শেষ প্রান্তে গুড়পুকুরের মেলা, বেচাকেনায় স্বস্তি; আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
মিলন বিশ্বাস: শেষ মুহূর্তে এসে জমে উঠেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা। সময় ফুরিয়ে আসায় বেড়েছে দর্শনার্থীদের ভিড়, সঙ্গে বেড়েছে বেচাকেনাও। খেলনা, পোশাক, প্রসাধনী, আচার-চাটনি, খাবার ও বিভিন্ন পণ্যের দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের আয়োজন শেষে বিক্রি বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেলা শেষ হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ীর পরিবহন, দোকান স্থাপন ও অন্যান্য খরচ পুষিয়ে নেওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, মেলার আয়োজন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ইজারা এবং সরকারি রাজস্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠা অভিযোগগুলোরও পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। পৌরসভার মালিকানাধীন শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে মেলা অনুষ্ঠিত হলেও পৌরসভা কোনো রাজস্ব পায়নি বলে জানিয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
দুই বছর বিরতির পর গত ১ অক্টোবর সাতক্ষীরার শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় গুড়পুকুরের মেলা। জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ মেলার উদ্বোধন করেন।
প্রাথমিকভাবে ২০ দিনব্যাপী এ আয়োজনের সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০ অক্টোবর। মেলায় বসানো হয় বিভিন্ন ধরনের পণ্যের স্টল, খাবারের দোকান ও বিনোদনের নানা আয়োজন।
মেলার উদ্বোধনের সময় জেলা প্রশাসক জানান, ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনকে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়। জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজের উদ্বোধনী বক্তব্য অনুযায়ী, মেলায় পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।
জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম জানিয়েছিলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় ইউনিফর্মধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং মেলা ও আশপাশের এলাকার যান চলাচল নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া মেলা প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখা এবং পরিবেশদূষণ কমাতে প্রতিটি স্টলে ডাস্টবিন রাখার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছিল প্রশাসন। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী আয়োজনটি যেন সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মেলার শেষ দিকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ায় বিভিন্ন দোকানে বেচাকেনাও বেড়েছে। ক্রেতাদের আনাগোনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন দোকানিরা। কেউ শেষ মুহূর্তের বিক্রিতে বিনিয়োগের টাকা তুলে আনার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তাঁরা পণ্য নিয়ে আসেন। দোকান স্থাপন, মালামাল পরিবহন, গাড়িভাড়া, তাঁবু, ডেকোরেশন, বিদ্যুৎ, কর্মচারীদের মজুরি ও দৈনিক ভাড়াসহ নানা খাতে তাঁদের ব্যয় হয়। এসব খরচ তুলে লাভের মুখ দেখতে হলে পর্যাপ্ত সময় ধরে বেচাকেনার সুযোগ প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, মেলার মেয়াদ তুলনামূলক কম হলে অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে যাতায়াত ও দোকান পরিচালনার খরচ পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় মেলা চললে ক্রেতা পাওয়ার সুযোগ বাড়ে এবং প্রাথমিক ব্যয়ের কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
মেলায় দোকান বরাদ্দ ও আনুষঙ্গিক ব্যয় নিয়ে আগেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দোকানের আকার ও ধরনভেদে দৈনিক ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, তাঁবু, ডেকোরেশন ও অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
জুঁই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাহিদা আক্তার জানিয়েছেন, তাঁবুর জন্য ৭ হাজার টাকা, ডেকোরেশনের জন্য ৯ হাজার টাকা এবং ইট বাবদ ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং তিনটি লাইটের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
আচার-চাটনির দোকানি আব্দুস সামাদ বলেন, তাঁবুর জন্য ২০ হাজার ও ডেকোরেশনের জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মোট ৩০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, যার মধ্যে পাঁচটি লাইটের জন্য প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিতে হয়।
ব্যবসায়ীদের এসব বক্তব্যে মেলায় দোকান পরিচালনার ব্যয়ের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে সব দোকানের খরচ ও বিক্রির তথ্য এক নয়। তাই কারও ব্যবসা ভালো হলেও অন্য কারও লোকসান হতে পারে।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সাগর শিকদার দাবি করেছেন, এবারের মেলা পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা লোকসানে রয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ঢাকা, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দোকানিদের নিয়ে আসতে হয়। তাঁদের যাতায়াত, পরিবহন ও অন্যান্য খরচের পাশাপাশি মেলা পরিচালনার নানা ব্যয়ও বহন করতে হয়।
সাগর শিকদার বলেন, “এই মেলাটি করে আমার প্রচুর লস হয়েছে। ঠিকমতো টাকা উঠাতে পারিনি।” তাঁর দাবি, মেলা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যাশিত অর্থ ওঠেনি এবং খরচ সামাল দিতে তাঁকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
মেলার সময়সীমা নিয়ে তিনি বলেন, আগের বছরগুলোতে নির্ধারিত সময়ের পর কয়েক দফায় মেলার মেয়াদ বাড়ানো হতো। কখনো ১০ দিন, কখনো পাঁচ দিন করেও সময় বাড়ানো হয়েছে। তবে এবার জেলা প্রশাসক আর সময় বাড়াবেন না বলে জানিয়েছেন।
সাগর শিকদারের মতে, অল্প সময় মেলা চললে দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের পক্ষে গাড়িভাড়া, দোকান স্থাপন ও অন্যান্য খরচ তুলে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় মেলা চললে বেচাকেনার সুযোগ বাড়ে এবং ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যয়ের কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারেন।
মেলা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন সাগর শিকদার। তিনি বলেন, মেলা পরিচালনায় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। তাঁর দাবি, তিনি কোনো দলীয় পদ-পদবিতে ছিলেন না এবং মেলা পরিচালনায় একাধিক ব্যক্তি ও পক্ষের অংশগ্রহণ রয়েছে।
মেলা পরিচালনায় প্রশাসন, রাজনৈতিক পক্ষ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং কিছু সাংবাদিকের টাকা চাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নির্ধারিত সময় শেষে দোকানপাট ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য আয়োজকদের অতিরিক্ত কয়েক দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে মেলার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে আলোচনা তৈরি হলেও জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার সময় বাড়ানো হচ্ছে না।
জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, মেলার স্থাপনা খুলে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য আয়োজকেরা সময় চেয়েছেন। সে কারণে তাঁদের ধীরে ধীরে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, অতিরিক্ত সময়টি মেলার কার্যক্রম চালানোর জন্য নয়; বরং স্থাপনা খুলে সরিয়ে নেওয়ার সুবিধার্থে দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির তারিখ অপরিবর্তিত রেখেই মালামাল সরানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
মেলার বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় হলো সরকারি রাজস্ব। সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক পৌরসভার মালিকানাধীন জায়গা। বৃক্ষমেলা ও স্থানীয় মেলাসহ বিভিন্ন আয়োজনের জন্য এ জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে গুড়পুকুরের মেলাও সেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এ মেলা থেকে এখন পর্যন্ত পৌরসভা কোনো ধরনের রাজস্ব আদায় করেনি বা পায়নি।
মেলার দোকান বরাদ্দ, দৈনিক ভাড়া ও অন্যান্য খাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগের মধ্যে পৌরসভার এই বক্তব্য ইজারা ও অনুমতিপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। মেলার জন্য কোন কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিয়েছে, কী শর্তে আয়োজন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি পাওনা রয়েছে কি না তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু জানিয়েছেন, তাঁরা নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের ছেলে হাসান শিকদারকে মেলার ইজারা দেননি; খুলনার একজনকে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। মেলায় বিভিন্ন স্টল নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা ওই ব্যক্তির সঙ্গে এসেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে ইজারার মোট ডাক কত টাকা ছিল, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি আবু জাহিদ ডাবলু।
অন্যদিকে, হাসান শিকদার মেলার আয়-ব্যয়ের বিষয়ে বলেন, খরচ বাদ দিয়ে যা থাকবে, সেটিই অবশিষ্ট। তাঁর দাবি, মেলা পরিচালনা করতে গিয়ে এবার প্রত্যাশিত অর্থ ওঠেনি। তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের পদে নেই বলেও জানান।
গুড়পুকুরের মেলাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক। তিনি বলেছেন, মেলার ঐতিহ্যকে সামনে রেখে চাঁদাবাজি চলতে থাকলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মেলার অর্থ আদায় ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোতেও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে এসেছে। তবে অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণে প্রমাণ, নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
গুড়পুকুরের মেলা সাতক্ষীরার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এই আয়োজনকে ঘিরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অস্থায়ী দোকানি, শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। শেষ মুহূর্তে বেচাকেনা বাড়ায় কিছু ব্যবসায়ী স্বস্তি পেলেও দীর্ঘ যাতায়াত ও দোকান পরিচালনার ব্যয় পুষিয়ে নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
একদিকে প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও সময়সংকট এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সব মিলিয়ে এবারের গুড়পুকুরের মেলা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভবিষ্যতে মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ, দোকান বরাদ্দ ও ভাড়ার নিয়ম স্পষ্ট করা, ইজারার নথি সংরক্ষণ এবং সরকারি রাজস্বের হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি। এতে একদিকে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী অংশ নিতে পারবেন, অন্যদিকে মেলার ব্যবস্থাপনা নিয়েও জনমনে আস্থা বাড়বে।












