সাবেক এমপি শিউলি আজাদ জামিনে মুক্ত, জেলে আছেন ১০৬ জন
ন্যাশনাল ডেস্ক: সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) উম্মে ফাতেমা নাজমা বেগম ওরফে শিউলি আজাদ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে গত মঙ্গলবার মুক্তি পান।
বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মো. মজিবুর রহমান মজুমদার একটি জাতীয় দৈনিককে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে আদালতের জামিনের আদেশের ভিত্তিতে শিউলি আজাদ কারাগার থেকে মুক্তি পান।
শিউলি আজাদ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। তিনি সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি প্রয়াত এ কে এম ইকবাল আজাদের স্ত্রী।
২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর রাতে ঢাকার নিকেতনের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাকে সরাইল থানায় করা একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সরাইল থানা সূত্রের উদ্বৃতি দিয়ে জাতীয় দৈনিকটি জানায়, ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দায়ের করা ওই হত্যা মামলায় সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীসহ ৬৭ জনকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় শিউলি আজাদ চার নম্বর আসামি।
শিউলি আজাদের আইনজীবী জয়নাল উদ্দিন ঐ জাতীয় দৈনিককে বলেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় হয়রানি, আগাম গ্রেপ্তার, নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ও অন্য কোনো মামলার এজাহারে অন্তর্ভুক্ত না করার নির্দেশনা চেয়ে তার পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। আবেদনটি প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতি রুল জারি করেন এবং আবেদনকারীকে হয়রানি ও আগাম গ্রেপ্তার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তাকে একাধিক মামলায় ধারাবাহিকভাবে শোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর একে একে গ্রেপ্তার হতে থাকেন দলটির সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি), মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ শীর্ষপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নন, বিগত ১৬ বছরের তৎকালীন সরকারের নিয়োজিত শীর্ষ পর্যায়ের পুলিশ, আমলা, স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতিও গ্রেপ্তারের তালিকায় যুক্ত হন। এরই মধ্যে পূর্ণ হয়েছে জুলাই আন্দোলনের দুই বছর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত দুই বছরে গ্রেপ্তার হওয়া দলটির এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার জেল, জামিন ও সাজার হালচাল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তাদের কারাজীবন ক্রমেই দীর্ঘ হতে চলেছে।
এরই মধ্যে জুলাই হত্যাকান্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৬টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ের ফলে কারাগারে থাকা সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ চারজন মন্ত্রী-এমপি ও তৎকালীন নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘাড়ে ঝুলছে সাজার বোঝা। ঢাকার নিম্ন আদালতে বিচারাধীন কয়েকশ মামলার মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৩টি মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। চার্জগঠনের মাধ্যমে এই মামলাগুলো এখন আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিগত দুই বছরে জামিন পেয়ে মুক্ত হয়েছেন ১২ জন মন্ত্রী-এমপি। অন্যদিকে, কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন সাবেক দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগের শুধু এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলেই আটকে রয়েছেন মোট ১০৬ জন। বন্দিদের অনেকেই অর্ধশতাধিক, আবার কেউ কেউ শতকের কাছাকাছি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানান, দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলে ১০৬ জন আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে এমপি ৭৩ জন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ৩৪ জন। এই তিন শ্রেণির বন্দির মধ্যে সর্বশেষ শিউলি আজাদসহ ১২ জন জামিন পেয়ে কারামুক্ত হয়েছেন।
জামিনপ্রাপ্ত ১২ জনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর গ্রেপ্তারের মাত্র দুদিনের মাথায় জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। এর দুদিনের মাথায় জামিন পান সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। ১০ অক্টোবর তিনি কারামুক্ত হন। এর এক মাস পর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি মুহিবুর রহমান মানিক সুনামগঞ্জ কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ঝিনাইদহ-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নায়েব আলী জোয়ারদার ও ঝিনাইদহ-২ আসনের এমপি তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি অন্তর্বর্তী জামিন পেয়ে জেলা কারামুক্ত হন। ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট কারামুক্ত হন সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মুক্ত হন সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম। অন্যদিকে, আড়াই মাস কারাগারে থাকার পর মুক্ত হন আওয়ামী লীগের সাবেক পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। জাতীয়পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিকালে গ্রেপ্তার হয়ে চার ঘণ্টার ব্যবধানে ওই রাতেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
চলতি বছরের ৭ এপ্রিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী। গ্রেপ্তারের পাঁচ দিন পর ১২ এপ্রিল জামিন পেয়ে তিনি কারামুক্ত হন। গত ১৩ জুন কারামুক্ত হন বরিশাল-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম কিবরিয়া টিপু। এছাড়া গত ১৬ জুন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কারামুক্ত হন। ২০২৫ সালের ৯ মে গ্রেপ্তার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বিএনপি সরকারের আমলে গত ৩ জুন হাইকোর্ট থেকে ১০ মামলায় জামিন পান এবং কারামুক্ত হন।
তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই আন্দোলনের মামলায় জামিন পেয়ে আওয়ামী লীগের ৮ জন এমপি-মন্ত্রী কারামুক্ত হয়েছেন। এছাড়া বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদালত থেকে জামিন পেয়ে কারামুক্ত হয়েছেন ৪ জন মন্ত্রী এমপি ও একজন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে যেসব হেভিওয়েট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কারাগারে রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন-সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, সাবেক গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম, সাবেক পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান, সাবেক দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম, সাবেক মন্ত্রী উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, সাবেক রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, সাবেক বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকার, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, সাবেক মন্ত্রী নারায়ন চন্দ্র চন্দ, পার্বত্যবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার এবং সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ।
এ ছাড়া কারাগারে থাকা অন্য এমপিদের মধ্যে রয়েছেন-সাবেক এমপি ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক হুইপ আ স ম ফিরোজ, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ও সাবেক এমপি আবদুস সোবহান গোলাপ, মোহাম্মদ আলী, আয়েশা ফেরদৌস, আহমেদ হোসেন, আবদুর রহমান বদি, মো. সাদেক খান, আবদুস সোবহান মিয়া, হাজি মোহাম্মদ সেলিম, মাজহারুল ইসলাম, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, শাহে আলম, ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, তানভীর ইমাম, সেলিম আলতাফ জর্জ, কাজী জাফরুল্লাহ, রাহেনুল হক রায়হান, সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ, জান্নাত আরা হেনরী, মাহবুব আরা বেগম গিনি, আবদুর রউফ, ইকরামুল করিম চৌধুরী, আবদুস সালাম মূর্শেদী, মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, মো. দিদারুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ, আসাদুজ্জামান আসাদ, উম্মে ফাতেমা নাজমা বেগম, মহিবুর রহমান মানিক, মো. সোহরাব উদ্দিন, মো. রাশিদুজ্জামান, ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, আলী আজম, মোহাম্মদ সোলাইমান সেলিম, সাফিয়া খাতুন, আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী, রাগেবুল আহসান রিপু, কামরুল আশরাফ খান, নাসিমুল আলম চৌধুরী, সফিউল ইসলাম, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, আহমেদ নাজমিন সুলতানা, অধ্যাপক ডা. আবদুল আজিজ, চয়ন ইসলাম, আবদুল মজিদ খান, সানোয়ার হোসেন, এম এ মালেক, আফতাব উদ্দিন সরকার, মো. আফজাল হোসেন, মোরশেদ আলম, শাহ সারোয়ার কবির, কাজী মনিরুল ইসলাম, জাফর আলম, আমিরুল আলম মিলন, সেলিনা ইসলাম, শামীমা আখতার খানম, মমতাজ বেগম, কাজিম উদ্দিন আহমেদ, বেগম জেবুন্নেসা ও লায়লা পারভীন সেঁজুতি।









