতি হবে এই অজুহাতে কৃষকদের পাম্প বা সেচযন্ত্র দিয়ে খালের পানি নিতে বাধা দেয়। ফলে হাজার হাজার একর ফসলি জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয় এবং দেশের সার্বিক খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

বর্ষা মৌসুমে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার অভিশাপ ইজারাদারদের দেওয়া অবৈধ বাঁধ ও জাল-পাটার কারণ। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি বা উজান থেকে আসা পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে পারে না। পানি নিষ্কাশনের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং মানুষের বাড়িঘর ও চলাচলের রাস্তা দিনের পর দিন পানির নিচে তলিয়ে থাকে। এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয় এবং মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে।

দরিদ্র ও প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা উন্মুক্ত খালে প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়া মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতেন, ইজারা প্রথার কারণে তারা আজ সম্পূর্ণ বেকার। ইজারা নেওয়ার পর খালের চারপাশ ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো পাহারা দেওয়া হয়। সাধারণ বা পেশাদার কোনো মৎস্যজীবীকেই খালের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। ফলে গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আমিষের সহজ লভ্যতা কমে যাচ্ছে এবং তারা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে।

দীর্ঘ লম্বা খালগুলো মহস্য সমিতির নামে ইজারা নিয়ে সে খাল গুলো খন্ড খন্ড করে ভাগ করে বিভিন্ন জনের নামে লিজ দেওয়া। যার ফল স্বরুপ হচ্ছে পানি চলাচলে বাঁধাগ্রস্থ। সেই ধবংস হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ।

সাধারণ মানুষ,কৃষক ও জেলে পরিবারের সাথে আলাপকালে তাদের উদ্বেগ ও বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারি খাল ইজারা দেওয়ার ফলে স্থানীয় কৃষি ও জনজীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

একাধিক ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন,খাল ইজারা নেওয়ার পর ইজারাদাররা সেখানে বাঁধ বা জাল দিয়ে পানি আটকে রাখেন। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সাধারণ কৃষকরা চাষাবাদের জন্য পানি পান না এবং বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

দেশের বড় একটা জনগোষ্ঠী মৎস্যজীবী তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে উন্মক্ত খাল থেতে মাছ শিকার করে। ইজারা দেওয়ার পর এসব মানুষের মাছ ধরার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের বার্ষিক সামান্য কিছু টাকা রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে গ্রামীণ অঞ্চলের কোটি কোটি টাকার কৃষি, পরিবেশ এবং সর্বসাধারণের পানির প্রাকৃতিক অধিকারকে বন্ধক রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত বা টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে কৃষি বিভাগ বারবার ফসলি জমি রক্ষা এবং উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন, সেখানে সেচের প্রধান উৎস উন্মুক্ত খালগুলোকে ইজারা দেওয়া একটি আত্মঘাতী নীতি।

সরকারি খাল কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের লাইফলাইন বা জীবনরেখা। তাই রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশ সরিয়ে রেখে, দেশের কৃষি খাতকে বাঁচাতে এবং সাধারণ মানুষের পানির প্রাকৃতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সমস্ত সরকারি খাল ইজারা মুক্ত করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখাই হবে রাষ্ট্রীয় কল্যাণের প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ।

Ads small one

দেবহাটায় আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৬ অপরাহ্ণ
দেবহাটায় আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভা

Oplus_131072

দেবহাটা প্রতিনিধি: দেবহাটা উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার বেলা ১১টায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এ সভা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিলন সাহা। বক্তব্য দেন দেবহাটার সহকারী কমিশনার (ভূমি) চৌধুরী আল মাহমুদ, দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) রেজাউল করিম, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম, দেবহাটা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ সিরাজুল ইসলাম, সাবেক সদস্যসচিব মহিউদ্দিন সিদ্দিকী, জেলা জামায়াতের সহকারী সম্পাদক মাহবুবুল আলম, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাম, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম, পল্লী বিদ্যুতের দেবহাটা সাব-জোনাল অফিসের এজিএম মাসুম বিল্লাহ, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নাসরিন জাহান, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
এ ছাড়া নওয়াপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোনায়েম হোসেন, কুলিয়া ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রভাস ম-ল, সখিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি ও সংরক্ষিত সদস্য সাজু পারভিন, সখিপুর সরকারি কেবিএ কলেজের শিক্ষক আবু তালেব, দেবহাটা সরকারি বিবিএমপি ইনস্টিটিউশন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মদন মোহন পাল, দেবহাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি মীর খায়রুল আলম, দেবহাটা রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান কাজল, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ বোস্তামি উজ্জ্বল, রিপোর্টার্স ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক কে এম রেজাউল করিম, টাউনশ্রীপুর বিজিবির খোরশেদ আলম, ছাত্রদল সভাপতি ইমরান ফরহাদ, জুলাই যোদ্ধা মুজাহিদ বিন ফিরোজ ও ইমরান হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সভায় দেবহাটার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির পক্ষ থেকে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদক, সন্ত্রাস, চুরি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

অফসিজন তরমুজ চাষ: উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৫ অপরাহ্ণ
অফসিজন তরমুজ চাষ: উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

Oplus_131072

সম্পাদকীয়

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার লবণাক্ততা-কবলিত অঞ্চল দেবহাটায় অসময়ে বা অফসিজনে তরমুজ চাষের যে সুবাতাস বইছে, তা নিঃসন্দেহে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এবং মাটিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে যেখানে প্রচলিত দানাদার শস্য বা শাকসবজি ফলানো ক্রমেই দুরূহ হয়ে উঠছিল, সেখানে বিকল্প ও লাভজনক এই তরমুজ চাষে স্থানীয় বেকার যুবক, শিক্ষার্থী, সাধারণ কৃষক এবং বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ এক আশাব্যঞ্জক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

সাধারণত দেবহাটার মতো এলাকায় মৎস্যঘেরের প্রাচুর্য বেশি। ফলে চাষযোগ্য সমতল জমির অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও স্থান-সংকুলান পদ্ধতির অংশ হিসেবে ঘেরের পাড়ে মাচা তৈরি করে তরমুজ চাষের যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও উদ্ভাবনী। এতে বাড়তি কোনো জমির প্রয়োজন হচ্ছে না, আবার এক সময়ের অনাবাদী কিংবা অনুৎপাদনশীল ঘেরের পাড়গুলো মূল্যবান কৃষিপণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলাটিতে বিগত বছরের ৩০ হেক্টরের জায়গায় ৩৭ হেক্টর জমিতে তৃপ্তি, ব্ল্যাক বেবি, সুগারকুইন ও বাংলালিংক জাতের তরমুজ চাষ হওয়া প্রমাণ করে যে, এই অসময়ের ফসলটির জনপ্রিয়তা ও উপযোগিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই ইতিবাচক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের সঠিক সময়ে নেওয়া কার্যকর পদক্ষেপ। কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার, মাচা তৈরির খরচ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার কারণে সাধারণ কৃষক ও বেকার তরুণরা ঝুঁকিমুক্তভাবে এই চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। বিশেষ করে, উপকূলীয় লবণাক্ত মাটিতে যেখানে সাধারণ সবজি বেঁচে থাকা কঠিন, সেখানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষ করা অফসিজন তরমুজ ফলিয়ে কৃষকদের কয়েক লাখ টাকা মুনাফা অর্জনের গল্পগুলো আমাদের কৃষি ব্যবস্থার রূপান্তরের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অফসিজন তরমুজ চাষের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই ফল একদিকে কৃষকদের হাতে ভালো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিচ্ছে, অন্যদিকে নারী ও শিক্ষার্থীদের আত্মকর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। পড়াশোনার পাশাপাশি বা গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে তরমুজ চাষে অংশ নিয়ে গ্রামীণ নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।

তবে এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই এবং আরও সম্প্রসারিত করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। তা হলোÑ ১. বাজারজাতকরণ ও হিমাগার সুবিধা: অসময়ে উৎপাদিত তরমুজ যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য সরাসরি বাজারজাতকরণের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। ২. মানসম্পন্ন বীজ ও উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন জোগান: সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে যেন সস্তা ও নি¤œমানের বীজ প্রবেশ করতে না পারে, তা নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। ৩. প্রযুক্তি ও গবেষণার সম্প্রসারণ: লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও যেন ফলন ব্যাহত না হয়, সে জন্য পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষি বিজ্ঞানীদের নিয়মিত গবেষণা জারি রাখতে হবে।

অফসিজন তরমুজ চাষের সাফল্য স্রেফ একটি আঞ্চলিক অর্জন নয়; এটি দেশের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকার জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল। স্থানীয় প্রশাসনের সময়োপযোগী সহায়তা, কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্ভাবনী পরামর্শ এবং কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমÑএ তিনে মিলে যেভাবে বেকারত্ব দূর হচ্ছে ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সরকারি সহযোগিতার এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে উপকূলীয় এই কৃষি বিপ্লব রূপ নেবে জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতার এক অনন্য উদাহরণে।

 

মাদক: কী হচ্ছে, আর হচ্ছে না/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৬ অপরাহ্ণ
মাদক: কী হচ্ছে, আর হচ্ছে না/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া তথ্য আমাদের সামনে মাদকের ভয়াবহতার একটি নির্মম ছবি তুলে ধরেছে। পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকা-ের সূত্রপাত; পরে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি নিছক একটি হত্যাকা- নয়। এর ভেতরে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্নÑমাদকের বিরুদ্ধে এত অভিযান, এত গ্রেপ্তার, এত প্রচার-প্রচারণার পরও মাদক কেন কমছে না? আমরা কী করছি, আর কী করছি নাÑএই দুই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।

 

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে। মাদক উদ্ধার হচ্ছে। মামলা হচ্ছে। গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে মাদকও ছড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ আমরা হয়তো মাদকের দৃশ্যমান অংশটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, কিন্তু এর গভীর শিকড়ে যথেষ্ট আঘাত করতে পারছি না। সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যেও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্পষ্ট। অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক মানুষ সেবা নিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মাদকাসক্তকে চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি তাকে মাদক সরবরাহকারী ব্যক্তির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাচ্ছে কি না। যদি না যায়, তাহলে চিকিৎসা শেষে সে আবার একই পরিবেশে ফিরে গিয়ে পুনরায় মাদকে জড়িয়ে পড়তে পারে।

 

মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেইÑআমরা অনেক সময় মাদকসেবীকে দেখি, কিন্তু মাদকের ব্যবসাকে দেখি না।একজন তরুণ কোথা থেকে ইয়াবা পেল? কে তাকে দিল? কে বিক্রি করল? সেই বিক্রেতার পেছনে কে? মাদক পরিবহনের সঙ্গে কারা যুক্ত? অর্থের লেনদেন কোথায় হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আরেকটি বিষয়ও ভাবতে হবে। মাদক এখন শুধু কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা বয়সের মানুষের সমস্যা নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রÑসব জায়গায় এর ঝুঁকি রয়েছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে মাদক কেনাবেচার পদ্ধতিও বদলাচ্ছে। ফলে পুরোনো পদ্ধতিতে নতুন মাদকের বাজার মোকাবিলা করা কঠিন। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকলেও চলবে না।

 

পরিবারকে জানতে হবে সন্তানের বন্ধু কারা, সে কোথায় যায়, আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন হচ্ছে কি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফল নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে না; শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, হতাশা, একাকিত্ব ও ঝুঁকিপূর্ণ বন্ধুত্বের বিষয়েও নজর দিতে হবে। তবে এখানে একটি সতর্কতাও জরুরি। মাদকাসক্ত মানুষকে শুধু ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। কেউ যদি আসক্ত হয়ে পড়ে, তাকে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা মাদককে ব্যবসা হিসেবে চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে। রংপুরের হত্যাকা- আমাদের আরও ভয়াবহ একটি বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

 

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, হত্যার পরও অভিযুক্তরা ওই বাড়িতে অবস্থান করে, প্রমাণ নষ্ট ও ঘটনাকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু নেশাগ্রস্ততার নয়; এর সঙ্গে অপরাধবোধের অবক্ষয়, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং অপরাধ আড়াল করার মানসিকতাও যুক্ত হতে পারে। অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট মামলার অভিযুক্তদের আচরণ দিয়ে সব মাদকসেবীকে বিচার করা যাবে না। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সতর্ক করেÑমাদকের সঙ্গে যখন অপরাধী মানসিকতা যুক্ত হয়, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিতÑআমরা কি শুধু মাদক ধরছি, নাকি মাদকের বাজারও ভাঙছি? আমরা কি শুধু অভিযান পরিচালনা করছি, নাকি সীমান্ত ও সরবরাহ পথ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছি? আমরা কি শুধু মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করছি, নাকি বড় কারবারিদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করছি? আমরা কি শুধু মাদকবিরোধী সভা করছি, নাকি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করছি? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নÑমাদকাসক্ত একজন মানুষকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারছি কি?

 

মাদকের বিরুদ্ধে সফলতা শুধু কত কেজি মাদক উদ্ধার হলো বা কতজন গ্রেপ্তার হলোÑএই হিসাব দিয়ে মাপা উচিত নয়। সফলতার আসল মাপকাঠি হলো, নতুন কতজন তরুণ মাদকে জড়াল না, কতজন আসক্ত মানুষ সুস্থ জীবনে ফিরল এবং মাদকের ব্যবসার বড় নেটওয়ার্ক কতটা দুর্বল হলো। রংপুরের চারটি প্রাণের মর্মান্তিক পরিণতি তাই আমাদের জন্য শুধু শোকের বিষয় নয়, সতর্ক হওয়ারও সময়। মাদককে ‘ছোটখাটো সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পরিবার ভাঙে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করে, অপরাধ বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। এখন প্রয়োজন মাদকের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্থানীয় সমাজÑসবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই আমাদের নতুন করে হিসাব করতে হবেÑকী করছি, কী হচ্ছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, কী হচ্ছে না। কারণ মাদক কমছে না, অথচ আমাদের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজ যে তরুণটি মাদকের প্রথম ট্যাবলেটটি হাতে নিচ্ছে, তাকে থামানোর সুযোগ হয়তো এটাই শেষ সুযোগ। আগামীকাল সেই সুযোগ আর নাও থাকতে পারে। লেখক: সংবাদকর্মী