কালিগঞ্জে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সুশীলদের সাথে জেলা প্রশাসকের মতবিনিময়
আখলাকুর রহমান
মরুভূমির বুক চিরে যে বাণিজ্য কাফেলা একদিন সিরিয়া থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত ছুটে চলত, সেই কাফেলার প্রতিটি উটের পিঠে চাপানো ছিল কেবল পণ্য নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ অর্থনীতির বীজ। মক্কা তখন আরব উপদ্বীপের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। আর সেই মক্কার বুকেই বেড়ে উঠেছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর সততা আর ন্যায়পরায়ণতা তাঁকে অল্প বয়সেই উপাধি এনে দিয়েছিল আল আমিন, অর্থাৎ বিশ্বস্ত। সেই মানুষটিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
নবুওয়াত লাভের আগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তিনি হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার বাণিজ্যিক কাফেলা পরিচালনা করে সিরিয়া পর্যন্ত গিয়েছিলেন। তাঁর সততা, ওজনে কারচুপি না করা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুণে মুগ্ধ হয়ে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এখান থেকেই বোঝা যায়, ইসলামি ব্যবসার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল সততা এবং আমানতদারিতার উপর, লাভের অন্ধ প্রতিযোগিতার উপর নয়।
সাহাবিরা মূলত তিনটি পথে পণ্য সংগ্রহ করতেন। প্রথমত, নিজেরাই দূরদেশ থেকে কাফেলার মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতেন, যেমন সিরিয়া থেকে কাপড়, ইয়েমেন থেকে চামড়া ও সুগন্ধি, ইরাক থেকে খেজুর ও শস্য। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় কৃষক ও কারিগরদের কাছ থেকে পাইকারি দরে পণ্য কিনে পুনরায় বিক্রি করতেন। তৃতীয়ত, অনেকে যৌথ মূলধনে বাণিজ্য পরিচালনা করতেন, যাকে বলা হয় মুদারাবা। এই পদ্ধতিতে একজন মূলধন দিতেন, অন্যজন শ্রম ও দক্ষতা দিতেন, আর লাভ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হতো। এই মুদারাবা পদ্ধতিই আধুনিক যুগের অংশীদারি ব্যবসার প্রাচীন রূপ বলে বিবেচিত হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজার তদারকি করতেন এবং প্রতারণামূলক লেনদেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। একবার তিনি এক শস্য বিক্রেতার স্তূপে হাত ঢুকিয়ে দেখেন ভেতরে ভেজা শস্য লুকানো আছে, অথচ উপরের অংশ শুকনো দেখানো হয়েছে। তখন তিনি বলেছিলেন, যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। এছাড়া তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন গারার অর্থাৎ অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেন, মজুতদারি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, এবং ক্রেতা শহরে প্রবেশের আগেই পণ্য কিনে নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া। সুদভিত্তিক লেনদেনও সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছিল, যা তৎকালীন আরব বাণিজ্যে প্রচলিত একটি বড় প্রথা ছিল।
যাঁরা ব্যবসা করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন সাহাবিদের মধ্যে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মদিনায় হিজরতের পর তিনি খালি হাতে এসেছিলেন, কিন্তু বাজারের পথ চিনিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন আনসারি ভাইয়ের কাছে, উপহার নয়। এরপর ব্যবসা করে তিনি এমন সম্পদের মালিক হন যে, তাঁর একটি বাণিজ্য কাফেলা মদিনায় প্রবেশ করলে গোটা শহর কেঁপে উঠত শব্দে। তিনি জীবদ্দশায় বহুবার সমুদয় সম্পদ আল্লাহর পথে দান করে দিয়েছিলেন।
হযরত উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী। মদিনায় পানির সংকটের সময় তিনি নিজের অর্থে রুমা কূপ কিনে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় তিনি একাই বিশাল অংকের অর্থ ও রসদ দান করেছিলেন, যা ইতিহাসে আজও স্মরণীয়।
হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজেও ছিলেন মক্কার প্রথম সারির নারী ব্যবসায়ী। তাঁর নিজস্ব বাণিজ্য কাফেলা ছিল, কর্মচারী ছিল, এবং তিনি নিজের বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতায় বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন।
সেই যুগের ব্যবসার মূলমন্ত্র ছিল সততা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, ওজনে নিখুঁততা এবং পারস্পরিক আস্থা। মুনাফা অর্জন নিষিদ্ধ ছিল না, বরং হালাল পথে ব্যবসা করে সম্পদশালী হওয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে সেই সম্পদের একটি বড় অংশ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করার নজির স্থাপন করে গেছেন সাহাবিরা। আজকের বাণিজ্যিক জগতে যখন প্রতারণা, ভেজাল ও অতিরিক্ত মুনাফালোভের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে, তখন রাসুলের যুগের এই ব্যবসায়িক আদর্শ আমাদের জন্য এক অমূল্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকতে পারে। লেখক: উদ্যোক্তা
নিকোলাস বিশ্বাস
আজ ২৫ জুলাই ২০২৬। বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাম্প্রতিক সিসিটিভি ভিডিও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি ছোট শিশু একটি পুকুরে ডুবন্ত অবস্থায় বাঁচার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে। অপরদিকে, আরেকটি শিশু ঐ পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো চিৎকার করছে এবং মরিয়া হয়ে পানিতে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে বন্ধুকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আশে-পাশে বাড়িঘর থাকলেও কেউ সেই আর্তনাদ শুনতে পায়নি। অবশেষে পাশের একটি বাড়ি থেকে একজন ব্যক্তি বেরিয়ে এসে উদ্ধার করতে এগিয়ে যান। কিন্তু শিশুটির শেষ পরিণতি কি হয়েছিল, তা ভিডিওটিতে আর জানা যায়নি।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়, অথচ অধিকাংশ ঘটনাই সংবাদ শিরোনামে আসে না। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবারের বেদনা। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হওয়া সত্ত্বেও পানিতে ডুবে মৃত্যু এখনো সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। সংক্রামক রোগ, অপুষ্টি কিংবা সড়ক দুর্ঘটনা জনস্বাস্থ্য আলোচনায় প্রাধান্য পেলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু রয়ে যায় আড়ালে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। এসব মৃত্যুর সর্বোচ্চ হার বরিশাল অঞ্চলে। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, জলাভূমি এবং মৌসুমি বন্যাপ্রবণ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। বিশ্বব্যাপী পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে এই ঝূঁকি আরো বেড়েছে।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিষয়: এই দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য বিষয় বেছে নেওয়া হয়। এবারের বিষয় হল: আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর গ্রোত থামাই। এটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য নয়; বরং পানির সঙ্গে আমাদের সহাবস্থানকে আরও নিরাপদ, সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলার একটি বৈশ্বিক আহ্বান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে পরিচালিত বিশ্বব্যাপী এ প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করে আসুন আমরা প্রতিরোধযোগ্য পানিতে ডুবে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করি এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় ভূমিকার পালন করি।
বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল, হাওর ও পুকুরে সমৃদ্ধ একটি জলভূমির দেশ। পানি আমাদের জীবন, জীবিকা, কৃষি, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের অভাবে এই জীবনদায়ী পানিই মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় শোক ও বেদনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিদিনের নীরব ঝুঁকি: জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ ঘটনা ঘটে বাড়ির কয়েক মিটারের মধ্যেই থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ে। অর্থাৎ বিপদ দূরে নয়, পরিবারের কাছেই ওত পেতে থাকে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ এ সময় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাড়ির আঙিনা, রাস্তা ও মাঠ সাময়িক জলাশয়ে পরিণত হয়। অল্প সময়ের জন্যও কোনো ছোট শিশু নজরদারির বাইরে চলে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অপূরণীয় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ সময়টায় সবাইকে বিশেষভাবে সর্তক থাকতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় অভিভাবকরা সাধারণতঃ গৃহস্থালি বা কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন, ফলে ছোট শিশুরা অরক্ষিত থেকে যায়। মাত্র দুই বা তিন মিনিটের অসতর্কতা একটি পরিবারের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে যা তাদের জন্য নিয়ে আসতে পারে গভীর শোক আর কান্না।
পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো এর নীরবতা। সিনেমায় যেমন দেখা যায়, বাস্তবে পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষ-বিশেষ করে শিশুরা – সাধারণতঃ হাত নেড়ে বা চিৎকার করে সাহায্য চাইতে পারে না। আশে-পাশের মানুষের অজান্তেই তারা নীরবে পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানিতে ডুবে মৃত্যুকে “নীরব কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট” হিসেবে অভিহিত করেছে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।
২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৫ জুলাইকে সারা বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতা ক্রমেই বাড়ছে। তাই পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে কেবল মৌসুমি উদ্যোগ নয়, জাতীয় জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারে পরিণত করা উচিৎ।
বাংলাদেশে অধিকাংশ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ পরিস্থিতিতে। বাড়ির পাশের পুকুর, রাস্তার ধারের ডোবা কিংবা বৃষ্টির পানিতে ভরা গর্ত মুহূর্তেই প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হয়। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী ও চলাফেরায় সক্রিয় হলেও তারা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারে না। এ সময় রান্না, কাপড় ধোয়া বা অন্য কোনো কাজে সামান্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে অভিভাবকের অজান্তেই শিশুটি ঝুঁকির মুখে পড়ে যা পরিবার ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের বৃহত্তম নদীবাহিত দেশগুলোর একটি হওয়ায় এখানে হাজার হাজার নদী, খাল, বিল ও জলাশয় রয়েছে। বর্ষাকালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘনঘন বন্যা চারপাশে নতুন নতুন ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় সৃষ্টি করে ও বিপদ ডেকে আনে। চলতি বছরের প্রবল বৃষ্টিপাত এ বিপদকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।
প্রতিরোধই একমাত্র সমাধান: গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সহজ ও লক্ষ্যভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। এ সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য নি¤েœ উল্লেখিত বিষয়গুলোর উপর দৃষ্টিপাত করা অতীব জরুরি:
১. ছোট শিশুদের কখনোই পানির কাছাকাছি একা না রাখা।
২. বাড়ির আশপাশের পুকুর ও ডোবার চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা বা বেড়া নির্মাণ করা।
৩. দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপন করা।
৪. বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সাঁতার শিক্ষা ও পানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা।
৫. জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধারকৌশল ও কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন-এর প্রশিক্ষণ দেওয়া।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে, এসব উদ্যোগ কার্যকর। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে পরিচালিত আঁচল (কমিউনিটি শিশুযতœ মডেল) এবং সুইমসেইফ (ঝরিসঝধভব) কর্মসূচি শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সফল হয়েছে। সমাধান আমাদের জানা আছে; এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দেশব্যাপী কার্যকর বাস্তবায়ন। গবেষণালব্ধ ফলাফল গুরুত্বের সাথে কাজে লাগানো উচিৎ।
পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-এই চারটি সরকারি খাতের সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্খিত ফল আসবে না।
সচেতনতা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ: বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; এটি হতে হবে বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা। বাংলাদেশকে এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ, গণসচেতনতামূলক প্রচার এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ- একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী কিংবা জাতীয় নেতা-যার স্বপ্ন অকালেই নিভে যায়।
পানিতে ডুবে কোনো শিশুর মৃত্যু কখনোই কাম্য হতে না। সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ, নিরাপত্তা শিক্ষা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারে এবং এই নীরব সংকট তথা পানিতে ডুবে মৃত্যুর অবসান ঘটাতে সক্ষম হবে। প্রতিটি শিশুর জীবনই অমূল্য, কোনো অবস্থাতেই সেই জীবনের মূল্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
লেখক: একজন ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সুস্বাস্থ্য। সুস্থ শরীর, স্থিতিশীল মন এবং সুষম জীবনযাপন একজন মানুষকে কর্মক্ষম, উৎপাদনশীল ও সুখী করে তোলে। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভরতা, মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে বিশ্বজুড়ে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে আত্ম-যতœ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ২৪ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক আত্ম-যতœ দিবস।
দিবসটির সূচনা করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেলফ-কেয়ার ফাউন্ডেশন। ২৪ জুলাই বা ২৪/৭ তারিখটি প্রতীকীভাবে নির্দেশ করে যে সুস্থতা রক্ষায় দিনে ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহের ৭ দিনই নিজের যতœ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২৪ জুন থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত পালিত ‘সেলফ-কেয়ার মান্থ’-এর সমাপনী দিন হিসেবেও দিবসটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং দৈনন্দিন জীবনে এমন অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা, যা সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
আত্ম-যতেœর ধারণা আধুনিক বিশ্বের সৃষ্টি নয়; এর শিকড় মানবসভ্যতার বহু পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সমাজে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নানা পদ্ধতি ও রেওয়াজ গড়ে উঠেছে। জাপানের ‘ইকিগাই’ দর্শন জীবনের উদ্দেশ্য ও আনন্দ খুঁজে পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়, আর ‘শিনরিন-ইয়োকু’ বা বনভ্রমণ মানসিক প্রশান্তির একটি স্বীকৃত চর্চা। চীনের ঐতিহ্যবাহী ‘ইয়ান শেং’ দর্শনে সুষম খাদ্যাভ্যাস, ভেষজ উপাদান এবং ‘তাই চি’র মতো ধীরগতির ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ সমাজেও ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় হাঁটা, সুষম ও দেশীয় প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদান গ্রহণ, ঋতুভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস এবং সামাজিক মেলবন্ধনের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত, যা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভেতর দিয়েই আত্ম-যতেœর এক অনন্য রূপ ফুটিয়ে তোলে।
দর্শনশাস্ত্রেও আত্ম-যতœ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাচীন গ্রিক ও স্টোইক চিন্তাবিদরা মনে করতেন, মানুষের প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করে তার আত্মনিয়ন্ত্রণ, চিন্তা, আচরণ ও অভ্যাসের ওপর। পরবর্তীকালে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ‘কেয়ার অব দ্য সেলফ’ ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে দেখান যে আত্ম-যতœ কেবল শরীরের পরিচর্যা নয়; এটি আত্মসচেতনতা, আত্মসমালোচনা এবং ব্যক্তিগত বিকাশের একটি চলমান প্রক্রিয়া।
পৃথিবীর ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোতেও শরীর ও মনকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা, পরিমিত আহার, বিশ্রাম, আত্মসংযম, মানসিক প্রশান্তি এবং মানবকল্যাণ-এসব বিষয় বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। ফলে আত্ম-যতœ কেবল স্বাস্থ্যগত নয়, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত একটি ধারণা।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আত্ম-যতœকে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং মানসিক সুস্থতার চর্চা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তি স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, অন্যদিকে নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতা উন্নত করে। বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ও কর্মজীবীদের মাঝে প্রযুক্তিগত অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত থাকার জন্য সচেতন মানসিক বিরতি অত্যন্ত জরুরি।
আত্ম-প্রভাব কার্যকর ভিত্তি গড়ে ওঠে কয়েকটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসের ওপর। সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো, ডিজিটাল মাধ্যমের অতিনির্ভরতা কমানো এবং পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখাÑএসবই আত্ম-যতেœর অংশ। একই সঙ্গে বই পড়া, সৃজনশীল কাজে অংশ নেওয়া, ব্যক্তিগত শখ চর্চা এবং নিজের জন্য কিছু নিরিবিলি সময় রাখা মানসিক সুস্থতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। দৈনন্দিন রুটিন থেকে প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট নিজের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণে ব্যয় করার ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখতে পারে।
আজকের বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, কর্মব্যস্ত জীবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতার মধ্যে আন্তর্জাতিক আত্ম-যতœ দিবসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সুস্থতা কেবল রোগমুক্ত থাকার নাম নয়; বরং এটি শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত কল্যাণের একটি সমন্বিত অবস্থা। তাই নিজের যতœ নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি সচেতন দায়িত্ব। ব্যক্তি পর্যায়ে আত্ম-যতেœর সংস্কৃতি গড়ে উঠলে পরিবার হবে আরও সুস্থ, সমাজ হবে আরও মানবিক এবং জাতি হবে আরও কর্মক্ষম ও সমৃদ্ধ।