কপোতাক্ষ নদের এই করুণ দশা কি আমরা দূর থেকেই দেখতেই থাকব?
সম্পাদকীয়
বর্ষার শুরুতেই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, পলি আর কচুরিপানার জটে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণরেখা কপোতাক্ষ নদ। স্তূপীকৃত কচুরিপানা ও শেওলার চাপে নদের স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফলে যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার প্রায় পাঁচটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকাকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ইতোমধ্যে ঝিকরগাছা, মনিরামপুর, কেশবপুর, কলারোয়া ও তালা উপজেলার পাঁচ শতাধিক বিলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে তা লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করেছে। বাওড়গুলো থেকে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ কচুরিপানার তোড়ে বিখ্যাত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ীর কাঠের সাঁকোটি পর্যন্ত ভেঙে পড়েছে। একইভাবে তালা উপজেলার মাগুরা বাজারের নির্মাণাধীন সেতুর পাশের বাঁশের সাঁকোতেও কচুরিপানা আটকে নদের প্রবাহ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গেছে। যার ফলে পাটকেলঘাটা বলফিল্ড সড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এখন জলের নিচে। জলাবদ্ধতার এই চিরাচরিত রূপ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য কোনো নতুন অভিশাপ নয়, কিন্তু প্রতি বছরই বর্ষার শুরুতে প্রশাসনের এমন অপ্রস্তুত অবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন নদের স্বাভাবিক নাব্যতা ও প্রবাহ ধরে রাখতে কেন আগাম ব্যবস্থা নেয়নিÑসেই প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। নদের প্রবাহ আটকে গেলে কেবল যে হাজার হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয় তা-ই নয়; বরং গৃহহীন হয়ে পড়েন হাজারও নি¤œ আয়ের মানুষ, দেখা দেয় তীব্র খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট। এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ সংকট মোকাবিলায় যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত ও দৃশ্যমান তৎপরতা কাম্য, সেখানে সংশিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
কপোতাক্ষ নদকে বাঁচানো এবং এই অঞ্চলের মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে নদের বুকে জমে থাকা কচুরিপানা ও শেওলা পরিষ্কার করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁকো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা এবং স্থানীয় জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে কপোতাক্ষের নাব্যতা বজায় রাখতে টেকসই ড্রেজিং ও পলি ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কালবিলম্ব না করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।











