মেয়ে হারা মায়ের আক্ষেপ আর কোনো মায়ের যেনো মেয়ে সন্তান না হয়?
আজহারুল ইসলাম সাদী
কুমিল্লার লালমাইয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন নিহত হওয়ায় তার মায়ের আর্তনাদে উঠে এসেছে সন্তান হারানোর বেদনা, বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা?
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আর কোনো মায়ের যেনো মেয়ে সন্তান না হয়! ‘কোনো মা যেনো আর সন্তান নেয় না। এই হায়নাদের যদি কোনো বিচার না করতে পারে এই মন্ত্রী-মিনিস্টাররা, তাহলে কোনো বিএনপিও ক্ষমতায় থাকার দরকার নেই। কোনো আওয়ামী লীগও না, হাসিনা, এমপি-মিনিস্টার কিছু চাই না।’
তিনি বলেন, ‘আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, আমি কি এত কথা বলে বিচার পাব? পাব না, পাব না। সে আল্লাহ দেখতেছে, আল্লাহ এর বিচার করুন।’
তিনি বলেন, ও যে বান্ধবীর বাসায় গেছে, আমি জিজ্ঞেস করেছি, বান্ধবীর মার নাম কী? বান্ধবীর বাবার নাম কী? আমারে বল। ওই বান্ধবীর বাসায় যাই, আমি নিয়ে আসি। ওই বান্ধবীরা খুব খারাপ, বান্ধবীরা খুব খারাপ।’
মেয়েকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ রাখার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি স্কুলে ছয় মাস পাঠাই নাই। যাতে মেয়েটা আমার সামনে থাকে।
সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, “আর এত কিছু করে যদি আপনারা কিছু না করতে পারেন, সাংবাদিকতা ছেড়ে দিবেন।
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জান্নাতুল তাজমিনের মা বলেন, ‘নয় মাসের বাচ্চাগুলোরও কোনো নিরাপত্তা নেই। একটা মা একটা বাপের কাছে রাইখা যাবে, এর নিরাপত্তাও নাই। আপনারা কী করেন সাংবাদিকতা করে?
সন্তান হারানোর শোক, বিচার পাওয়ার আকুতি এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।
সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায়, অপরাধ, নিরাপত্তাহীনতা এবং কন্যা সন্তান কে ধর্ষণ করে হত্যা করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে বিচারহীনতার পরিবেশ দেখে ভুক্তভোগী পরিবার বা মায়েদের চরম হতাশা ও ক্ষোভ থেকে একজন মেয়ে হারা মায়ের ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্ষোভের বসে,
আর কারো যেনো মেয়ে সন্তান না হয়, এই ধরনের আবেগঘন মন্তব্য প্রকাশ পাওয়া স্বাভাবিক।
অথচ কন্যা সন্তানকে বলা হয়ে থাকে আল্লাহর রহমত।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুই ভাগে সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ আর নারী।
তবে আল্লাহ তায়ালা কাউকে শুধু কন্যা সন্তানই দান করেন। আবার কাউকে পুত্র সন্তান। কাউকে আবার পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন। কাউকে আবার কোনো সন্তানই দান করেন না, আবার কাউকে করে দেন বন্ধ্যা।
অনেক দম্পতি আছেন যারা শত চেষ্টা-তদবির করলেও তাদের সন্তান হয় না। এ সবই আল্লাহ তায়ালার বিশেষ হিকমত ও কল্যাণ-জ্ঞানের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। যার জন্য তিনি যা উপযোগী মনে করেন তাকে তা দান করেন। কন্যা সন্তানও আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত পুত্র সন্তানও আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত। কন্যা সন্তানেরও প্রয়োজন আছে, পুত্র সন্তানেরও প্রয়োজন আছে। পুরুষ মহিলার মুখাপেক্ষী, মহিলা পুরুষের মুখাপেক্ষী।
উভয়ের সৃষ্টি ও জন্মগ্রহণ আল্লাহ তায়ালার বিশেষ হিকমত ও কল্যাণ-জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল।
গত ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমিন নামের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী ও ঔষধ কোম্পানী রেনেটার কর্মী আব্দুল আলিমের মেয়ে।
বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে মেয়েটি প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায় পরদিন ফিরে আসে কুমিল্লায়, সেখান থেকে কক্সবাজার যায় সে, ঘটনার দিন কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসে মধ্যরাতে কুমিল্লার নূরজাহান হোটেল এর সামনে নামে, সেখানে তার ঘোরাঘুরির কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখা যায়।
১০ অক্টোবর সকালে কুমিল্লা’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়–য়া প্রেস বিফ্রিংয়ে
জানান, কুমিল্লা নূরজাহান হোটেল এলাকা থেকে মেয়েটি রেসকোর্সের বাসায় ফিরতে ওই অটোরিকশায় ওঠে। গভীর রাতে একা পেয়ে ফন্দি আঁটে চালক সুমন। তাকে নিয়ে শহরের না ফিরে উল্টো পথে অটোরিকশা চালাতে থাকেন, এক পর্যায়ে মেয়েটা বুঝতে পেরেই অটোরিকশা থেকে লাইভ লোকেশন ও হোয়াটসঅ্যাপে তার বাবা কে ম্যাসেজ করেন, “বাবা ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, আমাকে নিয়ে যাও” ।
অটোরিকশা চালক সুমন মেয়েটির সাথে ব্যাপক জবরদস্তি করে ধর্ষণের পর হত্যা করে পালিয়ে যায়, মেয়েটির আই ফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ।
সকালে মেয়েটির বাবা ঘুমিয়ে থাকায় মোবাইলের ম্যাসেজ না দেখতে পেয়ে সকালে মোবাইলের লোকেশন অনুযায়ী ম্যাসেজ দেয়া স্থানে গিয়ে জানতে পারেন, সেখানে একটি মেয়ের মরদেহ পড়ে আছে!
তিনি তখন মরদেহটি তার মেয়ের বলে সনাক্ত করেন। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট












