মেকানিক্যাল পেন্সিল দিবস: হাতে লেখার ঐতিহ্য, নির্ভুলতা ও সৃজনশীলতার উদযাপন
সাকিবুর রহমান বাবলা
‘যেভাবে একটি সাধারণ লিড-পেন্সিল হয়ে উঠল সৃজনশীলতার প্রতীক।’ ৫ জুলাই ‘মেকানিক্যাল পেন্সিল দিবস’। সাধারণ একটি লেখার উপকরণকে ঘিরে দিবস পালনের বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু শিক্ষা, প্রকৌশল, নকশা, শিল্পচর্চা ও দৈনন্দিন লেখালেখিতে মেকানিক্যাল পেন্সিলের দীর্ঘ অবদানই এ দিবসের মূল প্রেরণা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্টেশনারি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান কাল্ট পেনস এ দিবসের সূচনা করে। ফাউন্টেন পেনের জন্য বিশেষ দিবস থাকলেও মেকানিক্যাল পেন্সিলের জন্য কোনো স্বীকৃত দিবস ছিল না। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
৫ জুলাই তারিখটি নির্বাচনের পেছনেও রয়েছে একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা। মেকানিক্যাল পেন্সিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি লিডের আকার হলো ০.৫ মিলিমিটার ও ০.৭ মিলিমিটার। পঞ্জিকা অনুযায়ী ৫ জুলাইকে (৫/৭) সংখ্যায় প্রকাশ করলে তা এই দুই বহুল ব্যবহৃত লিড সাইজের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।
মেকানিক্যাল পেন্সিলের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। ১৫৬৫ সালে সুইস বিজ্ঞানী কনরাড গেসনার এমন একটি লিড-হোল্ডার পেন্সিলের বিবরণ দেন, যেখানে গ্রাফাইট কাঠি আলাদাভাবে প্রবেশ করিয়ে ব্যবহার করা যেত। পরে ১৭৯১ সালে ডুবে যাওয়া ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস রয়্যাল জর্জ’-এর ধ্বংসাবশেষে প্রাচীন মেকানিক্যাল পেন্সিলের নিদর্শন পাওয়া যায়। আধুনিক রিফিলযোগ্য মেকানিক্যাল পেন্সিলের যাত্রা শুরু হয় ১৮২২ সালে, যখন ব্রিটিশ উদ্ভাবক জন আইজ্যাক হকিন্স এ ধরনের পেন্সিলের পেটেন্ট লাভ করেন। ১৯১৫ সালে জাপানি উদ্ভাবক তোকুজি হায়াকাওয়ার তৈরি ‘এভার-রেডি শার্প পেন্সিল’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর এই আবিষ্কারের নাম থেকেই পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘শার্প’ কর্পোরেশনের নামকরণ করা হয়। পরবর্তীকালে উন্নত লিড প্রযুক্তির কারণে মেকানিক্যাল পেন্সিল আরও কার্যকর ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মেকানিক্যাল পেন্সিলের প্রধান আকর্ষণ এর নির্ভুলতা ও ব্যবহারিক সুবিধা। কাঠের পেন্সিলের মতো এটি বারবার শার্প করতে হয় না। লিড শেষ হলে নতুন লিড ভরে একই পেন্সিল দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। ০.৩, ০.৫, ০.৭ বা ০.৯ মিলিমিটারের নির্দিষ্ট ব্যাসের লিড ব্যবহারের ফলে লেখার রেখার প্রস্থ সবসময় একই থাকে। এ কারণে স্থপতি, প্রকৌশলী, ডিজাইনার, কার্টুনিস্ট ও শিল্পীদের কাছে এটি বিশেষভাবে সমাদৃত।
পরিবেশগত দিক থেকেও মেকানিক্যাল পেন্সিল গুরুত্বপূর্ণ। একটি পেন্সিল বহুবার ব্যবহার করা যায় বলে কাঠের ব্যবহার ও বর্জ্য তুলনামূলকভাবে কম হয়। একই সঙ্গে ডিজিটাল যুগে হাতে লেখার অভ্যাস ক্রমশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ দিবস হস্তাক্ষর চর্চা, সৃজনশীল লেখালেখি ও অঙ্কনের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বিস্তৃত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মেকানিক্যাল পেন্সিল দেশের বাজারে সহজলভ্য হওয়ায় শিক্ষার্থী, স্থপতি ও পেশাজীবীদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে পেন্টেল, ইউনি, জেব্রা, ফেবার-কাস্টেল ও স্টেডলারের মতো ব্র্যান্ডের পণ্য সহজেই পাওয়া যায়।
বিশ্বব্যাপী মেকানিক্যাল পেন্সিল উৎপাদনে জাপানের পেন্টেল ও শার্প এবং জার্মানির ফেবার-কাস্টেল ও স্টেডলার বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। শিল্পকলার ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। নাইজেরিয়ান হাইপার-রিয়েলিস্ট শিল্পী আরিন্জি স্ট্যানলি এবং জাপানি শিল্পী কোয়েই ওহমোরি তাঁদের অসাধারণ পেন্সিলচিত্রের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তাঁদের সৃষ্টিকর্ম দেখায় যে, একটি সাধারণ পেন্সিলও অসাধারণ শিল্পসৃষ্টির শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
মেকানিক্যাল পেন্সিল দিবস মূলত একটি সাধারণ লেখনীকে ঘিরে উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের স্মারক। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগেও এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিক্ষা, নকশা, শিল্প ও চিন্তার বিকাশে একটি ছোট পেন্সিলের অবদান কোনভাবেই ছোট নয়। তাই এ দিবস শুধু একটি লেখার সরঞ্জামের নয়; এটি হাতে লেখার ঐতিহ্য, নির্ভুলতা, সৃজনশীলতা এবং মানব উদ্ভাবনী শক্তির এক অর্থবহ উদযাপন।









