নিরাপদ খাদ্যের শ্যামল ভান্ডার : আমাদের সাতক্ষীরা
আখলাকুর রহমান
ইছামতীর বুক ছুঁয়ে আসা ভোরের বাতাস যখন বেতবনের পাতা কাঁপিয়ে সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ মাঠে গিয়ে আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় এ যেন মহান রবের এক অসীম নেয়ামতের চাদর। যে মাটিতে হাত রাখলেই রিজিকের সন্ধান মেলে, সেই মাটিকে বিষমুক্ত রেখে মানুষের পাতে খাঁটি ও হালাল খাবার তুলে দেওয়ার এক নীরব সাধনা আজ এই অঞ্চলের প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে।
এই মাটির একটা নিজস্ব ভাষা আছে, যা আমরা রাসায়নিকের তীব্র গন্ধে প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। কিন্তু আবার সময় এসেছে আল্লাহ তাআলার দেওয়া সেই আদি ও অকৃত্রিম রূপটিকে ফিরিয়ে আনার। আমাদের সাতক্ষীরার যে ঐতিহ্যবাহী ধান, তা আজ অতিরিক্ত কীটনাশকের বিষাক্ত বলয় থেকে মুক্তি পেতে চাইছে।
প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে শস্য রক্ষার অদ্ভুত সব কুদরতি দাওয়াই। প্রাচীনকালের সেই আলোক ফাঁদ কিংবা ক্ষেতের মাঝে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার যে পার্চিং পদ্ধতি, তা কেবল আদিম কোনো নিয়ম নয়। এটি প্রকৃতির সাথে মিতালির এক সুন্দর উপায়। ধানক্ষেতে যখন ক্ষতিকর পোকা দমনে বন্ধু পোকারা আপনমনে কাজ করে, তখন কোনো কৃত্রিম বিষের প্রয়োজন পড়ে না। নিমপাতার রস কিংবা মেহগনির ফলের নির্যাস দিয়ে তৈরি ভেষজ বালাইনাশক যখন ধানের গায়ে ছিটানো হয়, তখন ধানের শিষগুলো যেন বিষমুক্ত বাতাসে শান্তিতে মাথা দোলায়।
মাধবকাটি কিংবা ইন্দিরার মতো উর্বর পলিমাটির অঞ্চলগুলোতে গেলে চোখ জুড়িয়ে যায় সবুজ সবজির সমারোহ দেখে। পটোল, বেগুন আর ঝিঙের সেই আদি স্বাদ ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের রাসায়নিক সারের মোহ ত্যাগ করতেই হবে। গোবর, খড়কুটো আর কচুরিপানা পচিয়ে তৈরি করা কেঁচো কম্পোস্টের ব্যবহারে মাটির পুষ্টি ফেরে চিরচেনা উপায়ে।
বিষাক্ত কীটনাশকের বদলে আধুনিক উপায়ে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে যখন ক্ষতিকর পোকা দমন করা হয়, তখন সবজির লতাগুলো কোনো বিষের দাগ ছাড়াই বেড়ে ওঠে। ইন্দিরার মাঠের সেই তাজা বেগুন কিংবা মাধবকাটির পটোলে যখন কোনো ক্ষতিকর উপাদানের ছোঁয়া থাকে না, তখন তা কেবল খাদ্য থাকে না, হয়ে ওঠে মহান আল্লাহর দরবার থেকে আসা পবিত্র এক উপহার।
সাতক্ষীরার মূল চালিকাশক্তি লুকিয়ে আছে তার সাদা মাছের বিল আর চিংড়ির ঘেরগুলোতে। লোনা আর মিঠা পানির এই মিলনমেলায় রূপালী ফসলের যে জৌলুস, তাকে বাঁচাতে হবে মানুষের লোভের আগ্রাসন থেকে। চিংড়িতে ক্ষতিকর পুশ করে অধিক মুনাফা লাভের যে অনৈতিক প্রবণতা, তা আসলে আমাদের নিজেদের সমাজ ও বিশ্বাসকেই ধ্বংস করছে। ঘেরের পানিতে যত্রতত্র রাসায়নিক সার না ঢেলে যদি প্রাকৃতিক উপায়ে শৈবাল তৈরির জন্য খৈল বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা হয়, তবে মাছ তার স্বাভাবিক নিয়মেই পুষ্ট হয়ে ওঠে।
সাদা মাছের চাষে কোনো কৃত্রিম হরমোন বা অ্যান্টিবায়োটিকের আশ্রয় না নিয়ে, জলাশয়ের চারপাশে নিমগাছ রোপণ করে পানির গুণাগুণ প্রাকৃতিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব। ঘেরের পাড়ে যখন আপনমনে ডালিম কিংবা সজনে গাছ বেড়ে ওঠে, তখন তার ছায়ায় মাছেরা কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক ছাড়াই বুক ভরে অক্সিজেন নেয়।
সাতক্ষীরা কেবল একটি মানচিত্রের নাম নয়, এটি এক পরম আমানতের নাম। কপোতাক্ষ আর ইছামতীর জলহাওয়া দিয়ে সৃষ্টিকর্তা যে মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাদের দায়িত্ব এখন এই মাটির সততাকে রক্ষা করা। আমাদের ঘরের সন্তানটি যেন বিষহীন এক মুঠো ভাত আর রাসায়নিকমুক্ত এক টুকরো মাছ খেয়ে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে, সেই সুন্দর ও পুণ্যময় সমাজ গঠনই হোক আজকের সাতক্ষীরার আসল প্রতিজ্ঞা। লেখক : উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা








