দেওবন্দের উত্তরাধিকার, নাকি শুধু পরিচয়ের রাজনীতি?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
বাংলাদেশের কওমি ধারার ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তা, শিক্ষা ও ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচয় দেয়। এই পরিচয় নিছক একটি সাংগঠনিক পরিচয় নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও। কারণ দেওবন্দের নাম উচ্চারণ মানে কেবল একটি মাদ্রাসার ইতিহাস তুলে ধরা নয় বরং ইলম, তাকওয়া, আমানতদারিত্ব, আত্মত্যাগ, শূরা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্বের এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার কতটা মিল রয়েছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ কওমি ঘরানার পরিচয় বহনকারী কিছু রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক চর্চা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিনির্ভরতা, যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে গোষ্ঠীগত প্রভাব এবং শূরার পরিবর্তে সীমিত পরিসরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রাধান্য পায়। যদি এ ধরনের চর্চা সত্যিই বিস্তৃত হয়, তবে তা দেওবন্দি ঐতিহ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
দেওবন্দের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে ইলম ও চরিত্রকে নেতৃত্বের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মতভিন্নতাকে শত্রুতা হিসেবে নয়, বরং জ্ঞানচর্চার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় কখনো কখনো এমন অভিযোগ শোনা যায় যে সমালোচনাকে নিরুৎসাহিত করা হয়, ভিন্নমতকে অবিশ্বাসের চোখে দেখা হয়, এবং সাংগঠনিক মূল্যায়নে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা গোষ্ঠীগত প্রভাবের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত, তবে প্রশ্নগুলোকে অগ্রাহ্য করলেও সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আচরণে, সিদ্ধান্তে এবং নেতৃত্বের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। তাই কোনো রাজনৈতিক দল যদি নিজেকে দেওবন্দের উত্তরসূরি বলে পরিচয় দেয়, তবে জনগণেরও অধিকার আছে জানতে তাদের সাংগঠনিক সংস্কৃতি, নেতৃত্ব নির্বাচন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক মানদ- কতটা সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
আদর্শের দাবি যত বড়, আত্মসমালোচনার দায়ও তত বড়। ইসলামের নামে রাজনীতি করলে ইসলামের নৈতিক মানদ-ও মেনে চলতে হবে। অন্যদের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করার আগে নিজেদের ভেতরে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও শূরার চর্চা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় “দেওবন্দের উত্তরাধিকার” কেবল একটি পরিচয় হয়ে থাকবে, আদর্শ নয়।
ইতিহাসে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ধারার মর্যাদা শুধু তার নামের কারণে টিকে থাকে না; টিকে থাকে তার অনুসারীদের চরিত্র, নৈতিকতা এবং কর্মের মাধ্যমে। তাই আজ প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা একটি দলকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি হলো দেওবন্দের যে আদর্শের কথা বলা হয়, তা কি বাস্তবে রাজনৈতিক জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে জনগণের আস্থা নির্ধারণ করবে।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা








