সোশ্যাল মিডিয়ার কোন্দল ও রাজনীতির ক্ষয়, আন্তর্জাতিক গবেষণার সতর্কবার্তা!
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালায় নির্ধারিত ‘রং ফোরাম’ উপেক্ষা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাদা ছোড়াছুড়ি বর্তমান রাজনীতির অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। কর্মীরা যখন দলের নীতি, নেতৃত্ব বা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ফেসবুক বা ইউটিউবে বিষোদ্গার করেন, তখন তা কেবল দলেরই ক্ষতি করে না, বরং সামগ্রিক রাজনীতিকে জনগণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রবণতা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে একটি গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়াকে রাজনৈতিক কোন্দলের মঞ্চ বানানোর ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে, তা বিভিন্ন স্বনামধন্য গণমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থার গবেষণা ও প্রতিবেদনে স্পষ্ট। জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের গবেষণায় ‘ট্রুথ ডিকে’ বা সত্যের অপক্ষয় ধারণাটি তুলে ধরেছে। র্যান্ড কর্পোরেশন-এর গবেষণায় তথ্যব্যবস্থার পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে ‘ট্রুথ ডিকে’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যখন রাজনৈতিক কর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক ফোরাম বাদ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগতাড়িত পোস্ট দেন, তখন তথ্য বিকৃতি ও বিভ্রান্তির ঝুঁকি বাড়ে। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো-তে প্রকাশিত বিভিন্ন মতামতেও অনলাইন রাজনৈতিক চর্চা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টার-এর গবেষণাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুল তথ্য, রাজনৈতিক বিভাজন ও গণতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পিউ-এর গবেষণায় দেখা যায়, অনলাইনে ভুল তথ্যের বিস্তারকে মানুষ গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের সঙ্গে এ বিষয়টির সম্পর্ক রয়েছে। নিজের দলের কোন্দল যখন ফেসবুকে প্রকাশ্যে আসে, তখন তা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টিও দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে দলের চেইন অব কমান্ড দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি জনগণের কাছে দলের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার-এর ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে গবেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অনলাইনে ছড়ানো ভুল তথ্যের ৭৪ শতাংশের বেশি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একই প্রতিবেদনে অনলাইনে ঘৃণাত্মক বক্তব্যের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মীরা যখন নিজের দলের নেতাদের বিরুদ্ধে পোস্ট দেন, তখন সুযোগসন্ধানীরা ভুয়া আইডি, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ পায়। এটি অনেক সময় মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা ও সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। কর্মী ও কতিপয় নেতার এই আচরণের ফলে দল পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। গঠনতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো ক্ষোভ দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফোরামে (যেমন: কার্যনির্বাহী সংসদ, কর্মিসভা বা সাংগঠনিক ট্রাইব্যুনাল) প্রকাশ করার কথা। কিন্তু তাৎক্ষণিক সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নেতৃত্বকে এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল বা চাপ প্রয়োগ করার নোংরা সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
রাজনীতিকে এই ডিজিটাল বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে এবং এর মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে দলকে সাংগঠনিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে তাদের গঠনতন্ত্রে কঠোর আচরণবিধি যুক্ত করতে হবে। কোনো কর্মী বা নেতা দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলে বা নেতৃত্বকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করলে তাকে দলীয় গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি করতে হবে।
কর্মীদের ক্ষোভের প্রধান কারণ হলো-দলের ভেতরে কথা বলার সুযোগ না পাওয়া। দলগুলোকে নিয়মিত কর্মিসভা, বর্ধিত সভা এবং সাংগঠনিক বৈঠক করতে হবে, যেন কর্মীরা তাদের অভিযোগ সঠিক ফোরামে বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে কর্মীদের জন্য ‘রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও ডিজিটাল লিটারেসি’ বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা উচিত। দল পরিচালনার নিয়ম ও অনুশাসন সম্পর্কে তরুণ কর্মীদের স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
কর্মীদের ফেসবুক পোস্ট দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, দলীয় নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। চাটুকারিতা বা সস্তা ভাইরাল সংস্কৃতিকে দলে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা









