সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ২০ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক চিকিৎসা পরিবহন ও জরুরি চিকিৎসা দিবস। এই দিবসটি আমাদের সেইসব নীরব পেশাজীবীদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যাঁরা সংকটময় মুহূর্তে রোগীর জীবন রক্ষায় প্রথম সারির সহায়ক হিসেবে কাজ করেন। অ্যাম্বুলেন্স চালক, প্যারামেডিক, জরুরি চিকিৎসা সেবাকর্মী, রোগী পরিবহনকর্মী, জরুরি যোগাযোগকারী এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা পরিবহন দলের সদস্যরা প্রতিনিয়ত এমন এক পরিবেশে কাজ করেন, যেখানে কয়েক সেকেন্ডের দ্রুত সিদ্ধান্ত একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই দিবসের ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রয়্যাল আর্মি মেডিকেল কর্পসের কার্যক্রমে। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদের দ্রুত ও নিরাপদে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে গিয়ে ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সকর্মীরা যেসব পদ্ধতি ও প্রোটোকল উদ্ভাবন করেছিলেন, সেগুলোর অনেকাংশই আধুনিক জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে চিকিৎসা পরিবহনের ইতিহাস আরও পুরোনো। প্রাচীনকালে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহতদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য ঘোড়ায় টানা রথ ও গাড়ি ব্যবহার করা হতো। সেই দীর্ঘ পথপরিক্রমা অতিক্রম করে আজ চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ও জীবনরক্ষাকারী সেবায় পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসা পরিবহন সেবাকে সাধারণত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথমত, জরুরি চিকিৎসা সেবা, যেখানে দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য সংকটজনক পরিস্থিতিতে রোগীকে তাৎক্ষণিক সেবা দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, অ-জরুরি চিকিৎসা পরিবহন, যা ডায়ালাইসিস, নিয়মিত চিকিৎসা, পুনর্বাসন বা ফলো-আপ সেবার জন্য রোগীদের যাতায়াতে সহায়তা করে। তৃতীয়ত, হাসপাতাল আন্তঃপরিবহন সেবা, যার মাধ্যমে রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল বা বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।
একজন চিকিৎসা পরিবহনকর্মীর কাজ শুধু রোগীকে বহন করা নয়। তাঁদের রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হয়, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করতে হয়, রোগী ও স্বজনদের মানসিক সহায়তা দিতে হয় এবং প্রয়োজনে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিচালনা করতে হয়। সিপিআর , স্বয়ংক্রিয় বহিঃস্থ ডিফিব্রিলেটর ব্যবহার, জরুরি যোগাযোগ রক্ষা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাঁদের পেশাগত দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক সময় অস্থিতিশীল বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা এই পেশার গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্ট করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থা এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। বড় শহর থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত যানজট, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্সের অভাব, প্রশিক্ষিত জনবলের সংকট এবং সমন্বিত জরুরি সেবার সীমাবদ্ধতা রোগী পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকে, যা রোগীর জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণে জরুরি যানবাহনের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক চলাচল নিশ্চিত করা, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বর সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করছে, তবে এসব সেবার কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা পরিবহন ও জরুরি চিকিৎসা দিবস স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন ধরনের পরিবহনকর্মীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এর আওতায় জরুরি অ্যাম্বুলেন্স চালক ও ক্রু সদস্য, রোগী পরিবহন সেবার চালক, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কর্মী, মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন দলের সদস্য এবং অ-জরুরি রোগী পরিবহনকর্মীরা অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার নেপথ্যে কাজ করলেও রোগীদের সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাসেবার কাছে পৌঁছে দিতে তাঁদের ভূমিকা অপরিসীম।
এই দিবসকে আরও অর্থবহ করে তুলতে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। অ্যাম্বুলেন্স চালক ও জরুরি সেবাকর্মীদের আনুষ্ঠানিক সম্মাননা প্রদান, স্কুল-কলেজ ও তরুণ সমাজের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সিপিআর প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, জাতীয় জরুরি নম্বর সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা সরঞ্জামে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের দাবি। পাশাপাশি প্যারামেডিক ও জরুরি চিকিৎসা কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা পরিবহন ও জরুরি চিকিৎসা দিবস কেবল একটি স্মারক দিবস নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার এক অপরিহার্য ভিত্তিকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ। চিকিৎসা পরিবহন পেশাজীবীরা নীরবে, প্রচারের আড়ালে থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রেখে চলেছেন। তাঁদের দক্ষতা, সাহস, মানবিকতা এবং পেশাগত নিষ্ঠার যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি তাঁদের কর্মপরিবেশ ও সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও মানবিক হয়ে উঠবে।