সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: বেতনার পলি ও কৃষকের জয়গান
সাতক্ষীরায় বেতনা নদীর তীরবর্তী জনপদে এখন যে সবুজ সমুদ্রের ঢেউ দেখা যাচ্ছে, তা কেবল এক মৌসুমের বোরো আবাদ নয়; বরং তা এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পর প্রকৃতির সাথে মানুষের সন্ধি স্থাপনের গল্প। গত কয়েক বছর ধরে জলজট আর পলির অভিশাপে যে মাটি ছিল পরিত্যক্ত, আজ সেখানে ব্রি-ধান ৮৮ আর ১০১ জাতের ধানের শীষ সোনার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হওয়া ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমির এই চিত্র বলে দিচ্ছে, অবরুদ্ধ জলাবদ্ধতার অবসান ঘটলে এই জনপদ কতটা উর্বর হয়ে উঠতে পারে।
বেতনা তীরের ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর আর ফিংড়ী ইউনিয়নের কৃষকেরা দীর্ঘ ৬-৭ বছর যে কষ্ট সয়েছেন, তা বর্ণনাতীত। পানির নিচে থাকা কচুরিপানা ও আগাছা পচে প্রাকৃতিকভাবে যে জৈব সার তৈরি হয়েছে, তা এবার ফলন বৃদ্ধিতে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘেরের জমিতে মাছ চাষের পর সেই পলিতে ধানের আবাদ করে দ্বিগুণ আয়ের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা এই অঞ্চলের কৃষি-অর্থনীতিতে নতুন এক মডেল হিসেবে দেখা দিতে পারে।
তবে এই সোনালী স্বপ্নের পথে এখনো কিছু কাঁটা রয়ে গেছে। কৃষকের প্রধান উদ্বেগের নাম এখন ‘ডিজেল সংকট’। বোরো আবাদ যেহেতু সম্পূর্ণ সেচ-নির্ভর, তাই শেষ মুহূর্তে তেলের অভাবে সেচ বিঘিœত হলে মাঠের ফসল মাঠেই জ্বলে যাওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। এছাড়া ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থামানো না গেলে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির সুফল তাদের ঘরে পুরোপুরি পৌঁছাবে না।
বেতনার তীরে এখন যে নতুনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তাকে টেকসই করতে হলে নদী খনন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। আমরা আশা করি, কৃষি বিভাগের সঠিক তদারকি আর প্রশাসনের ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরার কৃষকের এই ‘বাম্পার’ ফলন নির্বিঘেœ গোলায় উঠবে। বেতনার পলিভেজা মাটি যে সোনা ফলাতে পারে, এবার তার প্রমাণ মিলেছে। এখন প্রয়োজন কেবল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর কৃষকের মেহনতের সঠিক মূল্যায়ন।
বেতনার তীরে এই হাসি যেন শুধু এক মৌসুমের না হয়; এটি যেন হয় সাতক্ষীরার কৃষি বিপ্লবের স্থায়ী রূপরেখা।











