সাতক্ষীরার স্কুলে পরীক্ষার প্রস্তুতি, জীবনের প্রস্তুতি কোথায়?
মো: মামুন হাসান
প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের দেখি। তাদের চোখে স্বপ্ন আছে, প্রশ্ন আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা কৌতূহল আছে। কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ জানেই না ভবিষ্যতে সে কী হতে চায়। একজন শিক্ষক হিসেবে তখন একটি প্রশ্ন আমাকে ভাবায়, আমরা কি আমাদের শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি জীবনের জন্যও প্রস্তুত করছি?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি নেই। পাঠ্যসূচি শেষ করা, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চিহ্নিত করা, মডেল টেস্ট নেওয়া, ভালো ফলের জন্য বাড়তি অনুশীলন, পরীক্ষার খাতায় কীভাবে উত্তর লিখতে হবে এসব নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ব্যস্ততা থাকে সারা বছর। ভালো ফলাফল অবশ্যই শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। পরীক্ষার হল থেকে বের হওয়ার পর শিক্ষার্থী যে বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হবে, সেই জীবনের জন্য আমরা তাকে কতটা প্রস্তুত করছি?
জীবনের পরীক্ষার কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাস নেই। সেখানে প্রশ্ন আগে থেকে জানা যায় না। সেখানে কোনো প্রশ্নের পাশে নম্বর বরাদ্দ থাকে না। সেখানে কখনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কখনো ব্যর্থতা সামলাতে হয়, কখনো নতুন কাজ শিখতে হয়, কখনো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, কখনো প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হয়, আবার কখনো নিজের জন্য নিজেকেই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে হয়। ফলে শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সে কতটা চিন্তা করতে পারে, সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে নিজের জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে, সেটিও শিক্ষার বড় পরিমাপক।
সাতক্ষীরার বাস্তবতা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এই জেলা শুধু একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়। এটি কৃষি, মৎস্য, চিংড়ি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সীমান্ত অর্থনীতি, সুন্দরবন, পর্যটন এবং উপকূলীয় জীবনের একটি বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, দুর্যোগ ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এই জেলার মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই সাতক্ষীরার শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা যদি জেলার বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ হবে না।
শ্যামনগরের একজন শিক্ষার্থী সুন্দরবনকে শুধু ভূগোলের একটি অধ্যায় হিসেবে পড়বে কেন? সুন্দরবন তার জন্য জীবন্ত শিক্ষাগার হতে পারে। সে জানতে পারে বন কীভাবে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পরিবেশ, পর্যটন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। সে পর্যটন ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সংস্কৃতি, নৌপরিবহন কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে পারে। একইভাবে উপকূলের একজন শিক্ষার্থী জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু বইয়ের সংজ্ঞা হিসেবে না পড়ে নিজের এলাকার বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে পারে।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক শিক্ষা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের এলাকার সমস্যা নিয়ে গবেষণা করতে শেখে, তাহলে তাদের মধ্যে একই সঙ্গে জ্ঞান, পর্যবেক্ষণশক্তি ও দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। কেন একটি এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে, কেন তরুণরা কর্মসংস্থানের জন্য বাইরে যাচ্ছে, কীভাবে স্থানীয় কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করা যায়, কীভাবে চিংড়ি শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, কীভাবে সুন্দরবনকে রক্ষা করে পর্যটনের বিকাশ ঘটানো যায় এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী বইয়ের বাইরে গিয়ে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
শিক্ষার অন্যতম বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রশ্ন করতে শেখানো। আমরা অনেক সময় শিক্ষার্থীর সঠিক উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাকে যতটা গুরুত্ব দিই, তার প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে ততটা গুরুত্ব দিই না। অথচ বিজ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুই হয় প্রশ্ন থেকে। যে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, সে একসময় সমস্যার ভেতরে সম্ভাবনাও খুঁজে নিতে শেখে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন শিক্ষার এই প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন তথ্য খোঁজা, লেখা, বিশ্লেষণ, অনুবাদ, নকশা, ব্যবসা ও গবেষণার বহু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। আগামী দিনের শিক্ষার্থী এমন একটি পৃথিবীতে প্রবেশ করবে যেখানে তথ্যের অভাব থাকবে না। বরং বড় চ্যালেঞ্জ হবে কোন তথ্য সত্য, কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই তথ্য কীভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়। তাই মুখস্থ জ্ঞানের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ, যুক্তি, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার শেখানো জরুরি।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির বিকল্প না হয়। বরং এটি যেন তার চিন্তার সহায়ক হয়। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের চিন্তা না করে প্রযুক্তির তৈরি উত্তর শুধু মুখস্থ করে, তাহলে প্রযুক্তি তার দক্ষতা বাড়াবে না। কিন্তু সে যদি প্রযুক্তির সাহায্যে তথ্য সংগ্রহ করে, তথ্য যাচাই করে, নিজের যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে এবং নতুন কিছু তৈরি করে, তখন প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে তার শিক্ষার শক্তি হয়ে উঠবে।
আমাদের শিক্ষার্থীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা শেখানো প্রয়োজন, সেটি হলো কাজ শেখার মানসিকতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কিংবা পরীক্ষার ভালো ফল ভবিষ্যতের একটি পথ খুলে দিতে পারে, কিন্তু পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে শুধু চাকরির অপেক্ষায় থাকা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীকে জানতে হবে কীভাবে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করা যায়, কীভাবে ছোট উদ্যোগ শুরু করা যায়, কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন সেবা তৈরি করা যায়। সাতক্ষীরার বাস্তবতায় কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, ই কমার্স এবং বিভিন্ন কারিগরি সেবায় তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
এই জায়গায় সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব কমানো দরকার। একটি শিক্ষাব্যবস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়। একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও প্রযুক্তি সম্পর্কে জানবে, একজন কারিগরি শিক্ষার্থীও ভাষা, যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পাবে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে একজন মানুষকে শুধু একটি যন্ত্র চালাতে জানলেই হবে না, তাকে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হবে, সমস্যা বুঝতে হবে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে।
অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তান কত নম্বর পেল, কোন স্কুলে প্রথম হলো, কার সন্তানের চেয়ে বেশি নম্বর পেল এসব প্রশ্নের বাইরে আরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার। সন্তান কী শিখছে, কী করতে ভালোবাসে, কোন কাজে তার দক্ষতা বেশি, সে ভবিষ্যতে কী করতে চায়, বাস্তব জীবনের কোনো সমস্যা নিয়ে সে কখনো ভেবেছে কি না এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শিশুর মেধা একই পথে বিকশিত হয় না। কেউ একাডেমিক শিক্ষায় এগিয়ে যাবে, কেউ কারিগরি দক্ষতায়, কেউ সৃজনশীল কাজে, কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। শিক্ষার দায়িত্ব হলো এই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া।
শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই শেষ করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি নন। একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে পারেন, তাকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারেন, ব্যর্থতার পর আবার দাঁড়াতে উৎসাহ দিতে পারেন এবং তার সামনে নতুন পথের দরজা খুলে দিতে পারেন। শ্রেণিকক্ষ তাই শুধু পাঠদানের জায়গা নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের জায়গা।
আমাদের বিদ্যালয়ে যদি নিয়মিত ছোট গবেষণা, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে প্রকল্প, হাতে কলমে কাজ, প্রযুক্তি ব্যবহার, বিতর্ক, উপস্থাপনা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং দলগত সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের শেখার ধরন বদলে যাবে। তারা শুধু পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে না, বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানও খুঁজবে।
সাতক্ষীরার জন্য এমন শিক্ষা আরও জরুরি, কারণ এই জেলার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে তার তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনের সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদ তৈরি হবে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকেই।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমার বিশ্বাস, পরীক্ষার ফলাফল একটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের একটি মাইলফলক মাত্র। এটি তার পুরো ভবিষ্যতের পরিচয় নয়। জীবনের পরীক্ষায় সফল হতে হলে তাকে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করতে হবে, মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হবে, প্রযুক্তি বুঝতে হবে, নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
আজ সাতক্ষীরার যে শিশু শ্রেণিকক্ষে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, আগামী দিনের সাতক্ষীরা তার হাতেই তৈরি হবে। সে কেমন সাতক্ষীরা তৈরি করবে, তার একটি বড় অংশ নির্ধারিত হচ্ছে আজকের শ্রেণিকক্ষে। তাই এখন সময় এসেছে শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার।
আমরা কি এমন শিক্ষার্থী তৈরি করতে চাই, যে পরীক্ষার খাতায় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনের একটি সমস্যার সমাধান করতে পারে না? নাকি এমন মানুষ তৈরি করতে চাই, যে বইয়ের জ্ঞানকে জীবনের কাজে ব্যবহার করতে পারে, নিজের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এবং সমাজের জন্যও মূল্য সৃষ্টি করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে সাতক্ষীরার শিক্ষার আগামী দিনের পথ।পরীক্ষার প্রস্তুতি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু তার পাশাপাশি থাকতে হবে জীবনের প্রস্তুতি। কারণ একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য হতে পারে, কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারাই হবে প্রকৃত শিক্ষার সার্থকতা।









