সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া ঘেরে রূপালী জয়গাঁথা
দীপঙ্কর বিশ্বাস
জানালার বাইরে তাকালে যেখানেই চোখ যায়, শুধু জল আর জল। তবে এ কোনো বন্যার জল নয়, এ হলো সাতক্ষীরার মানুষের ভাগ্য বদলের ‘তরল সোনা’। দিগন্ত বিস্তৃত এই জলরাশি আসলে একেকটি মৎস্য ঘের। সাতক্ষীরা জেলা আজ শুধু বাংলাদেশের মানচিত্রেই নয়, বরং বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পেয়েছে মৎস্য চাষের এক অনন্য রাজধানী হিসেবে। গলদা, বাগদা আর সাদা মাছের এই ত্রিমুখী বিপ্লব জেলার অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে আমূল।
একসময় যেসব জমিতে বছরে কেবল এক ফসল হতো, কিংবা নোনা জলের আগ্রাসনে যে জমিগুলো পড়ে থাকত, আজ সেখানে ঢেউ খেলছে রূপালী মাছের স্বপ্ন। স্থানীয় চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রম, মেধা আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সাতক্ষীরায় ঘটেছে এক নীরব মৎস্য বিপ্লব।
সাতক্ষীরার এই মৎস্য বিপ্লব কেবল মাছ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি তৈরি করেছে এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ।
১. ঘের প্রস্তুত করা, পোনা ছাড়া, খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে মাছ ধরা, বাজারজাতকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সব মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এই খাতে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি আয়ের বড় একটি উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. এখানকার বাগদা ও গলদা চিংড়ি ‘হোয়াইট গোল্ড’ বা সাদা সোনা হিসেবে খ্যাত। ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাতক্ষীরার চিংড়ি রপ্তানি হয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বয়ে আনছে।
৩. চিংড়ির পাশাপাশি রুই, কাতলা, মৃগেল, ভেটকি, পারশে ও ভাঙন মাছের মতো সাদা মাছের চাষও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রোটিনের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করছে এই জেলা।
ঐতিহ্যবাহী সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে সাতক্ষীরার চাষিরা এখন অনেক বেশি বিজ্ঞানমনস্ক। সরকারের মৎস্য বিভাগ এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় তারা শিখছেন আধুনিক চাষ পদ্ধতি।
ঘেরে আধুনিক ‘এয়ারেটর’ ব্যবহার করে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখা, মানসম্মত ভাইরাসমুক্ত পোনা নির্বাচন এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে ঘের ব্যবস্থাপনা চাষিদের লোকসানের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে।
পাশাপাশি, একই ঘেরে মাছের সাথে ধান এবং ঘেরের বেড়িতে সবজি চাষের যে ‘সমন্বিত মডেল’ সাতক্ষীরায় জনপ্রিয় হয়েছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। একই জমি থেকে একই সাথে মাছ, ধান আর বিষমুক্ত সবজি উৎপাদিত হচ্ছে যা কৃষিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
অবশ্য এই রূপালী বিপ্লবের পথটা সবসময় মসৃণ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, আকস্মিক জলোচ্ছ্বাস, অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি এবং মাঝে মাঝে ভাইরাসের আক্রমণ চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে। রপ্তানি বাজারের নানা কঠোর নিয়মকানুন মেনে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সাতক্ষীরার মানুষ লড়াকু। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তারা দমে যাননি। ঘেরের আইল মেরামত করে, নতুন উদ্যমে পোনা ছেড়ে তারা আবার ঘুরে দাঁড়ান।
সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া ঘেরগুলো আজ শুধু মাছ চাষের স্থান নয়, এগুলো একেকটি সম্ভাবনার ক্যানভাস। এই বিপ্লবকে আরও টেকসই করতে প্রয়োজন সরকারি পর্যায়ে আরও বেশি হিমাগার স্থাপন, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি রপ্তানির স্থায়ী ব্যবস্থা করা।
বিকেলের সোনালী রোদে যখন ঘেরের জলে হাজার হাজার মাছের চালি একযোগে লাফিয়ে ওঠে, তখন মনে হয় এ যেন শুধু মাছ নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জয়ধ্বনি। সাতক্ষীরার এই রূপালী বিপ্লব আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।









