সাতক্ষীরায় ৬৮৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে, টেকসই সমাধানের অপেক্ষায় উপকূলবাসী
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে দেশের অন্যতম অরক্ষিত অঞ্চল। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া-এর মতো অসংখ্য নদীবেষ্টিত এই জেলার আশাশুনি, শ্যামনগর, গাবুরা, প্রতাপনগর এবং পদ্মাপুকুর ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষ প্রতিমুহূর্তে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটে। সাতক্ষীরা উপকূলের ৬৮৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি আশাশুনির প্রতাপনগরে কপোতাক্ষ নদের বাঁধ ধসে নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বুলেটিন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের এক বিশাল অংশ আচমকা ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিবার দুর্যোগ এলে গ্রামবাসীকে নিজেদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে বালির বস্তা ফেলে কোনোমতে নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষা করতে হয়। বহু নদী ও শাখা নদীবেষ্টিত এই সীমান্তবর্তী জেলাটিতে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প আসলেও দুর্নীতির কারণে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মিত হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বারবার দেওয়া আশ্বাসকে এখন ‘লোকদেখানো প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে দেখেন সাধারণ মানুষ।
জনপ্রতিনিধিরা বছরের পর বছর ধরে ‘টেকসই ব্লকের বাঁধ’ বা ‘মেগা প্রকল্প’ বাস্তবায়নের বড় বড় আশ্বাস দিয়ে আসলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাব মতে, সাতক্ষীরা উপকূলের প্রায় ৬৮৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে ফাটল বা ধস দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বারবার শুধু দায়সারা গোছের মাটি ও জিওব্যাগ ফেলে জরুরি সংস্কার করা হয়, যা পরবর্তী জোয়ারের চাপেই ভেসে যায়। সংস্কার চক্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি টাকার চরম অনিয়ম।
দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নে ১ হাজার ৪০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের কাজে তীব্র দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে ১ হাজার কোটির কাজ মাত্র ৬০০ কোটি টাকায় শেষ করে বাকি ৪৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। বণিক বার্তা’র মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, নি¤œমানের সামগ্রী ও তদারকির অভাবেই বাঁধগুলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। উপকূলীয় নদী ও পরিবেশ গবেষকদের মতে, সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের দাবি কোনো সাময়িক ত্রাণ কিংবা চাল নয়, তাদের একমাত্র মৌলিক দাবি একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ।
স্থানীয় জনগণ ও আমাদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পাউবোর ঠিকাদার, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের একটি সিন্ডিকেট প্রতিবছর বাঁধ ভাঙার অপেক্ষায় থাকে। বাঁধ ভাঙলে জরুরি বরাদ্দের নামে কোটি কোটি টাকা সহজে লোপাট করা যায়, যা ‘ভাঙন-চক্রের বাণিজ্য’ নামে পরিচিত। টেকসই বাঁধের অভাবে লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে। রিসার্চগেট-এর জলবায়ু অভিবাসন গবেষণা অনুযায়ী, গাবুরা ও পদ্মাপুকুর এলাকার শত শত পরিবার বাধ্য হয়ে নিজেদের এলাকা ছেড়ে দেশের অন্য অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করার এই নোংরা খেলার বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
নদীভাঙনের শিকার সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ এখন জানতে চান বরাদ্দকৃত হাজার কোটি টাকা কার পকেটে যাচ্ছে এবং আর কতদিন উপকূলবাসীকে কেবল আশ্বাসের সাগরে ভাসতে হবে? দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময় সাতক্ষীরা পাউবোর কিছু প্রকল্পে অভিযান চালালেও দুর্নীতিবাজদের সমূলে উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি, যার মাশুল দিচ্ছে সাতক্ষীরার উপকূলবাসি।












