পিআইবির মাল্টিমিডিয়া, ফ্যাক্ট চেক ও এআই প্রশিক্ষণ: সময়ের এক জরুরি পদক্ষেপ
আজহারুল ইসলাম সাদী
প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উৎকর্ষের এই যুগে সংবাদমাধ্যমের কাজের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও গুজবের ভিড়ে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা এখন সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এমন এক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) ও তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী চলমান ‘মাল্টিমিডিয়া, ফ্যাক্ট চেক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)’ বিষয়ক তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
প্রযুক্তির এই সময়ে শুধু প্রথাগত সাংবাদিকতার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কঠিন। সময়ের দাবি মেনে পিআইবির এই আয়োজনে মূলত আধুনিক সাংবাদিকতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গÑমাল্টিমিডিয়া, ফ্যাক্ট চেকিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
আজকের দিনে ‘মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা’ হলো সংবাদ পরিবেশনের এমন এক সমন্বিত রূপ, যেখানে লেখার পাশাপাশি ছবি, ইনফোগ্রাফিক্স, অডিও ও ভিডিওর মতো একাধিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে সংবাদকে আরও আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। একজন মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকের কাজ শুধু মাঠ থেকে তথ্য আনা নয়, বরং অডিও-ভিডিও এডিটিং ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উপযোগী কনটেন্ট তৈরি করা।
একইভাবে, যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এখন সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঁচা তথ্য সংগ্রহ করার পর তা অপতথ্য বা বিভ্রান্তিকর কি না, তা যাচাই-বাছাই এবং বিশ্লেষণ শেষে জনবান্ধব সংবাদ হিসেবে রূপান্তর করার সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়াই হলো প্রকৃত সাংবাদিকতা।
অন্যদিকে, সংবাদকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রবেশ ঘটছে দ্রুত গতিতে। তথ্য অনুসন্ধান, বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ, কনটেন্ট তৈরি ও সম্পাদনা থেকে শুরু করে ছবির সত্যতা যাচাই—সবখানেই এখন এআই টুলের ব্যবহার বাড়ছে। তবে এআই যেমন কাজকে সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি ‘ডিপফেক’ বা ভুয়া তথ্যের বিস্তার বিশ্বজুড়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিক মানদ- ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিও এই প্রশিক্ষণে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।
এই ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ২৩ থেকে ২৫ জুন সাতক্ষীরা জেলায় তিন দিনব্যাপী এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে জেলার ৭০ জন সাংবাদিক অংশ নেন। এই আয়োজনে সাংবাদিকদের আধুনিক সাংবাদিকতার বিভিন্ন কৌশলের ওপর বাস্তবমুখী ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
কর্মশালাটিতে প্রশিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চ্যানেল ২৪-এর অনুষ্ঠান পরিচালক ও উপস্থাপক (আরটিভি ও একুশে টেলিভিশনের সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার) মো. জুলহাস কবীর, পিআইবির প্রশিক্ষক সাহানোয়ার সাইদ শাহীন, ‘হুম বাংলাদেশ’-এর ফ্যাক্ট চেকার ও এআই বিশেষজ্ঞ আলী আকবর (তাওসিফ আকবর) এবং দৈনিক ইত্তেফাকের রাজনৈতিক ও নির্বাচনবিষয়ক সম্পাদক মো. সাইদুর রহমান।
তিন দিনের এই সফল প্রশিক্ষণ শেষে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হাবিবুল ইসলাম হাবিব।
ডিজিটাল মাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার ধারা অব্যাহত রাখতে পিআইবির এই সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ সাংবাদিকদের পেশাগতভাবে আরও সমৃদ্ধ ও সচেতন করে তুলবেÑএটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট









