বৈশাখ অতীত ও স্মৃতি
তাজ ইসলাম
আজ থেকে ৩০/৩২ বছর আগে নিজের গ্রামেই কাটত পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখে এখনকার মতো পান্তা ভাত, ইলিশ, বৈশাখী জামার স্মৃতি মনে পড়ে না। হালখাতার স্মৃতি মনে পড়ে। চার পাঁচ গ্রামে বৈশাখী মেলার কথাও মনে পড়ে না। জুগি নামে মদন গুনধরের একজন হিন্দু লোক ছিল। হাটবারে চুনের ব্যবসা করতেন। সম্ভবত আমরা চারআনা, আটআনার চুন কিনে আনতাম। গ্রামে কারও হাম, বসন্ত রোগ হলে এই জুগিকে নিয়ে আসা হত। ভাঙা সাইকেলে চড়ে তিনি বাড়িতে এসে ঝাড় ফুঁক দিয়ে যেতেন। হাম বসন্তে দু-তিন গ্রামে তার ফুঁক ছিল সবার পরিচিত। মুখে আদা চিবিয়ে নিজের মন্ত্র আওড়িয়ে রোগীর শরীরে ফুঁ দিয়ে ছড়িয়ে দিতেন। পহেলা বৈশাখে জুগি হালখাতা করতেন। ঝাড়ফুঁক দিলে যে যা দিতেম নিয়ে নিতেন। বৈশাখের আগে ঘরে ঘরে হালখাতার কার্ড পৌছে দিতেন। রোগীরা তার দাওয়াত কবুল করতেন। এমন এক বৈশাখে বাবার সাথে জুগি বাড়িতে হালখাতা খেতে গিয়েছিলাম। লাল চা আর টুস্ট বিস্কুট খেয়ে আসার স্মৃতি আছে। ঘোড়ার পিঠে শাড়ি পরা নারী মূর্তি তখনই প্রথম দেখা। তখনও বারুক বাজার ব্রীজ হয়নি। নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হত। বৈশাখে অবশ্য বারুক বাজার খাল শুকিয়ে পায়ে হাটার রাস্তা হয়ে থাকত। দু পাড় মনে হত পাহাড়ের মত খাড়া।বর্ষাকালে শুকনো খাল নদীর রূপ ধারণ করত। পারাপারের নির্ধারিত মাঝি থাকত। সারাবছর আশপাশের গ্রামের লোকদের বিনা পয়সায় তারা খাল পার করত। আমরা শৈশবে দেখেছি রতন খলিফার পরিবার ছিল এই দায়িত্বে।
মধ্য বৈশাখে প্রত্যেক ঘর থেকে তারা ধান নিয়ে আসত খাল পারাপারের পারিশ্রমিক হিসেবে।
বৈশাখে কয়েক গ্রামে মেলার কথা মনে পড়ে না। জয়কা, কান্দাইল, খোঁজারগাও, গুনধর, উরদিঘি, মদন, খয়রত এসব গ্রামে বৈশাখে বৈশাখী মেলা হওয়ার কোন স্মৃতি মনে পড়ে না। উল্লেখিত গ্রামগুলোতে তখন প্রচুর পরিমাণে মেলা বা বান্নি হত। এই মেলা/বান্নিগুলো মাঘ,ফালগুন,চৈত্রের প্রথম সপ্তাহে শেষ হয়ে যেত। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অল্প দূরে একটি বান্নি হত। আমরা সেসব বান্নিতে যেতাম। চৈত্র ও কার্তিক মাস ছিল কৃষি নির্ভর এলাকাগুলোতে আকালের সময়। কার্তিকের পরে অগ্রহায়ণ, চৈত্রের পরে বৈশাখে নতুন ধানে কৃষকের আকাল কমে যেত। কোন কোন সম্ভ্রান্ত কৃষকও এই সময় সংকটে পড়ে যেত। নতুন ফসলের আশায় সঞ্চিত ফসল বিক্রি করে এই সমস্যায় পড়ত। চৈত্র মাসের আকালে নাকাল হয়ে যেত অনেক পরিবার। কোন কোন কৃষক একটা জমিতে আগে কাটা যায় এমন ধান লাগাত। বগুড়া ধান নামে কালো এক জাতের ধান ছিল। এটি ফলন কম হলেও আগে আগে কাটা যেত। এক কৃষকের ধান কাটা হলে তিনি সে ধান ঘরে তুলতে পারতেন না। চাচাতো, জেঠাতো, পাড়াপড়শিরা ১০ সের,কুড়ি সের, একমণ করে হাওলাত নিয়ে যেত। সাত দিন, দশ দিনের মধ্যেই অন্যদের ধান কাটার উপযুক্ত হত। তখন ঘরে ঘরে আনন্দ বয়ে যেত। নতুন ধানের পয়লা চালের ক্ষির বৈশাখের শুক্রবারে মসজিদে মসজিদে পৌছে যেত। একদিনে কোন কোন শুক্রবারে আট দশ জনের ক্ষির পৌছত। লাল চিনির ক্ষির আমরা কলাপাতায় বাড়িতে নিয়ে আসতাম। ছোট ভাই বোনেরা শুক্রবারে ক্ষিরের অপেক্ষায় থাকত।
নতুন চালের প্রথম ভাত কলাপাতায় তিন রাস্তার মোড়ে, গোরস্থানে মা চাচীরা দিয়ে আসত। পরবর্তীতে এই সংস্কৃতি আমাদের কৈশোর পাড় হতে হতেই উদাও হয়ে গেছে।
বিষু আরবিষু নামে একটা দিন ছিল।এটা বৈশাখে না চৈত্রের শেষ দিন মনে নাই। এই দিন মা চাচীরা নানারকম লতাপাতার রসের মিশ্রণ তৈরী করতেন। ছোটদের জোর করে খাওয়াতেন। সে কী তিতা! এখনো মুখে লেগে আছে যেন।
বৈশাখে স্পেশাল কোন খাবার তৈরী না হলেও রেওয়াজ ছিল বছরের পয়লা দিন। এই দিন ভাল মন্দ খেলে সারাবছর ভাল যাবে। আমার মনে আছে বৈশাখ মাস শুরু হওয়ার আগে আমার মা আম খেতেন না। প্রথম পুতের মা পয়লা বৈশাখ না আসলে মা কাচা আম খেতেন না।আমার স্ত্রীকেও খাওয়ানো যায় না। মায়েদের আশঙ্কা পয়লা বৈশাখের আগে আম প্রথম পুতের মা আম খেলে পুত্রের অমঙ্গল হয়। এই খানে কোন যুক্তি তর্ক বুদ্ধি জ্ঞান দিয়ে আগাতে পারবেন না। এটা মাতৃত্বের দরদ। শর্তহীন মমতা।
পয়লা বৈশাখে আমার মা এক টুকরো কাঁচা আম মুখে দিতেন। মায়ের সামনে কত আম আমি আমরা খেতাম। মা মুখে নিতেন না। পয়লা বৈশাখের এই বিষয়টি আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। আমি চিচকাঁদোনে মানুষ বলেই কি না কে জানে মায়ের এমন ছোট বড় অনেক স্মৃতিতে আমি নীরবে কাঁদি। আহ মা! আর কত শত ত্যাগের বিনিময়ে বেড়ে ওঠা আমার জীবন। পয়লা বৈশাখের যাবতীয় স্মৃতি থেকে এই স্মৃতিটাই সবচেয়ে বড়, আমার কাছে। তখন টিভি, মোবাইল ছিল না। আজকের শহুরে সংস্কৃতি আস্তে আস্তে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। এখন মেলাও হয়তো হয়। মেলা না হলেও শহরের আরোপিত প্রায় সব বিষয়ই গ্রামে সংক্রমিত। বৈশাখী শাড়ি, বৈশাখী জামা, পান্তাভাত পালন না করলেও গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিশোর কিশোরী জানে। তারা উদযাপন করতেও চেষ্টা করে। সাংস্কৃতিক আয়োজনও বৃদ্ধি পেয়েছে। চৈত্রের শেষ দিন বৈশাখের শুরুর দিন উৎসবমুখর ছিল ফসলের আগমনে।নতুন ফসল আরও স্পষ্ট করে বলতে নতুন ধান উঠোনে আসার আনন্দে।
এরপর পুরো বৈশাখ ধান কাটা, মাড়াই করার রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা, বর্ষার নতুন পানির সাথে দ্রুত গতীতে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আনন্দ। জমি থেকে ধান উঠোনে, উঠোন থেকে গোলায় তোলার সংগ্রামমুখর আনন্দ। শহরের বৈশাখ আর গ্রামের বৈশাখে এখনও বহুত ফারাক। শহরে বৈশাখ আসে একদিন।গ্রামে বৈশাখ থাকে এক মাস। এই আনন্দ হালাল করে কৃষক, শ্রমিক, নারী, পুরুষ, শ্রমে ঘামে। তারা ধান গোলায় তুলে। শহরের মানুষ সারাবছর তা ভোগ করে। এই লেখাটা কেন লেখলাম? আমার অবস্থান থেকে আমার ফেলে আসা বৈশাখকে ২০২৬ এ হাজির করার উদ্দেশ্যে। ৩০/৩২ বছর আগে আমার মতো একজন অতিসাধারণ মানুষের অজপাড়া গাঁয়ে বৈশাখ ছিল ঠিক এমনই।
স্বাগতম বাংলা নববর্ষ।












