রোনালদো বিশ্বকাপ জিতলে কে হবেন ‘বিশ্বসেরা’?
২০০০ সালের আগের ফুটবল বিশ্ব বিভক্ত ছিল দুটো নামে—পেলে নাকি ম্যারাডোনা? যুগ যুগ ধরে ধরে চলা সেই চিরন্তন বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে ফুটবল মাঠে আবির্ভাব ঘটেছিল দুই ভিন গ্রহের ফুটবলারের- লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বিগত দেড় দশক ধরে এই দুই জন মিলে পেলে-ম্যারাডোনা যুগের সেই পুরোনো বিতর্ককে ইতিহাস বানিয়ে ফুটবল বিশ্বকে এক আধুনিক দ্বৈরথ উপহার দিয়েছেন।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার পর ফুটবল দুনিয়ার একটা বড় অংশ রায় দিয়ে দিয়েছিল—”The GOAT debate is over!” অর্থাৎ, সর্বকালের সেরার বিতর্ক শেষ। কিন্তু আসলেই কি শেষ? ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের বর্তমান ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ স্কোয়াড এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ‘শেষ সুযোগের’ দিকে তাকালে নতুন একটা সমীকরণ সামনে আসে।
ধরে নেওয়া যাক, ২০২৬ সালে পর্তুগাল বিশ্বজয় করলো এবং রোনালদো তার অধরা বিশ্বকাপটি পেয়ে গেলেন। তাহলে কি রোনালদো এককভাবে মেসির চেয়ে এগিয়ে ‘গোট’ হতে পারবেন? ফুটবলীয় বিশ্লেষণ এবং যুক্তি বলছে—না, তাও ক্রিস্টিয়ানো এককভাবে সর্বকালের সেরা হতে পারবেন না। এর পেছনে রয়েছে কিছু কারণ-
‘ওয়ান-ম্যান আর্মি’ বনাম ‘টিম এফোর্ট’
২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল কিন্তু কাগজে-কলমে সেরা ছিল না। মেসি প্রায় একাই (৭টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করে) পুরো দলকে টেনে ফাইনালে নিয়ে গেছেন এবং চ্যাম্পিয়ন করেছেন।
অন্যদিকে, বর্তমান পর্তুগাল দল ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে শক্তিশালী এবং তারকাবহুল দল। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, ভিতিনহা, হোয়াও নেভেস, রুবেন দিয়াজ কিংবা রাফায়েল লিয়াওদের নিয়ে গড়া এই দল যেকোনও পজিশনেই বিশ্বসেরা। এই দলে রোনালদোর ভূমিকা হয়তো হবে একজন দুর্দান্ত ফিনিশারের, কিন্তু মেসির মতো পুরো দলকে মাঝমাঠ থেকে তৈরি করে টেনে নেওয়ার মতো ভূমিকা এই বয়সে রোনালদোর পক্ষে অসম্ভব।
প্লে-মেকিং ও ফুটবলের নান্দনিকতা
ফুটবল শুধু সংখ্যার খেলা নয়, ফুটবল একটি শিল্প। রোনালদো ফুটবলের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা গোল স্কোরার এবং বক্স স্ট্রাইকার। তার গোল করার ক্ষমতা প্রশ্নাতীত।
মেসি একই সঙ্গে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন। পাশাপাশি ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোল সহায়তাকারী। আবার ফুটবলের ইতিহাসের সেরা প্লে-মেকার ও ড্রিবলারদের একজন।
রোনালদো ট্রফি জিতলে তার ভূমিকা থাকবে গোলে, কিন্তু মেসি ট্রফি জিতেছেন ফুটবলকে ডিফাইন করে। মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা, ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে বোকা বানানো এবং নিখুঁত পাসিংয়ের যে জাদু মেসির আছে, তা রোনালদোর ট্রফি ক্যাবিনেটে বিশ্বকাপ যোগ হলেও এগুলো অধরা।
ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ব্যবধান
ফুটবলে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি ধরা হয় ব্যালন ডি’অর-কে। মেসির ঝুলিতে আছে রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি’অর। রোনালদোর সংগ্রহে আছে ৫টি।
পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিতলেও ব্যক্তিগত এই অর্জনের বিশাল ব্যবধান (৩টি ব্যালন ডি’অর) ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না, যা মেসিকে সবসময়ই এককভাবে কিছুটা এগিয়ে রাখবে।
টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়
মেসি ২০২২ সালে শুধু বিশ্বকাপ জেতেননি, তিনি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন। এর আগে ২০১৪ সালেও একই গৌরব অর্জন করেছিলেন। বিশ্বকাপে মেসির এই একক আধিপত্য ফুটবলের ইতিহাসে বিরল। পর্তুগাল যদি বিশ্বকাপ জেতেও বর্তমান দলের শক্তির গভীরতার কারণে রোনালদোর এককভাবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হওয়া বা গোল্ডেন বল জেতার সম্ভাবনা বেশ কম।
পর্তুগাল যদি এবার বিশ্বকাপ জেতে, তবে ২০০০ সালের আগের পেলে-ম্যারাডোনার বিতর্ক যেমন স্থবির হয়ে গিয়েছিল, তেমনি মেসি-রোনালদোর আধুনিক বিতর্কটি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। রোনালদোর ফুটবলের সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত হবে। অনেকে মেসির পাশে বসাবেন কিংবা এগিয়েও রাখতে চাইবেন।
তারপরও যদি প্রশ্ন করা হয়—‘কে এককভাবে ইতিহাসের একমাত্র সেরা’- তাহলে ফুটবল রোমান্টিক, বিশ্লেষক এবং বোদ্ধাদের ভোটটি মেসির নান্দনিকতা, প্লে-মেকিং এবং ফুটবলীয় জাদুর কারণে আর্জেন্টাইন ১০ নম্বরের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকবে।









