শিশুর রক্তে ভেসে যায় সভ্যতা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকা- শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, মানবিকতা ও সভ্যতার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত। একটি শিশুÑযার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল স্কুল, বই, খেলাধুলা আর স্বপ্নে ভরাÑসে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। হত্যার পর আলামত গোপন করতে তার মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমন বর্বরতা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। অথচ সেই ঘটনাই ঘটেছে আমাদের রাজধানীতে, মানুষের ভিড়ে, একটি বহুতল ভবনের ভেতরে। রামিসার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো জাতির বিবেকের পরীক্ষা।
প্রশ্ন হচ্ছেÑআমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে শিশুরাও আর নিরাপদ নয়? যদি তাই হয়, তাহলে উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব গর্ব কি শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে না? ঘটনার বিবরণ শুনলেই শরীর শিউরে ওঠে। দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা স্কুলে যাওয়ার প্রকাল্লে প্রতিবেশী সোহেল রানার ফাঁদে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদকাসক্ত সেই ব্যক্তি তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় তার স্ত্রী সহযোগতায়।
সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর পরিচয় গোপন ও অপরাধ আড়াল করতে শিশুটির শরীর বিকৃত করা হয়। এই নির্মমতা শুধু অপরাধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের পশুত্বের নগ্ন প্রকাশ। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, হত্যা কিংবা নির্যাতনের খবর আসে। কিন্তু পল্লবীর এই ঘটনা মানুষের মনে এত গভীর নাড়া দিয়েছে, কারণ এখানে নিষ্ঠুরতার মাত্রা ভয়ংকর ভাবে সীমা অতিক্রম করেছে।
একটি শিশুকে হত্যা করেও অপরাধীর ভয় দূর হয়নি; বরং সে মৃতদেহ বিকৃত করে অপরাধ গোপনের চেষ্টা করেছে। এর অর্থ, অপরাধের ভয় তার ভেতরে কাজ করেনি। অর্থাৎ সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু মানুষ মনে করছে তারা যে কোনো অপরাধ করেও পার পেয়ে যেতে পারে। এখানেই আসে বিচার হীনতার প্রশ্ন। আমাদের দেশে বহু আলোচিত হত্যাকা- বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক মামলার বিচার হয় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সূত্রতা মানুষকে হতাশ করে। ফলে অপরাধীরা মনে সাহস পায়। তারা ভাবে, আইনের ফাঁক ফোকর কিংবা প্রভাব খাটিয়ে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
তাই রামিসা হত্যার বিচার শুধু একটি মামলার বিচার নয়; এটি পুরো সমাজে একটি বার্তা দেওয়ার প্রশ্ন। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবেÑশিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই, কোনো ছাড় নেই। তবে শুধু দ্রুত বিচার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অপরাধ একটি সামাজিক বাস্তবতার ফল। সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় বাড়ে, তখন অপরাধও বাড়ে। আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন মানুষের ভেতরের সহমর্মিতা, মমত ¡বোধ ও মানবিকতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি কমে গেছে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর একাকিত্ব মানুষের মনকে কঠোর করে তুলছে। শিশুরা বড় হচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের সামনে, কিন্তু মানবিক শিক্ষার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। মাদকাসক্তিও এই সংকটের বড় কারণ। পল্লবীর ঘটনার মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মাদকাসক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল কিংবা নতুন নতুন মাদক তরুণদের জীবন ধ্বংস করছে।
মাদক শুধু একজন মানুষকে অসুস্থ করে না; এটি তার বিবেক, বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণও ধ্বংস করে দেয়। ফলে অনেকেই ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অভিযান, এত বক্তব্যের পরও মাদকের সহজলভ্যতা কেন কমছে না? সীমান্ত, শহর ও অলিগলিতে কীভাবে মাদকের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে? রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সামাজিক উদাসীনতাও উদ্বেগজনক। একসময় গ্রামবাংলায় বা শহরের মহল্লায় প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ রাখতেন।
কোনো শিশু কোথাও একা গেলে বড়রা খেয়াল করতেন। এখন সেই সামাজিক বন্ধন ভেঙে গেছে। একই ভবনে বছরের পর বছর থেকেও অনেকে একে অপরকে চেনেন না। ফলে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়। রামিসার ঘটনাও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপদ অনেক সময় বাইরের অচেনা মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং পরিচিত মানুষের কাছ থেকেও আসতে পারে। শিশু সুরক্ষায় পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবেÑকোনো প্রলোভনে কারও সঙ্গে যাওয়া যাবে না, বিপদে কী করতে হবে, কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের কথা বলতে পারে। কারণ অনেক শিশু নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন চাপা থাকে শুধুমাত্র ভয়ের কারণে। বিদ্যালয়ের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও জীবন দক্ষতা ভিত্তিক পাঠ এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। শিশুদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্কুলে শিশু সুরক্ষা, আত্মরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বিষয়ে কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুলোরও দায়িত্ব আছে। ধর্ম সবসময় মানুষকে সংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু সমাজে যখন ধর্মের মানবিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কেবল আনুষ্ঠানিকতা বাড়ে, তখন মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিও ক্ষয় হতে থাকে। তাই মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। গণমাধ্যম অনেক সময় অপরাধের ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরে, যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু শুধু আতঙ্ক সৃষ্টি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
গণমাধ্যমকে সচেতনতা তৈরির কাজও করতে হবে। কীভাবে শিশুদের নিরাপদ রাখা যায়, কীভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়Ñএসব দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের আইনেও শিশু সুরক্ষার বিভিন্ন বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইনসহ নানা আইনি কাঠামো আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট হয়, কিংবা মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে মানুষের আস্থা কমে যায়।
তাই শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। রামিসা হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। মানুষ বিচার দাবি করছে, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাচ্ছে। এই ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষণিকের আবেগ দিয়ে সমাজ বদলায় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আইন ও প্রশাসনÑসব জায়গায় মানবিকতা ও জবাবদিহির চর্চা বাড়াতে হবে।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তাদের সেই গুরুত্ব দিচ্ছি? একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনো সুস্থ সমাজ গড়তে পারবে না। কারণ ভয় ও সহিংসতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা সমাজের ওপর আস্থা হারায়। ফলে দীঘর্ মেয়াদে পুরো সমাজই অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন রাজধানীর মতো জায়গায় একটি শিশু এমন নির্মমতার শিকার হয়, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগেÑআমরা কতটা নিরাপদ? শুধু পুলিশি টহল বা আইন কঠোর করলেই হবে না; সমাজে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অপরাধ করার আগেই মানুষ ভয় পায়, বিবেক তাকে বাধা দেয়।
আর সেই বিবেক গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। আজ আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু মানবিকতার চর্চা কমেছে। মানুষ বড় বাড়ি বানাচ্ছে, দামি গাড়ি কিনছে, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হারাচ্ছে। সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষকে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে তুলছে। ফলে সহিংসতা ও বিকৃত মানসিকতার ঝুঁকি বাড়ছে। রামিসার মৃত্যু আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছেÑসভ্যতার মুখোশের আড়ালে সমাজের ভেতরে ভয়ংকর অন্ধকার জমে উঠছে। সেই অন্ধকার শুধু আইন দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।
প্রয়োজন মানবিকতার পুনর্জাগরণ। প্রয়োজন এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিশুদের দিকে কেউ কুদৃষ্টি দেওয়ার সাহস না পায়। এই ঘটনার পর রাষ্ট্রের উচিত শিশু সুরক্ষায় বিশেষ কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আবাসিক ভবন গুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, সন্দেহভাজন অপরাধীদের নজরদারি, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ এবং শিশুদের জন্য জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের মামলা গুলোর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়Ñআমাদের বিবেক কি সত্যিই জাগ্রত হবে?
নাকি কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনার ভিড়ে রামিসার স্মৃতিও হারিয়ে যাবে? আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো নির্মম ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উত্তাল হয়, মানববন্ধন হয়, বিচার দাবি ওঠে। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরিবর্তন আসে না। এই চক্র ভাঙতে হবে। একটি শিশুর মৃত্যু যেন কেবল সংবাদ শিরোনাম হয়ে না থাকে। রামিসার নিষ্পাপ মুখ আমাদের মনে করিয়ে দিকÑশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যাবে, নিরাপদে ঘরে ফিরবে, ভয়হীন শৈশব পাবেÑএটাই একটি সভ্য দেশের পরিচয়।
আজ রামিসার মা-বাবার কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেকের কান্না। সেই কান্না যদি আমাদের না জাগায়, তাহলে আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে উন্নত হব, অর্থনীতিতে এগোব, কিন্তু মানুষ হিসেবে ক্রমেই ছোট হয়ে যাব। রামিসা আর ফিরবে না। কিন্তু তার রক্ত যেন আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করতে থাকেÑকোন পথে যাচ্ছে আমাদের সভ্যতা? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
লেখক: সংবাদকর্মী









