সৌন্দর্যের আড়ালেই বিষ! পৃথিবীর ভয়ংকর বিষাক্ত যত ফুল
ফুল মানেই সৌন্দর্য, সুবাস আর মুগ্ধতা। রংবেরঙের পাপড়ি দেখে মন ভালো হয়ে যায়, ঘর সাজাতেও ফুলের জুড়ি নেই। কিন্তু সব সুন্দর ফুলই যে নিরীহ, তা নয়। এমন অনেক ফুল রয়েছে, যাদের সামান্য অংশ শরীরে প্রবেশ করলেও দেখা দিতে পারে গুরুতর বিষক্রিয়া। কিছু ফুলের বিষ স্নায়ুতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে। দেখে নেওয়া যাক, সৌন্দর্যের আড়ালে বিপদ লুকিয়ে রাখা এমন কয়েকটি ফুলের কথা।
মিসলটো: পাশ্চাত্যে মিসলটোকে ভালোবাসা ও রোম্যান্সের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বড়দিনের সময় এই গাছের ডালের নিচে দাঁড়িয়ে চুম্বনের রীতিও বেশ পরিচিত। কিন্তু এই গাছের কিছু অংশ বিষাক্ত। ভুল করে খেয়ে ফেললে বমি, ডায়রিয়া, পেটের অস্বস্তি ও ঝাপসা দৃষ্টির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই ভালোবাসার প্রতীক হলেও মিসলটোর ফল বা পাতা মুখে দেওয়া একেবারেই নিরাপদ নয়।
করবী: রাস্তার ধারে কিংবা বাগানে প্রায়ই দেখা যায় এই পরিচিত ফুল। গোলাপি, সাদা বা লাল করবী দেখতে যতই সুন্দর হোক, গাছটির প্রায় সব অংশই বিষাক্ত। এর বিষাক্ত উপাদান হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ভুল করে খেয়ে ফেললে বমি, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানুষ ছাড়াও পোষ্য প্রাণীর জন্যও করবী বিপজ্জনক।
উইস্টেরিয়া: ঝুলন্ত থোকায় থোকায় গোলাপি, বেগুনি, সাদা কিংবা নীল ফুলে গাছটি দেখতে অপূর্ব। কিন্তু এর বীজ ও শুঁটি বিষাক্ত। ভুল করে শরীরে প্রবেশ করলে বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়া হতে পারে। শিশুদের পাশাপাশি কুকুর-বিড়ালের জন্যও এই গাছের বীজ বিপজ্জনক।
অ্যাঞ্জেলস ট্রাম্পেট: নামের মতোই দেখতে যেন স্বর্গীয়। বড় আকারের ঘণ্টার মতো ফুলগুলো গাছ থেকে নিচের দিকে ঝুলে থাকে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে ভয়ংকর বিষ। গাছটির বিভিন্ন অংশে থাকা বিষাক্ত উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন, চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়া, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন এবং গুরুতর স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বেশি মাত্রায় বিষক্রিয়া প্রাণঘাতীও হতে পারে।
ফক্সগ্লোভ: লম্বা কাণ্ডে ঘণ্টার মতো সাজানো বেগুনি, গোলাপি বা সাদা ফুল দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু এই গাছের সব অংশেই বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে এর পাতায় থাকা কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড হৃদযন্ত্রের কাজ ব্যাহত করতে পারে। ভুল করে খেয়ে ফেললে বমি, মাথা ঘোরা, দৃষ্টির সমস্যা এবং হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
আজালিয়া: উজ্জ্বল রঙের ফুলের জন্য বাগান সাজাতে অনেকেই আজালিয়া পছন্দ করেন। কিন্তু এই ফুল ও গাছের বিভিন্ন অংশে রয়েছে গ্রায়ানোটক্সিন নামের বিষাক্ত উপাদান। তা শরীরে প্রবেশ করলে বমি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। মানুষ ছাড়াও কুকুর, বিড়াল ও ঘোড়ার জন্য আজালিয়া বিষাক্ত।
বেলাডোনা: ডেডলি নাইটশেড নামেও পরিচিত এই গাছের ফুল ও ফল দেখতে আকর্ষণীয় হলেও গোটা গাছটিই বিষাক্ত। এর ফল বা অন্য অংশ খেয়ে ফেললে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, তীব্র তৃষ্ণা, চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়া, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি এবং অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ইতালীয় শব্দ ‘বেলাডোনা’র অর্থ ‘সুন্দরী নারী’। একসময় চোখের মণি বড় দেখানোর জন্য নারীরা এই গাছের নির্যাস ব্যবহার করতেন বলেও প্রচলিত রয়েছে। তবে সেই ব্যবহার ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পয়জন হেমলক ও ওয়াটার হেমলক: নামেই বিষের ইঙ্গিত। পয়জন হেমলক অত্যন্ত বিষাক্ত একটি উদ্ভিদ। এর বিষ স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে পেশির নিয়ন্ত্রণ ও শ্বাসপ্রশ্বাসে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হেমলকের বিষ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াটার হেমলকও অত্যন্ত বিষাক্ত; এর বিষক্রিয়ায় খিঁচুনি ও প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে।
দেখতে সুন্দর হলেও এসব ফুল বা গাছের কোনও অংশই মুখে দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে শিশু ও পোষ্য প্রাণীদের নাগালের বাইরে রাখা জরুরি। ভুল করে কোনও বিষাক্ত গাছের অংশ খেয়ে ফেললে উপসর্গের অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।











