সাতক্ষীরার ‘জোড়া মুকুট’: বিভাগীয় প্রাথমিক গোল্ডকাপে ছেলে ও মেয়েদের ঐতিহাসিক জয়
পত্রদূত ডেস্ক: খুলনার ভৈরব নদের তীরের আকাশ ভেঙে তখন ঝরছে করতালির বৃষ্টি। মাঠের সবুজ ঘাসে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে একদল শিশুর বাঁধভাঙা উল্লাস। কেউ ট্রফি উঁচিয়ে ধরছে আকাশের পানে, কেউবা সহযোদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে ভাসছে আনন্দের কান্নায়। দৃশ্যটি খুলনা নগরীর খালিশপুর পোর্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠের। যেখানে ফুটবল পায়ে অনন্য এক রূপকথা লিখল সাতক্ষীরার খুদে ফুটবলাররা।
খুলনা বিভাগীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (বালক-বালিকা) ২০২৬-এর ফাইনালে রচিত হলো এই মহাকাব্য। বালক ও বালিকাÑদুই বিভাগেই প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিভাগীয় শ্রেষ্ঠত্বের ‘জোড়া মুকুট’ এখন সাতক্ষীরার মাথায়। একই সঙ্গে দুই বিভাগে কোনো একক জেলার এমন অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক সাফল্যে এখন আনন্দে ভাসছে সাতক্ষীরার শিক্ষা ও ক্রীড়াঙ্গন।
বুধবার (২০ মে) বিকেলে এক জমকালো ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল বিভাগীয় পর্যায়ের এই ফুটবল মহাযজ্ঞের। যেখানে সাতক্ষীরার ছেলেরা দেখাল গতির ঝড়, আর মেয়েরা দেখাল ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগের দেওয়াল।
বিভাগীয় এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ দুটিকে ঘিরে সকাল থেকেই টানটান উত্তেজনা ছিল গ্যালারিতে। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্রীড়াপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল পোর্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।
ছেলেদের ফাইনালে যশোরকে উড়িয়ে দিল সাতক্ষীরার গণেশপুর। দুর্দান্ত দাপট ও মাঠ কাঁপানো ফুটবল উপহার দিয়ে বালক বিভাগের ফাইনালে যশোর জেলা দলকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার গণেশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে সাতক্ষীরার খুদে ফুটবলারেরা। তাদের গতিময় আক্রমণ, নিখুঁত ছোট ছোট পাসিং আর দুর্দান্ত দলগত সমন্বয়ের (টিম ওয়ার্ক) সামনে পাত্তাই পায়নি যশোরের ঝিকড়গাছা উপজেলার বেনিয়ালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছেলেরা। ম্যাচের প্রথমার্ধেই একের পর এক আক্রমণে যশোরের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দেয় গণেশপুরের স্ট্রাইকাররা। একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত তিন গোলের বিশাল ব্যবধানে মাঠ ছাড়ে সাতক্ষীরার প্রতিনিধিরা। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের ভেতর উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো দল।
মেয়েদের ফাইনালে মারিয়ার গোলে শ্যামনগররের মীরগাংয়ের শ্রেষ্ঠত্ব লাভ। বালকদের দাপুটে জয়ের পর বালিকাদের ফাইনালেও বজায় ছিল সাতক্ষীরার জয়রথ। বালিকা বিভাগের ফাইনালে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার সারুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ১-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে বিভাগীয় শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পূর্ব মীরগাঙ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক নৈপুণ্য দেখানো মীরগাঙের মেয়েরা ফাইনালেও উপহার দেয় দারুণ আত্মবিশ্বাসী ও পরিপক্ব ফুটবল।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঝিনাইদহের রক্ষণভাগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ডি-বক্সের ভেতর থেকে চোখধাঁধানো এক শটে গোল করেন পূর্ব মীরগাঙ দলের অধিনায়ক মারিয়া ইয়াসমিন। তাঁর করা এই একমাত্র গোলটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। গোল হজম করার পর ঝিনাইদহের বালিকারা সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠলেও সাতক্ষীরার ডিফেন্ডারদের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার সামনে তাদের সব আক্রমণ ভেস্তে যায়। রক্ষণ ও আক্রমণের দারুণ মেলবন্ধনে প্রতিপক্ষকে আর কোনো সুযোগই দেয়নি সাতক্ষীরার বালিকারা।
খেলা শেষে সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও মেডেল তুলে দেওয়ার ক্ষণটি ছিল দেখার মতো। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের হাতে চকচকে ট্রফি তুলে দেন খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (শিক্ষা ও আইসিটি) সিফাত মেহনাজ।
সাতক্ষীরার খুদে ফুটবলারদের পক্ষে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের কাছ থেকে ট্রফি ও বিশেষ পুরস্কার গ্রহণ করেন ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী শওকাত হোসেন। এ সময় মাঠে উপস্থিত শত শত দর্শক করতালি দিয়ে ট্রফি জয়ী খুদে চ্যাম্পিয়নদের অভিনন্দন জানান।
পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিফাত মেহনাজ বলেন, “খেলাধুলা শুধু বিনোদন বা শরীরচর্চার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের নতুন প্রজন্মের মানসিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস, মোবাইল আসক্তি ও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড থেকে দূরে রাখতে মাঠের খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।”
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান সরকার একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এই নতুন প্রজন্ম যেন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জন্য সম্মান ও লাল-সবুজের পতাকা বয়ে আনতে পারে, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে।
খুলনা বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষার বিভাগীয় উপপরিচালক ড. মো. শফিকুল ইসলাম-এর সভাপতিত্বে এই সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক মু. ফজলে রহমান, খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম।
এছাড়াও মাঠের পাশে বসে খুদে খেলোয়াড়দের প্রতিনিয়ত উৎসাহ জুগিয়েছেন খুলনা পিটিআই-এর সুপারিন্টেন্ডেন্ট মো. তোজাম্মেল হোসেন, এডিপিইও মো. আমিনুল ইসলাম, থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহজাহান এবং সহকারী থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারগণ।
মাঠে উপস্থিত থেকে বালিকাদের এই ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্যে অনন্য ভূমিকা রাখেন শ্যামনগর উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান ও পূর্ব মীরগাঙ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনিমেশ মৃধা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম, জিএম হুমায়ুন কবির, মুনি হোসেন, সজীব কুমার মহলী, শাহজাদী রহমান এবং সহকারী শিক্ষক সৈয়দ আনিসুজ্জামান, এস কে জামান, মোস্তাফিজুর রহমান, মুক্তা খানম, হ্যাপি প্রমুখ।
শ্যামনগরের পূর্ব মীরগাঙ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালিকাদের এই সাফল্য কিন্তু হুট করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা কঠোর সাধনা ও ধারাবাহিকতা। বিদ্যালয়টির বালিকা ফুটবল দলটি ক্রীড়াঙ্গনে ইতিমধ্যেই এক ‘অপরাজেয়’ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
রেকর্ড বুক ঘেঁটে দেখা যায়, পূর্ব মীরগাঙ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালিকা দলটি এর আগে চারবার উপজেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। টানা তিনবার জেলা চ্যাম্পিয়নের মুকুট নিজেদের করে রেখেছে এবং এবার নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো তারা খুলনা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়ল।
একই দিনে বিভাগীয় পর্যায়ে দুই বিভাগেরই শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট সাতক্ষীরায় আসায় কালীগঞ্জের গণেশপুর ও শ্যামনগরের পূর্ব মীরগাঙ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা মিষ্টি বিতরণ শুরু করেন। পাড়ায় পাড়ায় আনন্দ মিছিল ও উল্লাস করে এই ঐতিহাসিক জয় উদযাপন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন এই ঐতিহাসিক সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “বালক ও বালিকা দুই বিভাগেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া সাতক্ষীরার জন্য এক বিশাল গৌরব ও আনন্দের দিন। খুদে খেলোয়াড়দের মাঠের লড়াই, একাগ্রতা এবং শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনার কারণেই এই ট্রফি জয় সম্ভব হয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই ছেলে-মেয়েরা বিভাগীয় গ-ি পেরিয়ে এবার জাতীয় পর্যায়েও সাতক্ষীরা জেলার নাম উজ্জ্বল করবে।” তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক স্তর থেকেই খেলাধুলার এই চর্চা শিশুদের আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে দারুণ ভূমিকা রাখছে।
এদিকে, এই ঐতিহাসিক জয়ে বিজয়ী দলগুলোকে অভিনন্দন জানিয়েছেন শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক এবং জাতীয় ফুটবল দলের তারকা খেলোয়াড় আলমগীর কবীর রানা। এক অভিনন্দন বার্তায় তাঁরা বলেন, এই খুদে ফুটবলাররাই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ কান্ডারি এবং তাদের এই জয়যাত্রাকে টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক সমর্থন দেওয়া হবে।












