মুক্তমত: মাইকের ডাক পৌঁছায় না মনে : ‘বৃক্ষমেলা প্রসঙ্গ’
আখলাকুর রহমান
একটা ইজিবাইক। ছাদে দুটো মাইক বাঁধা। ড্রাইভার ছেলেটার নাম হয়তো রহিম কিংবা করিম, নাম দিয়ে কিছু যায় আসে না। সে প্রতিদিন সকালবেলা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘোষণা দিয়ে বেড়ায়, আসুন, আসুন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে চলছে বৃক্ষমেলা। নানা রকমের ফলদ, ঔষধি ও বনজ গাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে।
মাইকের শব্দ মিলিয়ে যায় বাতাসে। মানুষজন ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে, তারপর আবার নিজের কাজে মন দেয়। কেউ কেউ ভাবে, ও, মেলা হচ্ছে বুঝি। ব্যস, এইটুকুই। এরপর আর কিছু নেই।
এই দৃশ্যটা আমার কাছে বড় করুণ লাগে। একটা সুন্দর উদ্যোগ, একটা মহৎ চিন্তা, অথচ তার পরিণতি একটা ইজিবাইকের মাইকের আওয়াজে আটকে গেছে। যেন কেউ একজন বিরাট এক প্রেমপত্র লিখেছে, তারপর সেই পত্র একটা কাগজের ঠোঙায় মুড়িয়ে ফেলে দিয়েছে ডাস্টবিনে।
আমরা বাঙালিরা বড় অদ্ভুত জাতি। আমরা গাছ ভালোবাসি বলে দাবি করি, অথচ গাছ কিনতে গেলে আমাদের হাত কাঁপে। আমরা বৃষ্টির গান গাই, নদীর গল্প লিখি, বটগাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিই, কিন্তু যখন একটা চারাগাছ কিনে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন আসে, তখন আমরা হিসেব করি, এটা দিয়ে কী হবে?
এই কী হবে প্রশ্নটাই আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে যে ছেলেমেয়েরা নার্সারি নিয়ে বসে আছে, তাদের মুখের দিকে তাকালে মনটা খারাপ হয়ে যায়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসে থাকে, রোদে পুড়ে, গাছের পাতায় পানি দেয়, যতœ করে সাজিয়ে রাখে টবগুলো। অথচ সন্ধ্যা নামলে দেখা যায়, বিক্রি হয়েছে দুই তিনটা মাত্র চারা।
একজন নার্সারি মালিক আমাকে বলছিলেন, স্যার, আমরা তো গাছ বিক্রি করি না, আমরা যেন ভিক্ষা চাই। কথাটা শুনে বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।
অথচ ভাবুন তো, একটা আমগাছের চারা, দাম হয়তো পঞ্চাশ কি ষাট টাকা। এই টাকায় আজকাল একটা ভালো সিঙ্গাড়া চা ও হয় না ঠিকমতো। অথচ এই ছোট্ট চারাটা যদি বেঁচে থাকে দশ বছর, পনেরো বছর, তাহলে একদিন সে ছায়া দেবে, ফল দেবে, পাখিদের বাসা দেবে, বাতাস দেবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন। এমন লাভজনক বিনিয়োগ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু আমরা এই হিসেবটা করি না। আমরা তাৎক্ষণিক লাভের হিসেব করি। আজকের বাজারে আলুর দাম কত, পেঁয়াজের দাম কত, এই নিয়ে আমাদের যত মাথাব্যথা। গাছের কথা মনে পড়ে শুধু তখনই, যখন রোদে হাঁটতে হাঁটতে ছায়ার খোঁজে আমরা কোনো এক অচেনা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পড়ি।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই মেলাকে বাঁচানো যায় কীভাবে। এই ইজিবাইকের মাইকের বাইরে গিয়ে মানুষের মনে গাছের প্রতি একটা টান তৈরি করা যায় কীভাবে!
আমার মনে হয়, এখানে সবচেয়ে বড় ভুলটা হচ্ছে, আমরা গাছ বিক্রি করার চেষ্টা করছি, কিন্তু গাছের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছি না। মানুষ জিনিস কেনে যখন সেই জিনিসের সাথে তার একটা আবেগের যোগ তৈরি হয়। শুধু ঘোষণা দিয়ে জিনিস বিক্রি হয় না, গল্প দিয়ে জিনিস বিক্রি হয়। তাই প্রথম কাজ, গল্প তৈরি করা।
এক. গাছের নামকরণ উৎসব। প্রতিটি চারার সাথে একটা করে ছোট কার্ড ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে, যেখানে লেখা থাকবে, আমাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একটা নাম দাও। আমি তোমার সন্তানের বয়সী হয়ে বড় হবো তোমার সাথে। এই ছোট্ট কথাটা একটা শিশুর মনে যে প্রভাব ফেলবে, তা হাজার বিজ্ঞাপনেও হবে না। বাচ্চারা বাবা মাকে জোর করে নিয়ে আসবে গাছ কিনতে, শুধু নিজের গাছটার নাম রাখার জন্য।
দুই. জন্মদিনের গাছ। কারো জন্মদিন হলে কেক কাটার পাশাপাশি একটা গাছ রোপণের প্রচলন শুরু করা যেতে পারে। মেলায় এসে ঘোষণা করা যায়, আপনার সন্তানের জন্মদিনে তার বয়সের সমান উচ্চতার একটা গাছ উপহার দিন। প্রতি জন্মদিনে গাছটাও বড় হবে, আপনার সন্তানও বড় হবে। এই ধারণাটা মানুষকে ছুঁয়ে যাবে, কারণ এখানে গাছ আর সন্তানের ভাগ্য একসূত্রে বাঁধা পড়ে যায়।
তিন. বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা। স্কুলে স্কুলে প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা যেতে পারে, কোন শ্রেণি সবচেয়ে বেশি গাছ রোপণ করে তার যতœ নিতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা যখন প্রতিযোগিতায় নামবে, তখন তাদের পরিবারও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। বিজয়ী শ্রেণিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া যেতে পারে।
চার. মাইকের বদলে মানুষের মুখ। ইজিবাইকের মাইক আর যান্ত্রিক ঘোষণার বদলে দরকার মানুষের মুখ। স্থানীয় কোনো শিক্ষক, কোনো প্রবীণ ব্যক্তি, কিংবা কোনো পরিচিত মুখ যদি ভিডিও বার্তা দেন, আমি চল্লিশ বছর আগে একটা কড়ই গাছ লাগিয়েছিলাম আমার বাড়ির উঠোনে, আজ সেই গাছের ছায়ায় আমার নাতি নাতনিরা খেলা করে, এই ধরনের সত্যিকারের গল্প মানুষের মনে দাগ কাটবে। এই ভিডিওগুলো ফেসবুকে, ইউটিউবে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে দিতে হবে।
পাঁচ. হাটবাজারে উপস্থিতি। মানুষ মেলায় আসতে চায় না, কিন্তু হাটে তো আসেই। সপ্তাহের হাটবারে সাতক্ষীরার বিভিন্ন হাটে ছোট ছোট স্টল বসানো যেতে পারে। মানুষ যখন সবজি মাছ কিনতে আসবে, তখন পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে একটা চারাগাছ তার চোখে পড়বে, হাতে নিয়ে দেখবে, দাম জিজ্ঞেস করবে। এটাই আসল প্রচার, মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার পথে গাছকে নিয়ে যাওয়া।
ছয়. বিনিময়ের সংস্কৃতি। শুধু টাকার বিনিময়ে বিক্রি নয়, বিনিময়ের একটা মজার নিয়ম চালু করা যেতে পারে। পুরনো প্লাস্টিকের বোতল বা অব্যবহৃত জিনিস জমা দিলে একটা করে চারা ফ্রি। এতে পরিবেশ রক্ষার দুটো কাজ একসাথে হবে, প্লাস্টিক কমবে, গাছ বাড়বে। মানুষ বিনামূল্যের জিনিসের প্রতি সবসময় একটু বেশি আগ্রহী থাকে।
সাত. ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষঙ্গ। আমাদের সমাজে ধর্মীয় কথার একটা আলাদা শক্তি আছে। গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়ার সাথে যুক্ত করে প্রচার করা যেতে পারে। একটা গাছ যতদিন বাঁচবে, তার ছায়ায় যে বসবে, তার ফল যে খাবে, তার সওয়াব গাছ লাগানো মানুষটার আমলনামায় যোগ হতেই থাকবে। এই কথাটা ইমাম সাহেবরা জুমার নামাজের পরে বললে তার প্রভাব অন্যরকম হবে।
আট. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার। মেলার একটা দিন সরাসরি ফেসবুক লাইভ করা যেতে পারে, যেখানে দেখানো হবে কোন গাছের কী উপকারিতা, কীভাবে যতœ নিতে হয়, কোন গাছ কম জায়গায় লাগানো যায়। মানুষ তথ্য পেলে আগ্রহী হয়। শুধু গাছ কিনুন বললে মানুষ আগ্রহী হয় না, কিন্তু এই গাছটা আপনার ছাদবাগানের জন্য একদম উপযুক্ত, তিন বছরেই ফল দেবে, এই কথাটা শুনলে মানুষ এগিয়ে আসে।
আসলে সমস্যাটা গাছের নয়, সমস্যাটা আমাদের মনের। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে সবকিছু তাৎক্ষণিক হতে হবে। আজ টাকা দিলে আজই ফল চাই। কিন্তু গাছ তো এমন জিনিস নয়। গাছ ধৈর্যের ফসল। গাছ ভালোবাসার প্রতিদান দেয় বছরের পর বছর ধরে, ধীরে ধীরে, নীরবে।
একটা গাছ কখনো অভিযোগ করে না। রোদ পড়ুক, ঝড় আসুক, অবহেলা হোক, গাছ শুধু বেড়ে ওঠে। আর একদিন হঠাৎ দেখা যায়, সেই ছোট্ট চারাগাছটা বিশাল হয়ে গেছে, তার নিচে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে ক্লান্ত পথিক, তার ডালে বাসা বেঁধেছে কোনো এক অচেনা পাখি।
আমার মনে হয়, সাতক্ষীরার এই বৃক্ষমেলাকে বাঁচাতে হলে আমাদের প্রথমে এই গল্পগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, একটা গাছ কেনা মানে শুধু একটা চারা কেনা নয়, একটা ভবিষ্যৎ কেনা, একটা ছায়া কেনা, একটা প্রজন্মের জন্য একটা উপহার রেখে যাওয়া।
জেলা প্রশাসন, সামাজিক বন বিভাগ, স্কুল কলেজ, স্থানীয় সাংবাদিক, ইমাম সাহেব, শিক্ষক, সবাইকে একসাথে নেমে আসতে হবে এই কাজে। শুধু একটা ইজিবাইকের মাইক দিয়ে এই বিশাল কাজ হবে না। এর জন্য দরকার মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর মতো ভাষা, গল্প বলার মতো ধৈর্য, আর ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো আন্তরিকতা।
আমি জানি না এই লেখাটা পড়ে কজন মানুষ গাছ কিনতে যাবেন। কিন্তু যদি একজনও যান, যদি একটা শিশু তার বাবাকে ধরে বলে, বাবা, আমার একটা গাছ চাই, আমি তার নাম দেব, তাহলেই এই লেখা সার্থক।
শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের সেই নার্সারি মালিকদের চোখে যে হতাশা দেখেছি, সেই হতাশা কেটে গিয়ে যদি একটা হাসি ফোটে, তাহলে বুঝব, গাছেরাও এবার অভিমান ভুলে গেছে। আর অভিমান ভাঙানোর সবচেয়ে ভালো উপায় তো একটাই, ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নেওয়া।
গাছ যেমন নীরবে ভালোবাসে, আমাদেরও শেখা উচিত তেমন নীরবে ভালোবাসতে। একটা চারা হাতে নিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার মুহূর্তটা যদি আমরা একবার অনুভব করি, তাহলে বুঝব, এই ছোট্ট কাজটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে বড় এক আনন্দ।
মেলা শেষ হয়ে যাবে কয়েকদিন পরে। কিন্তু গাছ লাগানোর কাজ তো শেষ হওয়ার নয়। এই মেলা শুধু একটা শুরু হোক, সাতক্ষীরার প্রতিটা বাড়ির উঠোনে, প্রতিটা স্কুলের মাঠে, প্রতিটা রাস্তার ধারে যেন একদিন সবুজের সমারোহ দেখা যায়। এই স্বপ্নটাই তো ছিল আয়োজকদের মনে। এখন প্রয়োজন শুধু সেই স্বপ্নটাকে মানুষের মনের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া।
লেখক: উদ্যোক্তা







