হেমলকের নিমন্ত্রণ ও মুক্তচিন্তার চিরন্তন সংকট
তারিক ইসলাম
ইতিহাসের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে। সে কখনো নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে, আবার কখনো দূর অতীতের আয়নায় আমাদের বর্তমানকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। বর্তমান সময়ের কথাসাহিত্যিক ও কূটনীতিক সুজন দেবনাথের ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ উপন্যাসটি পড়তে পড়তে ঠিক এই অনুভূতিটাই বারবার চড়া দিয়ে ওঠে। বইটি আপাতদৃষ্টিতে আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন গ্রিসের ক্লাসিক্যাল যুগ, বিশেষ করে এথেন্সের জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্মলগ্নের এক মহাকাব্যিক আখ্যান। কিন্তু এর পাতাগুলো যত উল্টানো যায়, ততই মনে হয়-লেখক আসলে সুদূর অতীতের গল্প বলতে গিয়ে আমাদের চেনা এই একুশ শতকের (কিংবা বলা ভালো যেকোনো শতকের) সমাজটাকেই ব্যবচ্ছেদ করছেন।
আজকের আধুনিক সভ্যতার যে কয়টি শক্তিশালী স্তম্ভ-দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, থিয়েটার, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং সবচেয়ে বড় কথা ‘গণতন্ত্র’-তার আঁতুড়ঘর ছিল এথেন্স। সক্রেটিস, প্লেটো, হিপোক্রাটিস, হেরোডোটাস কিংবা সফোক্লিসের মতো মহাপ্রতিভাধর মানুষেরা কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে এগুলো রাতারাতি তৈরি করেননি। বইটিতে লেখক দেখিয়েছেন, এটি ছিল একদল রক্ত-মাংসের মানুষের অদ্ভুত, মধুর ও জেদি এক পাগলামি। তারা সমাজকে অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন।
কিন্তু এই বইয়ের আসল দর্শন লুকিয়ে আছে এর নামকরণে-‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সমাজকে যারা যখনই নতুন আলো দেখাতে চেয়েছেন, প্রচলিত কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের দেয়ালে আঘাত করেছেন, তাদেরই কোনো না কোনোভাবে এক পেয়ালা বিষ কিংবা চরম দন্ড উপহার দেওয়া হয়েছে। সক্রেটিসকে হেমলক পানে বাধ্য করা হয়েছিল, কারণ তিনি যুবসমাজকে ‘নষ্ট’ করছিলেন-শাসকগোষ্ঠীর চোখে এই ‘নষ্ট’ করার অর্থ ছিল আসলে যুবসমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানো, চারপাশের অন্যায় ও অযৌক্তিকতাকে চ্যালেঞ্জ করতে শেখানো।
প্রশ্ন হলো, আড়াই হাজার বছর আগের এথেন্সের সেই সংকট কি আজ একুশ শতকে এসে ফুরিয়ে গেছে? আমরা কি আজ এক মুক্ত, পরমতসহিষ্ণু ও যুক্তিবাদী সমাজে বাস করছি? উত্তরটা বোধহয় খুব একটা ইতিবাচক নয়।
বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, মুক্তচিন্তা ও সত্য প্রকাশের পথ আজও কতটা কণ্টকাকীর্ণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এই যুগে দাঁড়িয়েও মানুষ প্রতিনিয়ত গুজব, উগ্রতা, আর অন্ধত্বের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে যেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ থাকার কথা, সেখানে আমরা দেখছি ভিন্নমতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা ও ডিজিটাল মব ট্রায়ালের সংস্কৃতি। সমাজ বা ব্যবস্থার ভুলত্রুটি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে, কিংবা সত্যের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালে আজও তাকে কোনো না কোনোভাবে অদৃশ্য ‘হেমলকের পেয়ালা’র মুখোমুখি হতে হয়-তা কখনো সামাজিক বয়কট, কখনো আইনি জটিলতা, আবার কখনো বা প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নিগ্রহের মাধ্যমে।
উপন্যাসের এক জায়গায় দেখা যায়, প্লেটো শরীরহীন এক পবিত্র ‘প্লেটোনিক প্রেম’ খুঁজছেন, অন্যদিকে সক্রেটিস সাধারণ মানুষের মনে যুক্তির বীজ বুনে দিচ্ছেন। আজ আমাদের সমাজেও এমন একদল মানুষের বড় প্রয়োজন, যারা স্্েরাতের বিপরীতে হেঁটে সমাজকে সত্যের পথ দেখাবেন। যারা পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু সংকট, নৈতিক অবক্ষয় আর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবেন। গণতন্ত্রের যে প্রাথমিক রূপটি এথেন্সে গড়ে উঠেছিল, তা-ও কিন্তু নিষ্কণ্টক ছিল না। সেখানেও ছিল ক্ষমতার দম্ভ আর চাটুকারিতার খেলা। আজকের পৃথিবীতেও আমরা যখন তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে একধরনের ছদ্ম-স্বৈরাচারী মানসিকতা চারপাশ জুড়ে দেখি, তখন ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
সুজন দেবনাথের এই বইটি কেবল ইতিহাসের রস আসাদনের জন্য নয়। এটি মূলত একটি মৃদু চপেটাঘাত, যা আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধত্ব আর কূপমন্ডূকতা দূর করতে হলে সমাজকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে হবে। আর সেই সত্যের পথে চলতে গিয়ে যদি কখনো ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ আসে, তবে সেই বিষপাত্রকে অমৃত মনে করে গ্রহণ করার মতো moral courage বা নৈতিক সাহসও সমাজকে অর্জন করতে হবে। তবেই একটা সভ্যতা বেঁচে থাকে, তবেই জন্ম নেয় নতুন কোনো রেনেসাঁস।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।












