শহীদ মিনারে জুতা নয়: সাতক্ষীরায় প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ চাই!
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
শহীদ মিনার বাঙালির ভাষা আন্দোলন, আত্মত্যাগ ও জাতীয় চেতনার পবিত্র স্মারক। অথচ সাতক্ষীরা শহর-সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে শহীদ মিনারের “মূল চত্বর” ও প্রাঙ্গণকে ঘিরে অনাকাক্সিক্ষত আড্ডা, জুতা পায়ে “মূল চত্বর” ওঠা, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং নানা ধরনের অবমাননাকর কর্মকা-ের অভিযোগ ও দৃশ্য জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের শহীদ মিনার এবং সাতক্ষীরা জজ কোর্ট এলাকার শহীদ মিনার-সহ জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহীদ মিনারের নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক তদারকি এখন সময়ের দাবি।
শহীদ মিনার কোনো সাধারণ বসার জায়গা কিংবা আড্ডার মঞ্চ নয়। এটি ভাষাশহীদদের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বছরের ৩৬৫ দিনই এর মর্যাদা ও পরিবেশ রক্ষা করা নাগরিক ও প্রশাসনের দায়িত্ব। শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশে বিচারিক নির্দেশনাও রয়েছে। ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষায় ৮ দফা নির্দেশনা দেন। আদালত শহীদ মিনারের এলাকায় অসামাজিক কার্যক্রম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং “মূল চত্বর” কোনো অনুষ্ঠান বা সভা “না” করার নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের এসব নির্দেশনা মূলত ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান এবং শহীদ মিনারের মর্যাদা সংরক্ষণ, দেশের সকল শহীদ মিনারের প্রশাসনিকভাবে অনুসরণযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তাই সাতক্ষীরার শহীদ মিনারগুলোকে অবহেলায় ফেলে রাখার কোনো সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে সাতক্ষীরার শহীদ মিনারগুলো কি শুধু একুশে ফেব্রুয়ারির কয়েক দিনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ থাকবে? বছরের বাকি সময় সেখানে যদি জুতা পায়ে ওঠা, আড্ডা, ময়লা ফেলা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকা- চলে, তাহলে ভাষাশহীদদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা কোথায়? বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও জাতীয় ও সামরিক স্মৃতিসৌধের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর আইন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনে সামরিক সদস্যদের স্মরণে নির্মিত সরকারি স্মৃতিসৌধ ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদ-ের বিধান রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিশ্বযুদ্ধ স্মৃতিসৌধে ভাঙচুরের ঘটনায় ফেডারেল অভিযোগে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদ-ের বিধান থাকা ধারায় মামলা হয়েছে। যুক্তরাজ্যেও স্মৃতিসৌধ ক্ষতিসাধনের বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে ২০২২ সালের আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে স্মৃতিসৌধের ক্ষতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর কারাদ- পর্যন্ত বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো জাতীয় স্মৃতি ও আত্মত্যাগের প্রতীকগুলোকে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমেও সুরক্ষা দেয়।
আমাদের দেশেও শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষায় বিদ্যমান আইন, আদালতের নির্দেশনা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। সাতক্ষীরার বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের প্রতি আহ্বান, জেলার গুরুত্বপূর্ণ সব শহীদ মিনারের একটি তালিকা করে সেগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হোক।
শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের শহীদ মিনার ও জজ কোর্ট এলাকার শহীদ মিনারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়মিত পুলিশি টহল ও নজরদারি নিশ্চিত করা হোক। প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং ‘জুতা পায়ে বেদিতে ওঠা নিষেধ’, ‘আড্ডা ও ময়লা ফেলা নিষেধ’ এমন স্পষ্ট সাইনবোর্ড স্থাপন করা হোক।
শুধু সাইনবোর্ড দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে শহীদ মিনারের মর্যাদা নষ্ট করলে তার কর্মকা-ের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রচলিত আইনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা











