সুন্দরবনে জলদস্যুর আতঙ্ক: নিরাপত্তাহীনতায় জেলে-বাওয়ালিরা
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
সুন্দরবন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন নয়, সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকারও অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু সেই সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে জলদস্যুদের তৎপরতা, জেলেদের অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করা বনজীবীদের কাছে এখন বনে যাওয়ার অর্থ শুধু পরিশ্রম ও অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তার ঝুঁকি।
সস্থানীয় দের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায় ৬ মে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে মুক্তিপণের দাবিতে ২২ জেলেকে অপহরণ করা হয় । চুনকুড়ি, মালঞ্চ নদীর আগা, চালতেবেড়ে, মাইটভাঙা ও পশুরতলা খাল এলাকায় এসব অপহরণের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়দের দাবি। ১ জুন ৬ জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করেন। এছাড়াও স্থানীয়রা বলেন অনেক কথা আমাদেরকে গোপন রাখতে হয় গোপন না রাখলে পরবর্তীতে আমাদেরকে এর খেসারত দিতে হয় এইজন্য সব কথা আমরা সাংবাদিকদের সাথে বলতে আগ্রহী নয়। এসব ঘটনা সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জেলে বাওয়ালিরা বলেন মাছ ধরার সরঞ্জাম, নৌকা, জ্বালানি, খাবার ও বনের পাসসহ বিভিন্ন খাতে আমাদের আগে থেকেই অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে দস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়ার আশঙ্কা যুক্ত হলে আমাদের আর্থিক ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ঋণ করে বনে যাওয়া কোনো জেলে অপহৃত হলে তাঁর পরিবারকে একদিকে উপার্জন বন্ধ হওয়ার চাপ, অন্যদিকে স্বজনকে মুক্ত করার দুশ্চিন্তা সামলাতে হয়।
মধু সংগ্রহকারী বাওয়ালি, কাঁকড়া শিকারি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জীবনেও এই আতঙ্কের প্রভাব পড়ে। নিরাপত্তার অভাবে বনে যাওয়া কমে গেলে আয় কমে যায়, আবার জীবিকার তাগিদে বনে না গেলেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সুন্দরবনের নিরাপত্তা সংকট শেষ পর্যন্ত উপকূলের দরিদ্র মানুষের খাদ্য, ঋণ ও পারিবারিক জীবনের সংকটে রূপ পড়ছে।
জেলে বাওয়ালিদের বাদি গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা। একই সঙ্গে বনজীবীদের কাছ থেকে গোপনীয়তা রক্ষা করে তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং বিপদে পড়লে দ্রুত যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম নিশ্চিত করা। মুক্তিপণ আদায়ের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, অপরাধীদের আশ্রয়দাতা এবং সহযোগীদের শনাক্ত করাও দস্যুতা নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা।
কোনো জেলে বা বনজীবী অপহৃত হলে তাঁর পরিবার যাতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সে জন্য নির্দিষ্ট যোগাযোগকেন্দ্র ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া।
আত্মসমর্পণ হচ্ছে, তবু কেন ফিরছে না আতঙ্ক?
সুন্দরবনে জলদস্যুতা দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও আত্মসমর্পণের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। ৩১ আগস্ট ৪টি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্য র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ৯ অক্টোবর আলিফ বাহিনীর আবদুল্লাহ ও মজিদ গ্রুপের আরও ১৫ সদস্য সুন্দরবন রিজিয়নাল বোটের (এসআরবি-৬) কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিছু গ্রুপ বা জলদস্য আত্মসমর্পণ করলেও থামছে না জেলে বাওয়ালিদের আতঙ্ক, প্রয়োজনে প্রশাসনকে
ব্যবস্থা নিতে হবে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ নদীপথ, খাল ও দুর্গম বনাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এ ক্ষেত্রে কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বন বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে। তবে পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অপহরণের অভিযোগ দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
জেলেদের নৌযান চলাচল, বনে প্রবেশ ও মাছ-কাঁকড়া আহরণের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বনজীবীদের কাছ থেকে গোপনীয়তা রক্ষা করে তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং বিপদে পড়লে দ্রুত যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম নিশ্চিত করতে হবে। মুক্তিপণ আদায়ের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, অপরাধীদের আশ্রয়দাতা এবং সহযোগীদের শনাক্ত করা ও দস্যুতা নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। কোনো জেলে বা বনজীবী অপহৃত হলে তাঁর পরিবার যাতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সে জন্য নির্দিষ্ট যোগাযোগকেন্দ্র ও দ্রুত সাড়াদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বশেষ কথা: সুন্দরবন রক্ষায় জেলে-বাওয়ালিদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বন বিভাগের বৈধ পাস ও অনুমতি ছাড়া বনে প্রবেশ করা যাবে না। নির্ধারিত এলাকার বাইরে মাছ ধরা, নিষিদ্ধ সময়ে বনে নামা কিংবা মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করা যাবে না। কোনো বন্যপ্রাণী শিকার বা হত্যা করা যাবে না। দস্যুদের তৎপরতা বা অবৈধ শিকার চোখে পড়লে বন বিভাগকে জানাতে হবে।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা, সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা।
















