বিশ্ব দত্তক গ্রহণ দিবস: রক্তের সম্পর্ক নয়, ভালোবাসাই গড়ে পরিবার
সাকিবুর রহমান বাবলা
একটি শিশুর জীবনে সবচেয়ে বড় আশ্রয় পরিবার। সেখানে সে পায় নিরাপত্তা, ভালোবাসা, স্নেহ, যত্ন ও বেড়ে ওঠার নিশ্চয়তা। কিন্তু পৃথিবীতে অসংখ্য শিশু রয়েছে, যারা নানা কারণে জন্মপরিবারের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত। তাদের অনেকেই অপেক্ষায় থাকে একটি নিরাপদ আশ্রয় ও স্থায়ী পরিবারের। অন্যদিকে, অনেক পরিবারও একটি শিশুকে ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তোলার স্বপ্ন দেখে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে মানবিক সেতুবন্ধ তৈরি করে দত্তক গ্রহণ। পরিবার গঠন, দত্তক নেওয়া শিশুর অধিকার ও কল্যাণ এবং দত্তক পরিবারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে ৯ নভেম্বর পালিত হয় বিশ্ব দত্তক গ্রহণ দিবস।
২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের সমাজকর্মী হ্যাঙ্ক ফোর্টেনার ও তাঁর কয়েকজন বন্ধুর উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হয়। তিনি ‘অ্যাডপ্ট টুগেদার’ নামের দত্তক গ্রহণে আর্থিক সহায়তাবিষয়ক একটি ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নিজের পরিবার বিভিন্ন দেশ থেকে আটটি শিশুকে দত্তক নিয়েছিল এবং ৩৬টি শিশুকে পালক পরিচর্যায় (ফস্টার কেয়ার) লালন-পালন করেছিল। এ অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি দত্তক গ্রহণ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেন। দিবসটির মূল দর্শন—একটি শিশুও যেন পরিবারহীন না থাকে; প্রতিটি শিশুর জন্য নিশ্চিত হোক একটি নিরাপদ পরিবার।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ২১ অনুচ্ছেদে দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দত্তক প্রক্রিয়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় সম্মতি ও আইনগত সুরক্ষার ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়া জরুরি। ১৯৯৩ সালের হেগ দত্তক কনভেনশন আন্তর্জাতিক দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে শিশুপাচার, অবৈধ লেনদেন ও অনিয়ম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ এ কনভেনশনের সদস্য নয়। আন্তর্জাতিক নীতিতে অন্য দেশে দত্তক দেওয়ার আগে শিশুকে নিজ দেশেই উপযুক্ত পরিবারে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশে দত্তক গ্রহণের আইনি বিষয়টি কিছুটা জটিল। এখানে সব ধর্মের মানুষের জন্য অভিন্ন পূর্ণাঙ্গ দত্তক আইন নেই। ১৮৯০ সালের অভিভাবকত্ব ও প্রতিপালন আইন (গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইনের আলোকে শিশুর অভিভাবকত্বের বিষয়টি বিবেচিত হয়। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে প্রচলিত অর্থে পূর্ণাঙ্গ দত্তক স্বীকৃত নয়; তবে আইনগত অভিভাবকত্বের মাধ্যমে শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিশুর জন্মপরিচয় ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয় না। হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে প্রথাগত দত্তক গ্রহণের বিধান থাকলেও তা সবার জন্য প্রযোজ্য অভিন্ন আইনি কাঠামো নয়। শিশুর অভিভাবকত্ব নির্ধারণে আদালত তার কল্যাণ, অভিভাবকের সক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে। শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পত্তির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈধ দান বা উইলের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইনি সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বাংলাদেশের সমাজে দত্তক গ্রহণ নিয়ে রয়েছে নানা সংকোচ ও কুসংস্কার। অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছে বিষয়টি গোপন রাখতে চান। রক্তের সম্পর্ক ও বংশপরিচয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কারণে পালিত শিশুকে কখনো কখনো অবহেলা বা কটূক্তির শিকার হতে হয়। নবজাতক শিশু গ্রহণের প্রতি আগ্রহ, ছেলে-মেয়ে নির্বাচনে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথার প্রভাব এবং হাসপাতাল বা পরিচিতজনের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে শিশু নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। অথচ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র ছাড়া শিশুর জন্মনিবন্ধন, পরিচয়, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দত্তক গ্রহণ শিশুর জীবনে নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আত্মবিশ্বাসের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর সঙ্গে পরিচয়সংকট, জন্মপরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা কিংবা আবার পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কার মতো অনুভূতিও যুক্ত হতে পারে। তাই শিশুর বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা অনুযায়ী ছোটবেলা থেকেই সহজ, সত্যনিষ্ঠ ও ভালোবাসাপূর্ণ ভাষায় তাকে তার দত্তক পরিচয় জানানো উচিত। বিষয়টি গোপন রাখা বা হঠাৎ করে প্রকাশ করা ঠিক নয়। শিশুর জন্মপরিচয়, অনুভূতি ও প্রশ্নকে সম্মান করতে হবে। প্রয়োজনে শিশু মনোবিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
দত্তক মা-বাবার ক্ষেত্রেও নতুন পরিবেশে শিশুকে মানিয়ে নেওয়া, আইনি অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপ মোকাবিলার প্রয়োজন হয়। জন্মদাত্রী মায়ের জীবনেও সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা, অপরাধবোধ কিংবা সন্তান নিরাপদে আছে জেনে স্বস্তির মতো নানা অনুভূতি কাজ করতে পারে। তাই দত্তক গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার মানসিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী দত্তক গ্রহণের চিত্রেও পরিবর্তন ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র একসময় আন্তর্জাতিক দত্তক গ্রহণের অন্যতম প্রধান দেশ ছিল। তবে ২০০৪ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে দেশটিতে আন্তর্জাতিক দত্তক গ্রহণের সংখ্যা প্রায় ৯৪ শতাংশ কমেছে। চীন, ভারত, কলম্বিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক দত্তক গ্রহণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে উৎস ও গ্রহণকারী দেশের অবস্থান বছর, আইন এবং পরিসংখ্যানের সংজ্ঞাভেদে পরিবর্তিত হয়। শিশুপাচার প্রতিরোধ, কঠোর যাচাই-বাছাই এবং নিজ দেশেই শিশুর পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক দত্তক গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দত্তক গ্রহণ কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়; এটি একটি শিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্বশীল মানবিক সিদ্ধান্ত। সন্তানহীনতার সামাজিক চাপ থেকে মুক্তি কিংবা মাতৃত্ব-পিতৃত্বের আনন্দ পাওয়ার পাশাপাশি দত্তক গ্রহণের কেন্দ্রে থাকতে হবে শিশুর প্রয়োজন ও কল্যাণকে। এ জন্য বাংলাদেশে সুস্পষ্ট ও শিশুবান্ধব আইনগত কাঠামো, সহজ ও স্বচ্ছ অভিভাবকত্ব প্রক্রিয়া, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবার কেবল রক্তের বন্ধনে তৈরি হয় না; ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, মমতা ও নির্ভরতার মধ্য দিয়েও গড়ে ওঠে আজীবনের আত্মিক সম্পর্ক। প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবার নিশ্চিত করাই হোক বিশ্ব দত্তক গ্রহণ দিবসের অঙ্গীকার।












