বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিক দিবস: হারানো খেলার পুনর্জাগরণ ও ক্রীড়া সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ
বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিক দিবস: হারানো খেলার পুনর্জাগরণ ও ক্রীড়া সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ
সাকিবুর রহমান বাবলা
সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে খেলাধুলা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। খেলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির পরিচয়, সংস্কৃতির ধারক, সামাজিক সংহতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির প্রতীক। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা। তাদের এই অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দিতেই প্রতি বছর ২ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিক দিবস’।
এই দিবসের পেছনে রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। ১৯২৪ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের প্যারিসে অলিম্পিক গেমস চলাকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন’। সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষা, সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এই সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ২ জুলাই এই দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে এআইপিএস বিশ্বের অন্যতম বড় পেশাজীবী সাংবাদিক সংগঠন। এতে ১৬০টিরও বেশি দেশের প্রায় ৯,৫০০-এর অধিক ক্রীড়া সাংবাদিক যুক্ত আছেন। পাঁচটি মহাদেশীয় অঞ্চলের মাধ্যমে পরিচালিত এই সংস্থার সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের ‘অলিম্পিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত লুসান শহরে অবস্থিত।
বাংলাদেশেও ১৯৯৫ সাল থেকে দিবসটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি এই আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে প্রতি বছর নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে। এদিন বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকরা বিশ্বের সাংবাদিকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং পেশাগত দায়বদ্ধতা ও ক্রীড়া সংস্কৃতির বিকাশে নিজেদের নতুন করে শপথ নেন।
ক্রীড়াঙ্গনের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুগে যুগে হাজার হাজার খেলার জন্ম হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে কয়েক হাজার খেলার প্রচলন রয়েছে। অলিম্পিক আন্দোলনের আওতায় ৩০টিরও বেশি প্রধান ক্রীড়া শাখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ফেডারেশনভুক্ত খেলার সংখ্যাও শতাধিক। কিন্তু এর বাইরেও রয়ে গেছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী অসংখ্য লোকজ ও আঞ্চলিক খেলা। কালের বিবর্তনে এসব খেলার অনেকগুলোই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
এই সংকটময় মুহূর্তে ক্রীড়া সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কেবল ম্যাচের স্কোর বা পদক জয়ের খবর পরিবেশন করেন না, বরং তারা ইতিহাসের ধারক এবং ঐতিহ্য সংরক্ষক। হারিয়ে যেতে থাকা কোনো খেলা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, গ্রামীণ ক্রীড়া উৎসবের ওপর প্রামাণ্যচিত্র বা ঐতিহ্যবাহী খেলার সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে ধারাবাহিক লেখনী জনমত গঠন ও নীতিনির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আধুনিক ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পডকাস্ট এবং অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে এখন খুব সহজেই স্থানীয় কোনো খেলাকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তাই আজকের ক্রীড়া সাংবাদিক কেবল সংবাদকর্মী নন; তিনি একাধারে গবেষক, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দূত, তিনি হতে পারেন ক্রীড়াসামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম কারিগর।
পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও ক্রীড়া সাংবাদিকদের একটি বড় দায়িত্ব। ম্যাচ ফিক্সিং, ডোপিং, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে সাহসী লেখনী ক্রীড়াঙ্গনকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে তারা খেলাধুলার ইতিবাচক সেই শক্তিকে সামনে নিয়ে আসেন, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে।
বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিক দিবস কেবল পেশাজীবীদের একটি দিন নয়; এটি খেলাধুলার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে এক সুতায় গাঁথার একটি অঙ্গীকার। মাঠে খেলোয়াড়রা ইতিহাস সৃষ্টি করেন, আর সাংবাদিকরা সেই ইতিহাসকে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দেন। তারা বিজয়ের আনন্দ, পরাজয়ের বেদনা এবং সংগ্রামের গল্পগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।
আজ যখন অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে, তখন ক্রীড়া সাংবাদিকদের কলম ও ক্যামেরাই হতে পারে সেই খেলার পুনর্জাগরণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। খেলাধুলার বৈচিত্র্য রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে ক্রীড়া সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিক দিবসে সকল ক্রীড়া সাংবাদিকের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তাদের নিরলস পরিশ্রম এবং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা কেবল ক্রীড়াজগতকেই সমৃদ্ধ করে না, বরং বিশ্বশান্তি ও সংস্কৃতির সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।









