ডিজিটাল অপচ্ছায়া: কিশোর মনস্তত্ত্ব, কুসংস্কার ও প্রতারণার বিস্তৃত
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
জামালপুরের এক নিভৃত গ্রামে মাটির নিচে পুঁতে রাখা প্রায় ৬৫ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার উদ্ধারের ঘটনাটি নিছক একটি অপরাধের খবর নয়; এটি আমাদের সময়ের এক গভীর সামাজিক সংকটের নির্মম প্রতিফলন। ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছে এক অষ্টম শ্রেণির কিশোরী-যে তার পরিবারে ভালোবাসার ঘাটতি অনুভব করে এক অদৃশ্য ভার্চুয়াল জগতের ফাঁদে পা দেয়। আর সেই ফাঁদের নাম-ডিজিটাল তান্ত্রিক প্রতারণা। এই ঘটনাটি আমাদের সামনে কয়েকটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: আমাদের কিশোররা কার কাছে নিরাপদ? পরিবার, সমাজ, না কি অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে? বয়ঃসন্ধিকাল এমন একটি সময়, যখন একটি শিশুর মন সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল, প্রশ্নমুখর এবং ভঙ্গুর থাকে।
মনোবিজ্ঞানে ‘অনুভূত অবহেলা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাস্তবে অবহেলা না থাকলেও কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় নিজেদের অবহেলিত মনে করে। জামালপুরের কিশোরীর ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। সে ভেবেছে, তার মা-বাবা ছোট ভাইবোনদের বেশি ভালোবাসে। এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় এক ধরনের অভিমান, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিচ্ছিন্নতায়। কারণ-যখন পরিবারে কথা বলার জায়গা থাকে না, তখন কিশোররা কথা বলতে যায় অজানা মানুষের সাথে। যখন বাস্তব জগতে স্বীকৃতি মেলে না, তখন তারা খোঁজে ভার্চুয়াল প্রশংসা এবং ঠিক এই জায়গাতেই প্রবেশ করে প্রতারক চক্র। ভার্চুয়াল জগত: নিরাপদ আশ্রয় না ডিজিটাল ফাঁদ? স্মার্টফোন আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছে।
শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই এখন কিশোরদের হাতে ইন্টারনেট। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আমরা কি তাদের শিখিয়েছি-কাকে বিশ্বাস করতে হবে? ফেসবুক, টিকটক, ইমু-এসব প্ল্যাটফর্মে তৈরি হচ্ছে এক বিকল্প বাস্তবতা। এখানে পরিচয় যাচাই নেই, দায়িত্ব নেই, কিন্তু প্রভাব আছে বিশাল। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে “তান্ত্রিক”, “হুজুর”, “জিনের বাদশাহ”, “আল্লাহর দান”-এসব পরিচয়ে অসংখ্য ভুয়া অ্যাকাউন্ট সক্রিয়। তারা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, ভয়, ভালোবাসা এবং দুর্বলতাকে ব্যবহার করে। জামালপুরের কিশোরীও এমনই এক “ডিজিটাল তান্ত্রিক”-এর শিকার।বাংলাদেশের সমাজে আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মীয় বিশ্বাস গভীরভাবে প্রোথিত।
এই বিশ্বাস মানুষকে শক্তি দেয়, আবার কখনো কখনো দুর্বলতাও তৈরি করে। তারা বলে-“তোমার পরিবার তোমাকে ভালোবাসবে না, কারণ তোমার ওপর খারাপ প্রভাব আছে” “এই স্বর্ণ দান করলে সমস্যা দূর হবে” “গোপনে কাজ করতে হবে, না হলে বিপদ হবে” এগুলো এক ধরনের মানসিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল-যাকে বলা হয় psychological manipulation। এই কৌশলে শিকারকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করা হয়, ভয় দেখানো হয়, এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের সম্পদ হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়। ডিজিটাল পেমেন্ট ও প্রতারণার নতুন অর্থনীতি এই ঘটনায় বিকাশের মাধ্যমে লেনদেনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস যেমন বিকাশ, নগদ-এসব আমাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। কিন্তু এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। বিশেষ করে-অপ্রাপ্তবয়স্কদের বড় অংকের লেনদেন, সন্দেহজনক একাধিক ট্রানজ্যাকশন, ভুয়া পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার, এসব ক্ষেত্রে নজরদারি এখনো দুর্বল। যদি রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং অ্যালার্ট সিস্টেম আরও শক্তিশালী হতো, তাহলে হয়তো এই প্রতারণা আগেই ধরা পড়ত। এই ঘটনার অন্যতম ভয়াবহ দিক হলো-অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন “কনটেন্ট ক্রিয়েটর”।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে “ভাইরাল হওয়া” একটি বড় লক্ষ্য। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা অনেককে নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত করছে। কিছু মানুষ কনটেন্ট তৈরির আড়ালে-ভুয়া পরিচয় তৈরি করছে, অনুসারীদের আস্থা অর্জন করছে, এবং পরে সেই আস্থাকে ব্যবহার করছে প্রতারণার জন্য, এটি এক নতুন ধরনের “ডিজিটাল বিশ্বাসঘাতকতা”। এই ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি দেখায়-বাংলাদেশের আইনকৃঙ্খলা বাহিনী প্রযুক্তিগতভাবে এগোচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়: প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী? সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং কতটা কার্যকর? শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না, অপরাধ ঘটার আগেই তা ঠেকাতে হবে।
জাতীয় সংকট: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বৃহত্তর প্রবণতা জামালপুরের ঘটনা একা নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়-লটারি প্রতারণা, বিদেশে চাকরির প্রলোভন, তান্ত্রিক চিকিৎসা,জিন-পরীর গল্প, এসবের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে।-যার শিকড় সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সন্তানের সাথে প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট কথা বলা, বিচার না করে শোনা, ডিজিটাল ব্যবহারে নজর রাখা, ডিজিটাল লিটারেসি বাধ্যতামূলক করা, কিশোর মনস্তত্ত্ব বিষয়ে কাউন্সেলিং চালু করা, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা সভা, সন্দেহজনক আচরণে প্রতিবেশীদের সক্রিয় ভূমিকা।
সাইবার ক্রাইম ইউনিট শক্তিশালী করা, ডিজিটাল লেনদেনে এআই-ভিত্তিক নজরদারি, ভুয়া কনটেন্ট নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রযুক্তির সাথে মানবিকতার ভারসাম্য জামালপুরের সেই মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা সোনা উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু একটি কিশোর মনের ভাঙন-তা কি এত সহজে সারানো যাবে? আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছি, কিন্তু তাদের হাতে কি তুলে দিচ্ছি-সচেতনতা? নৈতিকতা? নাকি নিঃসঙ্গতা? “স্মার্ট বাংলাদেশ” কেবল প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়; এটি একটি মানবিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকারও।
যেখানে-কোনো কিশোরী ভালোবাসার অভাবে অচেনা কারো কাছে আশ্রয় খুঁজবে না, কোনো প্রতারক ধর্মের নামে মানুষকে ঠকাতে পারবে না, এবং কোনো পরিবার সন্তানের অভিমান বুঝতে ব্যর্থ হবে না। মনির হোসেনদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি-প্রতিটি ঘরে ভালোবাসা, সচেতনতা এবং সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা। কারণ, ডিজিটাল অন্ধকারকে হারানোর সবচেয়ে শক্তিশালী আলো এখনো মানুষ-তার পরিবার, তার সমাজ, তার মানবিকতা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, আশাশুনি, সাতক্ষীরা











