মহালয়া, শুভশক্তির আগমনী ধ্বনি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
শনিবার ভোরে মহালয়া। অমাবস্যার অন্ধকার পেরিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষ। পিতৃপক্ষের অবসানে মহালয়ার ভোরে শঙ্খধ্বনি, চ-ীপাঠ ও আগমনী সুরে বাঙালির মনে জেগে ওঠে দেবীর আগমনের প্রত্যাশা। মহালয়া তাই নিছক একটি ধর্মীয় তিথি নয়; এটি স্মৃতি, বিশ্বাস ও শুভশক্তির প্রত্যাবর্তনের এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। ‘মহ’ অর্থ পূজা বা উৎসব, ‘আলয়’ অর্থ আশ্রয়। আবার সনাতন বিশ্বাসে মহালয় পিতৃলোকের প্রতীক-যেখানে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের অবস্থান। ফলে মহালয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুটি গভীর অনুষঙ্গ: পূর্বপুরুষের স্মরণ এবং দেবীপক্ষের সূচনা।
পিতৃপক্ষের শেষ দিনে প্রয়াত পিতা-মাতা ও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ ও অঞ্জলি নিবেদনের রীতি রয়েছে। এর ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি রয়েছে গভীর মানবিক মূল্যবোধ। মানুষ যত আধুনিকই হোক, তার অস্তিত্বের পেছনে থাকে পূর্বসূরিদের শ্রম, ত্যাগ ও উত্তরাধিকার। মহালয়া সেই ঋণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুর্গাপূজার সূচনালগ্ন হিসেবেও মহালয়ার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পুরাণকথা অনুযায়ী, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে শ্রী রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। প্রচলিত পূজার সময়ের বাইরে এই আরাধনাই ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত।
সেই ঐতিহ্যই আজকের শারদীয় দুর্গোৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চ-ীপাঠের মন্ত্রে মহালয়ার ভোরে যে দেবীকে আহ্বান করা হয়, তিনি শুধু পৌরাণিক অসুরবিনাশিনী ননÑতিনি শুভবোধের প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর সংগ্রাম তাই আজও প্রতীকী অর্থে প্রাসঙ্গিক। অন্যায়, অহংকার, হিংসা, লোভ ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে ন্যায়, সংযম ও মানবিকতার লড়াই কখনো শেষ হয় না। এ কারণেই মহালয়ার আলোকবার্তা আজও সমান জরুরি। সমাজে বিভাজন বাড়লে, সহনশীলতা কমলে, স্বার্থ যখন বিবেককে ঢেকে ফেলেÑতখন দেবীর আগমন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অশুভকে মেনে নেওয়া নয়, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানুষের ধর্ম।
শরতের প্রকৃতিও যেন এই আবাহনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে। নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল ও শিউলির সুবাসের সঙ্গে ম-পে ম-পে চলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমাশিল্পী, কারিগর, ঢাকি, আলোক সজ্জা কর্মী ও আয়োজকদের শ্রমে পূর্ণতা পায় উৎসবের আয়োজন। এই সম্মিলিত শ্রমই দুর্গোৎসবকে কেবল পূজার আনুষ্ঠানিকতা থেকে বৃহত্তর সামাজিক উৎসবে পরিণত করেছে। বাংলার দুর্গোৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মিলনের চরিত্র। ধর্মীয় আচার এক সম্প্রদায়ের হলেও উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সর্বস্তরে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে, মহালয়া সেই মূল্যবোধকেও নতুন করে স্মরণ করার সুযোগ দেয়।
মহালয়ার প্রকৃত তাৎপর্য তাই কেবল ‘মা আসছেন’-এই আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে উত্তরণের দর্শন। পূর্বপুরুষের স্মৃতি আমাদের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়, আর দেবীর আবাহন সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। অমাবস্যার রাত শেষে যেমন সূর্য ওঠে, তেমনি অশুভের দীর্ঘ ছায়ার পরও শুভবোধের সম্ভাবনা কখনো নিঃশেষ হয় না। মহালয়া সেই সম্ভাবনারই নাম। মহালয়ার এই ভোরে তাই প্রার্থনা একটাইÑঅশুভের বিনাশ হোক, বিবেক জাগুক, মানবিকতা শক্তিশালী হোক। দেবীর আগমন হোক মানুষের অন্তরে। শুভ মহালয়া।
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, সাংবাদিক, আশাশুনি, সাতক্ষীরা






