প্রকাশ ঘোষ বিধান
প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও মায়াবী আবেশ ছড়ায় ছোট্ট শিউলি ফুল। রাতের বেলা ফোটা এবং সূর্য ওঠার আগেই ঝরে পড়ার বৈশিষ্ট্যের কারণে ফুলটিকে বলা হয় ‘রাতের রানি’। ভোরে শিউলি গাছের নিচে সাদা-কমলা ফুলের বিছানা তৈরি হয়। শিশিরভেজা ফুলের মিষ্টি সুবাসে চারপাশ ভরে ওঠে এক অপূর্ব স্নিগ্ধতায়।
শরৎ ও হেমন্তের অন্যতম আকর্ষণ শিউলি। এর সাদা পাপড়ির মাঝখানে উজ্জ্বল কমলা রঙের বোঁটা ফুলটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য। ফুলটি আকারে ছোট; সাধারণত পাঁচ থেকে সাতটি সাদা পাপড়ি থাকে। শিউলি গাছের ছাল ধূসর ও কিছুটা নরম, উচ্চতা প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর পাতাগুলো খসখসে এবং বিপরীতমুখী বিন্যাসে সাজানো থাকে। ইংরেজিতে ফুলটি ‘নাইট জেসমিন’ নামেও পরিচিত। হিন্দু পুরাণে একে স্বর্গের ফুল ‘পারিজাত’ বলা হয়েছে।
শিউলি ফুল ছাড়া বাঙালির শারদীয় উৎসব ও দুর্গাপূজার আবহ যেন পূর্ণতা পায় না। হিন্দুধর্মে পূজার্চনায় ফুলটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মাটিতে ঝরে পড়ার পরও শিউলি ফুল পূজার অঞ্জলিতে ব্যবহার করা হয়। এর সৌন্দর্য ও সুবাস বাঙালির শরৎকালীন প্রকৃতি ও উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।
পুরাণের কাহিনি অনুসারে, পারিজাতিকা নামে এক রাজকন্যা সূর্যদেবের প্রতি ব্যর্থ প্রেমের কারণে আত্মহত্যা করলে তাঁর চিতাভস্ম থেকে শিউলি গাছের জন্ম হয়। সূর্যের তীব্র আলো সহ্য করতে পারে না বলেই ফুলটি ভোরে ঝরে পড়ে—এমন লোকবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে।
আবহমান বাংলার এই চিরচেনা ফুলকে ঘিরে পৌরাণিক কাহিনি, গান, কবিতা ও সাহিত্য রচিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিউলিকে ‘শেফালি’ নামেও উল্লেখ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামসহ বহু কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টিতে শিউলি ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাস স্থান পেয়েছে।
শিউলি ফুলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে এর ঐতিহ্যগত ব্যবহারও। অতীতে ফুলের কমলা রঙের বোঁটা শুকিয়ে গুঁড়া করে কাপড় রং করার কাজে ব্যবহার করা হতো। এ থেকে সোনালি-হলুদ রং তৈরি করা সম্ভব। ভারতের কিছু অঞ্চলে শিউলি ফুল ও এর বিভিন্ন অংশ খাবার তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। শিউলি পাতার রস লোকজ চিকিৎসায় জ্বর, বাতব্যথা, কৃমি ও কাশির উপশমে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে এসব চিকিৎসাগত ব্যবহারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।
শিউলি কেবল একটি ফুল নয়; এটি বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য, শারদীয় উৎসব ও নস্টালজিয়ার এক অনন্য প্রতীক। ভোরের শিশিরে ভেজা সাদা-কমলা পাপড়ি আর মিষ্টি সুবাস নিয়ে শিউলি প্রতিবছর প্রকৃতিকে সাজায় নতুন রূপে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট