বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

শিশুর রক্তে ভেসে যায় সভ্যতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৫:০৯ অপরাহ্ণ
শিশুর রক্তে ভেসে যায় সভ্যতা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকা- শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, মানবিকতা ও সভ্যতার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত। একটি শিশুÑযার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল স্কুল, বই, খেলাধুলা আর স্বপ্নে ভরাÑসে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। হত্যার পর আলামত গোপন করতে তার মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমন বর্বরতা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। অথচ সেই ঘটনাই ঘটেছে আমাদের রাজধানীতে, মানুষের ভিড়ে, একটি বহুতল ভবনের ভেতরে। রামিসার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো জাতির বিবেকের পরীক্ষা।

 

প্রশ্ন হচ্ছেÑআমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে শিশুরাও আর নিরাপদ নয়? যদি তাই হয়, তাহলে উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব গর্ব কি শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে না? ঘটনার বিবরণ শুনলেই শরীর শিউরে ওঠে। দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী রামিসা স্কুলে যাওয়ার প্রকাল্লে প্রতিবেশী সোহেল রানার ফাঁদে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদকাসক্ত সেই ব্যক্তি তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় তার স্ত্রী সহযোগতায়।

 

সেখানে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর পরিচয় গোপন ও অপরাধ আড়াল করতে শিশুটির শরীর বিকৃত করা হয়। এই নির্মমতা শুধু অপরাধ নয়; এটি মানুষের ভেতরের পশুত্বের নগ্ন প্রকাশ। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, হত্যা কিংবা নির্যাতনের খবর আসে। কিন্তু পল্লবীর এই ঘটনা মানুষের মনে এত গভীর নাড়া দিয়েছে, কারণ এখানে নিষ্ঠুরতার মাত্রা ভয়ংকর ভাবে সীমা অতিক্রম করেছে।

 

একটি শিশুকে হত্যা করেও অপরাধীর ভয় দূর হয়নি; বরং সে মৃতদেহ বিকৃত করে অপরাধ গোপনের চেষ্টা করেছে। এর অর্থ, অপরাধের ভয় তার ভেতরে কাজ করেনি। অর্থাৎ সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু মানুষ মনে করছে তারা যে কোনো অপরাধ করেও পার পেয়ে যেতে পারে। এখানেই আসে বিচার হীনতার প্রশ্ন। আমাদের দেশে বহু আলোচিত হত্যাকা- বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক মামলার বিচার হয় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সূত্রতা মানুষকে হতাশ করে। ফলে অপরাধীরা মনে সাহস পায়। তারা ভাবে, আইনের ফাঁক ফোকর কিংবা প্রভাব খাটিয়ে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

 

তাই রামিসা হত্যার বিচার শুধু একটি মামলার বিচার নয়; এটি পুরো সমাজে একটি বার্তা দেওয়ার প্রশ্ন। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবেÑশিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই, কোনো ছাড় নেই। তবে শুধু দ্রুত বিচার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ অপরাধ একটি সামাজিক বাস্তবতার ফল। সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় বাড়ে, তখন অপরাধও বাড়ে। আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন মানুষের ভেতরের সহমর্মিতা, মমত ¡বোধ ও মানবিকতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

 

পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি কমে গেছে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর একাকিত্ব মানুষের মনকে কঠোর করে তুলছে। শিশুরা বড় হচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের সামনে, কিন্তু মানবিক শিক্ষার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। মাদকাসক্তিও এই সংকটের বড় কারণ। পল্লবীর ঘটনার মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মাদকাসক্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল কিংবা নতুন নতুন মাদক তরুণদের জীবন ধ্বংস করছে।

 

মাদক শুধু একজন মানুষকে অসুস্থ করে না; এটি তার বিবেক, বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণও ধ্বংস করে দেয়। ফলে অনেকেই ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অভিযান, এত বক্তব্যের পরও মাদকের সহজলভ্যতা কেন কমছে না? সীমান্ত, শহর ও অলিগলিতে কীভাবে মাদকের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে? রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সামাজিক উদাসীনতাও উদ্বেগজনক। একসময় গ্রামবাংলায় বা শহরের মহল্লায় প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ রাখতেন।

 

কোনো শিশু কোথাও একা গেলে বড়রা খেয়াল করতেন। এখন সেই সামাজিক বন্ধন ভেঙে গেছে। একই ভবনে বছরের পর বছর থেকেও অনেকে একে অপরকে চেনেন না। ফলে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়। রামিসার ঘটনাও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপদ অনেক সময় বাইরের অচেনা মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং পরিচিত মানুষের কাছ থেকেও আসতে পারে। শিশু সুরক্ষায় পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবেÑকোনো প্রলোভনে কারও সঙ্গে যাওয়া যাবে না, বিপদে কী করতে হবে, কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে।

 

একই সঙ্গে পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের কথা বলতে পারে। কারণ অনেক শিশু নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন চাপা থাকে শুধুমাত্র ভয়ের কারণে। বিদ্যালয়ের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও জীবন দক্ষতা ভিত্তিক পাঠ এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। শিশুদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্কুলে শিশু সুরক্ষা, আত্মরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বিষয়ে কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।

 

ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুলোরও দায়িত্ব আছে। ধর্ম সবসময় মানুষকে সংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু সমাজে যখন ধর্মের মানবিক শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কেবল আনুষ্ঠানিকতা বাড়ে, তখন মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিও ক্ষয় হতে থাকে। তাই মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। গণমাধ্যম অনেক সময় অপরাধের ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরে, যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু শুধু আতঙ্ক সৃষ্টি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

 

গণমাধ্যমকে সচেতনতা তৈরির কাজও করতে হবে। কীভাবে শিশুদের নিরাপদ রাখা যায়, কীভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়Ñএসব দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের আইনেও শিশু সুরক্ষার বিভিন্ন বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইনসহ নানা আইনি কাঠামো আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষ্য প্রমাণ নষ্ট হয়, কিংবা মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে মানুষের আস্থা কমে যায়।

 

তাই শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। রামিসা হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। মানুষ বিচার দাবি করছে, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাচ্ছে। এই ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষণিকের আবেগ দিয়ে সমাজ বদলায় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন। পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আইন ও প্রশাসনÑসব জায়গায় মানবিকতা ও জবাবদিহির চর্চা বাড়াতে হবে।

 

আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তাদের সেই গুরুত্ব দিচ্ছি? একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনো সুস্থ সমাজ গড়তে পারবে না। কারণ ভয় ও সহিংসতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা সমাজের ওপর আস্থা হারায়। ফলে দীঘর্ মেয়াদে পুরো সমাজই অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন রাজধানীর মতো জায়গায় একটি শিশু এমন নির্মমতার শিকার হয়, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগেÑআমরা কতটা নিরাপদ? শুধু পুলিশি টহল বা আইন কঠোর করলেই হবে না; সমাজে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অপরাধ করার আগেই মানুষ ভয় পায়, বিবেক তাকে বাধা দেয়।

 

আর সেই বিবেক গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। আজ আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু মানবিকতার চর্চা কমেছে। মানুষ বড় বাড়ি বানাচ্ছে, দামি গাড়ি কিনছে, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হারাচ্ছে। সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষকে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে তুলছে। ফলে সহিংসতা ও বিকৃত মানসিকতার ঝুঁকি বাড়ছে। রামিসার মৃত্যু আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছেÑসভ্যতার মুখোশের আড়ালে সমাজের ভেতরে ভয়ংকর অন্ধকার জমে উঠছে। সেই অন্ধকার শুধু আইন দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

 

প্রয়োজন মানবিকতার পুনর্জাগরণ। প্রয়োজন এমন সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে শিশুদের দিকে কেউ কুদৃষ্টি দেওয়ার সাহস না পায়। এই ঘটনার পর রাষ্ট্রের উচিত শিশু সুরক্ষায় বিশেষ কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আবাসিক ভবন গুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, সন্দেহভাজন অপরাধীদের নজরদারি, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ এবং শিশুদের জন্য জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের মামলা গুলোর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়Ñআমাদের বিবেক কি সত্যিই জাগ্রত হবে?

 

নাকি কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনার ভিড়ে রামিসার স্মৃতিও হারিয়ে যাবে? আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো নির্মম ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উত্তাল হয়, মানববন্ধন হয়, বিচার দাবি ওঠে। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পরিবর্তন আসে না। এই চক্র ভাঙতে হবে। একটি শিশুর মৃত্যু যেন কেবল সংবাদ শিরোনাম হয়ে না থাকে। রামিসার নিষ্পাপ মুখ আমাদের মনে করিয়ে দিকÑশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যাবে, নিরাপদে ঘরে ফিরবে, ভয়হীন শৈশব পাবেÑএটাই একটি সভ্য দেশের পরিচয়।

 

আজ রামিসার মা-বাবার কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেকের কান্না। সেই কান্না যদি আমাদের না জাগায়, তাহলে আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে উন্নত হব, অর্থনীতিতে এগোব, কিন্তু মানুষ হিসেবে ক্রমেই ছোট হয়ে যাব। রামিসা আর ফিরবে না। কিন্তু তার রক্ত যেন আমাদের সমাজকে প্রশ্ন করতে থাকেÑকোন পথে যাচ্ছে আমাদের সভ্যতা? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৩:০০ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

বর্ষার স্থায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনার পাইকগাছায় হঠাৎ করেই ডেঙ্গু রোগীর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে এডিস মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, বাসাবাড়ির আঙিনায় কিংবা আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি—যেমন পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ড্রেন ও ডাবের খোসাই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া উপজেলার বাইরে থেকেও আক্রান্ত রোগী আসার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। চিকিৎসকদের বক্তব্য স্পষ্ট—ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা এবং মশারির ব্যবহার প্রাথমিক ও কার্যকর প্রতিরোধক।
তবে বাস্তবতা হলো, কেবল সচেতনতামূলক বার্তা কিংবা পরামর্শ প্রদান করে এমন জনস্বাস্থ্য সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের নিজস্ব সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত সমন্বয় এখানে অত্যন্ত জরুরি।
পাইকগাছার বর্তমান পরিস্থিতি যেন মহামারীর দিকে মোড় না নেয়, সে জন্য অবিলম্বে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তা হলোÑ পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উদ্যোগে পাইকগাছার প্রতিটি ওয়ার্ডে অবিলম্বে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ (ফগিং ও লার্ভিসাইড স্প্রে) শুরু করতে হবে। ড্রেন, বদ্ধ জলাশয় ও জমে থাকা পানির স্থানগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়মিত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্বর হলেই যেন রোগীরা হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করান, সে লক্ষ্যে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য রাখা এবং গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি বাড়াতে হবে। কাজের তাগিদে বা ভ্রমণের কারণে যারা বাইরে থেকে উপজেলায় আসছেন, তাঁদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল রূপ নেওয়ার আগেই সমন্বিত ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনসচেতনতাÑএই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া পাইকগাছাকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে জোর দেবেনÑএমনটাই প্রত্যাশা।

​মিরপুরে সাবেক গাড়িচালককে ‘হত্যার চেষ্টা’, এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
​মিরপুরে সাবেক গাড়িচালককে ‘হত্যার চেষ্টা’, এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

Oplus_131072

​পত্রদূত ডেস্ক: ​সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অসামাজিক কার্যকলাপের গোপন তথ্য জেনে ফেলার কারণে সাবেক গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ওবায়দুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির বিচার দাবি করে এবং নিজের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী ওবায়দুর রহমান। আবেদনটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে।
​আবেদনে ওবায়দুর রহমান (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: ২৩৬৭৪৫০৬৫৩) উল্লেখ করেন, বিগত ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানার উত্তর কালশীর আলীনগরে অবস্থিত ‘রোজ গার্ডেন টাওয়ার ২’-এর একটি ফ্ল্যাটে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
​আবেদনকারীর দাবি, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নির্দেশে তিন ব্যক্তি লাঠিসোটা নিয়ে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করেন। হামলার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আবেদনে বলা হয়, ওবায়দুরের চিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে তাঁর মা ও ছোট বোন এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি প্রাণভয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
​হামলার পেছনের কারণ হিসেবে ওবায়দুর রহমান আবেদনে দাবি করেন, তিনি এমপি গাজী নজরুলের দীর্ঘদিনের গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। এই সুবাদে এমপির বিভিন্ন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত অসামাজিক কার্যকলাপের তিনি প্রত্যক্ষদর্শী।
​আবেদনে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এলাকায় জমি ও বালুমহাল দখল, ঘুষ গ্রহণ এবং গ্যাং বা ‘মব’ গঠন করে সন্ত্রাসের অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে এমপির বিতর্কিত গতিবিধির কয়েকটি নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ের কথা আবেদনে উল্লেখ করে তা সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভিডিও প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়। ​এমপি গাজী নজরুলের আদেশে এই হামলা চালানো হয়েছে দাবি করে ওবায়দুর রহমান অভিযুক্ত হামলাকারী এবং নির্দেশদাতার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
এদিকে বিতর্কের মুখেই ২১ জুলাই নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি লিখিত বিবৃতি দিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। লিখিত বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাটি গত ১৩ জুলাইয়ের এবং এর পেছনে তাঁর নিজস্ব গাড়িচালকের সুপরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির নীল নকশা রয়েছে।
বিবৃতিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, গত ১৩ জুলাই তিনি তাঁর প্রথমা স্ত্রী মোসাম্মৎ মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে মগবাজারে অবস্থিত দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তাঁরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। অবস্থানকালে গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ সুকৌশলে ৬ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে ওই কার্যালয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওই অপরিচিত ব্যক্তিরা কক্ষে ঢুকে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের পরিচয় জানতে চেয়ে চরম হেনস্তা করে। একপর্যায়ে তাঁদের কার্যালয়ের নিচে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। সে সময় তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা প্রদান করার পরই তাঁরা সেখান থেকে রেহাই পান।
ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতিতে গাজী নজরুল ইসলাম জানতে পারেন যে, এই পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তাঁর গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ, যিনি সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা। সংসদ সদস্য জানান, তাঁর শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর দুলাভাইয়ের পারিবারিক পূর্বশত্রুতা ছিল। ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ তাঁর কাছে ৫ লাখ টাকা এবং মাসুম বিল্লাহর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং পরিবারের ক্ষতি করার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও এমপি গাজী নজরুল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:৫০ পূর্বাহ্ণ
দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও এমপি গাজী নজরুল

Oplus_131072

ভিডিওতে ভাইরাল, জামায়াত এখন কী করবে
পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি কেন্দ্র করে সংসদ সদস্য, তাঁর প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী, শ্বশুর ও দলীয় নেতাদের কাছ থেকে নানা ব্যাখ্যামূলক ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটে দ্বিতীয় স্ত্রীর একটি বিতর্কিত জীবনবৃত্তান্ত (বায়োডাটা) ও কাবিননামা ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। বিষয়টি মঙ্গলবার টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও স্থান পায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। বিবিসির খবরে বলা হয়Ñ এক তরুণীর সাথে নিজের ‘ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি ভিডিও’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলছেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাবি, তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ই জুন ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।
যদিও সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণীর একটি জীবন বৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সবুজ কালির কলমে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন মি. ইসলাম, যাতে তারিখ উল্লেখ আছে ২২শে জুন ২০২৬। ওই জীবন বৃত্তান্তে তরুণীটির বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।
ভাইরাল হয়ে পড়া ওই জীবন বৃত্তান্ত অনুযায়ী তরুণীটি ২০০৮ সালের ২২শে মে জন্মগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ৭৭ বছর বয়েসি মি. ইসলামের দাবি অনুযায়ী ১৭ই জুন বিয়ে হলে ওই দিন তরুণীটির বয়স ছিল ১৮ বছর ২৬দিন।
গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদে জামায়াত দলীয় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছিলেন যে, মি ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠতার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ‘মেয়েদের শালীনভাবে চলাফেরা ও মাথায় পর্দা রাখার পরামর্শ’ দেওয়া নিয়ে মি. ইসলামের একটি বক্তব্যের পুরনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের সময় তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে ঘটনাটির দিকে তারা দলীয়ভাবে নজর রাখছেন এবং বেআইনি বা অবৈধ কিছুর প্রমাণ পেলে সে অনুযায়ী দল ব্যবস্থা নিবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার দল জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকেও একই বক্তব্য দিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলামকে সালোয়ার কামিজ পরিহিত এক তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে। তার এই ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মি. ইসলাম ওই তরুণীর এক মামাকে দায়ী করেছেন।
কিন্তু ওই তরুণী তার বিবাহিত স্ত্রী হয়ে থাকলে তার মামা কেন এটি করবে সেই প্রশ্নের কোনো জবাব আসেনি কোনো পক্ষ থেকে।
সোমবার বিকেল থেকেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে শুরু করলে প্রথম দিকে ফেসবুকে তার সমর্থকরা এটি ‘এআই ব্যবহার করে করা হয়েছে’ উল্লেখ করে পাল্টা প্রচারণা শুরু করে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল নাগাদ কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দাবি করে যে ভিডিও এআই দিয়ে বানানো নয়।
এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মঙ্গলবার বেলা ১২টা ০১ মিনিটে নিজের ফেসবুক পাতায় একটি বিবৃতি দিয়েছেন গাজী নজরুল ইসলাম।
এতে তিনি দাবি করেন, গত ১৭ই জুন পারিবারিকভাবে তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার বাসভবনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে তার বিরুদ্ধে ‘প্রচারিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো সত্যতা নেই’ বলে দাবি করেন তিনি।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন যে, গত ১৩ জুলাই, ২০২৬ ইং তারিখে তিনি তার প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ব্যবসায়িক অফিসে যান।
“সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি। আমরা উক্ত অফিসে অবস্থানকালে যোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। পরবর্তীতে সে ৫/৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লক্ষ টাকা আদায় করে”।
তিনি ওই বিবৃতিতে আরও বলেন, “আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তীতে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি এসময় জানতে পারি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মোঃ মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
‘’পরবর্তীতে, হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের একজন এমপিকে তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা বা তার লোকেরা জিম্মি করে টাকা আদায় করবেন- এ দাবি কতটা যৌক্তিক তাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নজরুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছে মগবাজারে, যেটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছেই। সাধারণত ওই এলাকায় জামায়াতের বহু কর্মী সমর্থকের উপস্থিতি থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “কথাটা হয়তো যৌক্তিক মনে হচ্ছে না কিন্তু এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি তার স্ত্রীদের নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রীরাও সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন। তারপরেও আমরা সাংগঠনিকভাবে দেখবো যে তাকে হেয় করার চেষ্টা হয়েছে নাকি অন্য কিছু হয়েছে। সেটি দেখে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিবো আমরা”।
মঙ্গলবার দুপুরের পর পর গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মাকসুদা ইসলাম একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে তাকে লিখিত বিবৃতি পড়তে দেখা গেছে।
এতে তিনি বলেছেন, “আমার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামের সহিত মরিয়মের (দ্বিতীয় স্ত্রী) সাথে বিবাহ হয়েছে। যারা এটা নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ থেকে বিরত না থাকলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো”।
এরপর নিজেকে গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী পরিচয় দিয়েও আরেকটি বক্তব্য দেন গাজী নজরুল ইসলামের সাথে দেখা যাওয়া তরুণী। এই ভিডিওতে তাকে মুখে মাস্ক পরা দেখা গেছে। সেখানে ওই তরুণী বলেছেন, “আমার স্বামী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে সে বিষয়ে আমি দেশবাসীর সামনে প্রকৃত ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই।’’
তিনি বলেন, “প্রথমত আমাদের বিয়ে কোনো গোপন বা অনৈতিক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ১৭ই জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগর আমার বাবার বাসায় উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তেরই জুলাই গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে মগবাজারে আমার বাবার অফিসে যান”।
জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদীয় দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বিষয়টি তাদের দৃষ্টিতে এসেছে এবং তারা এ বিষয়ে নজর রাখছেন।
“সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নানাভাবে এসেছে। ওনার ও তার স্ত্রীদের বক্তব্যও এসেছে। তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু না করেন তাহলে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু করে থাকেন তাহলে অবশ্যই জামায়াত দল হিসেবে ব্যবস্থা নিবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “এমপি সাহেব বলেছেন সাথে তার স্ত্রী ছিল। এখন সেই ভিডিও কিভাবে ভাইরাল হলো সেই তথ্য উদঘাটন করতে হবে। এটি কী তাকে হেয় করার চেষ্টা নাকি অন্য কোনো বিষয় সেটি সাংগঠনিকভাবে দেখে, শুনে ও বুঝে আমরা পদক্ষেপ নিব”।
গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল শোরগোলের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, “গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব গাজী নজরুল ইসলাম কে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব খবরাখবর প্রচারিত হয়েছে তার প্রেক্ষিতে আজ ২১শে জুলাই (মঙ্গলবার) এক বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তিনি বলেন, “অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
“ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জনাব গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে,” বিবৃতিতে দলটি বলেছে।