বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

দেবহাটায় জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণে অ্যাডভোকেসি সংলাপ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪০ অপরাহ্ণ
দেবহাটায় জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণে অ্যাডভোকেসি সংলাপ

নিজস্ব প্রতিনিধি: সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক জেন্ডারভিত্তিক ধারণা ও বৈষম্য দূরীকরণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কিশোরীদের নিরাপদ ও ইতিবাচক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর লক্ষ্যে সাতক্ষীরার দেবহাটায় অ্যাডভোকেসি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) দেবহাটা উপজেলা পরিষদ হলরুমে ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পের আওতায় এ সংলাপের আয়োজন করে আমাদের যুব টিম। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সংলাপে জেন্ডারভিত্তিক নেতিবাচক ধারণার প্রভাব, নারী ও কিশোরীদের সমান সুযোগ ও অংশগ্রহণ, অনলাইন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের ভূমিকা এবং সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি নেতা ও যুব সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

আয়োজকরা জানান, সংলাপের আগে প্রকল্পের ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দুই দিনে পৃথক দুটি যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠনের ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সেশনে ১৫ জন নারী ও ১৫ জন পুরুষসহ ৩০ জন করে তরুণ-তরুণী অংশ নেন। দুই সেশনে মোট ৬০ জন অংশগ্রহণকারী জেন্ডারভিত্তিক প্রচলিত ধারণা, নারী ও কিশোরীদের অধিকার, সুরক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, গণমাধ্যম বিষয়ে সচেতনতা এবং সামাজিক পরিবর্তনে তরুণদের নেতৃত্ব ও অ্যাডভোকেসি নিয়ে আলোচনা করেন।

পূর্ববর্তী সেশনগুলোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আয়োজিত সংলাপে তরুণদের মতামত ও সুপারিশ স্থানীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং নারী ও কিশোরীদের নিরাপদ ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন মারুফ সাহা, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাসরিন জাহান, উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মিজানুর রহমান, দেবহাটা রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, দেবহাটা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কবির হোসেন, দেবহাটা সদর ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য রেহেনা পারভীন, টাউনশ্রীপুর শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. আমিরুল ইসলামসহ ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, তরুণ ও নারী নেতারা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ‘সমতায় তারুণ্য’ প্রকল্পের কর্মী মো. মনিরুল ইসলাম।

আয়োজকরা বলেন, জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের পথ সুগম করবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।

Ads small one

উপকূলের জেলেদের জীবনসংগ্রাম: ঋণের ফাঁদে জীবিকার লড়াই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১০ অপরাহ্ণ
উপকূলের জেলেদের জীবনসংগ্রাম: ঋণের ফাঁদে জীবিকার লড়াই

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সমুদ্রের দিকে যাত্রা করেন জেলেরা, সঙ্গে থাকে মাছ ধরার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ঋণের বোঝা, অনিশ্চিত আয় আর মৃত্যুর ঝুঁকি। নৌকা মেরামত, জাল কেনা, জ্বালানি ও রসদ সংগ্রহের টাকা জোগাড় করতে অনেক জেলেকে যেতে হয় মহাজনের কাছে। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তাঁরা পাড়ি জমান বঙ্গোপসাগরে। মাছ পেলে ঋণ শোধের আশা, আর মাছ না পেলে বাড়ে দেনার বোঝা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলদস্যুর ভয় কিংবা নৌকাডুবির ঘটনা তাঁদের সেই অনিশ্চয়তাকে আরও গভীর করে তোলে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে জেলেদের জীবনসংগ্রামের চিত্র এমনই।

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের জীবিকা নদী ও সমুদ্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগর বহু পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও দাকোপ; বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা ও রামপাল; সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির বহু মানুষ মাছ ধরা, মাছের ব্যবসা, শুঁটকি উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট পেশার ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের শ্রমে গড়ে উঠেছে মৎস্য অর্থনীতির বড় একটি অংশ। অথচ এই অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষের একটি অংশের জীবন কাটে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে।

প্রতি বছর শুঁটকির মৌসুম সামনে রেখে পাইকগাছার জেলেপল্লিগুলোতে শুরু হয় সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি। উপজেলার বোয়ালিয়া, মাহামুদকাঠি, হিতামপুর, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, রামনাথপুর ও কাঠিপাড়া গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবার মৎস্য আহরণের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য উপজেলার জেলেপল্লিগুলোর ১ হাজার ৯৫০ জন জেলে তালিকাভুক্ত রয়েছেন এবং তাঁরা সরকারি খাদ্যসহায়তা পান। কিন্তু খাদ্যসহায়তা দিয়ে পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদার কিছুটা পূরণ হলেও সমুদ্রযাত্রার প্রয়োজনীয় পুঁজি জোগাড় হয় না।

এই ঘাটতি পূরণ করতে জেলেদের অনেকেই মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেন। ঋণের বিনিময়ে মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে মহাজনের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। মাছ ধরার পর আয় থেকে জ্বালানি, রসদ, নৌকা ও জালের খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, তা দিয়েই ঋণ শোধ করতে হয়। মাছ কম পাওয়া গেলে কিংবা দুর্যোগে নৌকা-জাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে হিসাব মেলে না। তখন আগের ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবেই জীবিকার পুঁজি জোগাড়ের ব্যবস্থা অনেক সময় জেলেদের জন্য ঋণের ফাঁদে পরিণত হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের মৎস্যসম্পদ আহরণে যাঁদের শ্রম ও জীবনের ঝুঁকি জড়িয়ে আছে, তাঁদের মাছ ধরতে যাওয়ার পুঁজির জন্য কেন মহাজনের দ্বারস্থ হতে হবে?

খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে সমস্যার ধরন এক হলেও সব এলাকার সংকট এক রকম নয়। কোথাও নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় মাছ ধরার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বেশি, আবার কোথাও সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর নির্ভরতা পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে।

খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও দাকোপের জেলেদের জন্য নদী ও সাগরে মাছ ধরার সুযোগের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য একটি বড় প্রশ্ন। নৌকা, জাল ও জ্বালানির খরচ বহন করতে না পারলে মাছ ধরার সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো কঠিন। অন্যদিকে বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোংলাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার জেলেদের জীবিকার সঙ্গে নদী, সাগর ও বনের সম্পর্ক গভীর। মাছ ধরার পাশাপাশি সুন্দরবনের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশের অনুমতি, বন বিভাগের নিয়ম এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো তাঁদের কাজের ওপর প্রভাব ফেলে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির উপকূলেও নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং জীবিকার সীমাবদ্ধতা বহু পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ। কোনো এলাকায় নদী ও খালে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বসতভিটা ও সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবারগুলো বিকল্প আয়ের সন্ধানে নামে। কিন্তু পুঁজি ও দক্ষতার অভাবে সেই বিকল্প জীবিকা গড়ে তোলা সহজ হয় না।

এই তিন জেলার সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সাধারণ বাস্তবতা—প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় অনিশ্চিত, অথচ জীবিকা চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় নিশ্চিত। সংসারের খরচ থেমে থাকে না, নৌকার জ্বালানি কিনতে হয়, জাল মেরামত করতে হয়। আয় অনিশ্চিত হলেও এসব খরচের জন্য টাকা জোগাড় করা বাধ্যতামূলক। ফলে আর্থিক সংকটের সময় জেলেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে যায় এবং তাঁরা ঋণদাতার শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হন।

জেলেদের জন্য ব্যাংকঋণ ও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা সহজলভ্য, সেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক জেলের নিয়মিত আয় নেই, জমির মালিকানা নেই কিংবা ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র ও জামানত দেওয়ার সামর্থ্য নেই। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ তাঁদের জন্য অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে মহাজন দ্রুত টাকা দেন। কিন্তু সেই ঋণের সুদ, পরিশোধের শর্ত কিংবা মাছ বিক্রির বাধ্যবাধকতা জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। ঋণ নেওয়ার সময় জরুরি প্রয়োজন সামনে থাকে, কিন্তু ঋণ শোধের হিসাব তখন অনেকের পক্ষেই স্পষ্টভাবে করা সম্ভব হয় না।

পাইকগাছার বোয়ালিয়া জেলেপল্লির বাসিন্দা অশোক বিশ্বাসের অভিযোগ, প্রতিবছর মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তাঁদের সমুদ্রে যেতে হয়। সরকারি সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করেন তিনি। একই এলাকার জেলে সিতেনাথ বিশ্বাসের বক্তব্য, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরে তাঁরা সরকারকে রাজস্ব দেন, অথচ মাছ ধরার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পান না।

এই অভিযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থা ও উপকূলীয় জীবিকার মধ্যে দূরত্বের প্রশ্ন সামনে আনে। তবে দাদনপ্রথার প্রকৃত ব্যাপ্তি, ঋণের সুদের হার এবং জেলেদের ওপর এর আর্থিক প্রভাব বুঝতে তিন জেলার হালনাগাদ তথ্যভিত্তিক জরিপ প্রয়োজন।

সরকারি সহায়তার লক্ষ্য হওয়া উচিত জেলেদের ঋণগ্রস্ততা কমানো এবং তাঁদের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। প্রকৃত জেলেদের তালিকা যাচাই করে সহজ শর্তে স্বল্প সুদের মৌসুমি ঋণ দেওয়া যেতে পারে। ঋণের কিস্তি নির্ধারণ করতে হবে মাছ ধরার মৌসুম ও আয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে। মাছ ধরতে যাওয়ার আগে ঋণ পাওয়া গেলে জেলেদের মহাজনের কাছে যেতে হওয়ার চাপ কমতে পারে।

সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব শুধু নৌকায় থাকা জেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যাঁরা ঘরে অপেক্ষা করেন, তাঁদের জীবনও অনিশ্চয়তায় পড়ে। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী নিখোঁজ হলে কিংবা নৌকা ও জাল হারালে সংসারের আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অথচ ঋণের কিস্তি, খাবারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় তখনও বহন করতে হয়।

বঙ্গোপসাগরে আকস্মিক ঝড়, নিম্নচাপ ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি রয়েছে। আবহাওয়ার সতর্কবার্তা সময়মতো না পাওয়া, যোগাযোগযন্ত্রের অভাব এবং নৌযানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী না থাকলে বিপদের আশঙ্কা বাড়ে। আধুনিক অবস্থান শনাক্তকরণ যন্ত্র, কার্যকর বেতার যোগাযোগ, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা তাই বিলাসিতা নয়; এগুলো জেলেদের নিরাপদে কাজ করার মৌলিক প্রয়োজন।

জলদস্যুতা, চাঁদাবাজি কিংবা সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় হয়রানির অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। বন বিভাগের নিয়ম মেনে বৈধভাবে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা যেন কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ আদায় বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রচলিত আইন মানাও জরুরি। জেলেদের নিরাপত্তা ও বন সংরক্ষণকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুটিই নিশ্চিত করা সম্ভব।

উপকূলের নদ-নদী ও খালের নাব্যতা কমে গেলে নৌযান চলাচল, মাছের আবাসস্থল এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদী ও খালে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে জেলেদের দূরে যেতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ ও সমুদ্রে অবস্থানের সময় বাড়ে। কিন্তু বাড়তি ব্যয়ের তুলনায় আয় বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

তাই খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার নদ-নদী ও খালগুলোর বাস্তব অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী খনন, দখলমুক্তকরণ এবং পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৎস্যসম্পদ আহরণের উদ্যোগও প্রয়োজন। এসব কাজের পরিকল্পনায় স্থানীয় জেলেদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এর পাশাপাশি মৌসুমের বাইরে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মাছ সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, নৌকা মেরামত ও বৈধ জলজ সম্পদভিত্তিক কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। জেলে পরিবারের নারীদের জন্যও উপযোগী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে পরিবারের মোট আয় বাড়বে এবং একটি মাত্র পেশার ওপর নির্ভরতা কমবে।

জেলেদের জন্য খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই যথেষ্ট নয়। তাঁদের প্রয়োজন সহজ শর্তে ঋণ, নিরাপদ নৌযান, দুর্যোগকালীন সুরক্ষা, ন্যায্য বাজারব্যবস্থা এবং ক্ষতির পর পুনরায় কাজে ফেরার সুযোগ। মাছ ধরার মৌসুমে তাঁদের আয় যেমন অনিশ্চিত, তেমনি দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও সীমিত। তাই ঋণ, বিমা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রকৃত জেলেদের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করে তাঁদের পেশা, নৌযান, ঋণের পরিমাণ ও মৌসুমি আয়ের তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে জেলেদের প্রয়োজন নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারক করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জেলেদের কেবল সহায়তা গ্রহণকারী মানুষ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁরা উৎপাদক, শ্রমজীবী এবং দেশের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার অংশ। তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

সমুদ্রে যাওয়ার আগে একজন জেলের হাতে যদি নৌকা মেরামতের টাকা না থাকে, নিরাপত্তার সরঞ্জাম না থাকে এবং ঋণ শোধের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে তাঁর যাত্রা শুরু হয় একাধিক ঝুঁকি নিয়ে। মাছ ধরতে গিয়ে তাঁকে প্রকৃতির সঙ্গে লড়তে হয়; ফিরে এসে লড়তে হয় ঋণ ও সংসারের খরচের সঙ্গে। এই দ্বিমুখী লড়াই থেকে জেলেদের মুক্তি দিতে হলে বিচ্ছিন্ন সহায়তা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ।

খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার জেলেরা সাগরে যাবেন, মাছ ধরবেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জীবিকার সন্ধানে তাঁদের যেন ঋণের ফাঁদে পড়তে না হয়, নিরাপত্তাহীনতায় জীবন হারানোর ভয় নিয়ে চলতে না হয়। সমুদ্র থেকে মাছের সঙ্গে তাঁরা যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন এবং পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আবারও মহাজনের কাছে অসহায়ভাবে হাত পাততে বাধ্য না হন। উপকূলের জেলেদের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষায় এখন সেই নিশ্চয়তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

লেখক: সংবাদকর্মী

পাইকগাছায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৬ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত

কপিলমুনি (পাইকগাছা) প্রতিনিধি: ‘হাত ধোয়ার নায়ক হোন’ প্রতিপাদ্যে খুলনার পাইকগাছায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে র‌্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে উপজেলা প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আয়োজনে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে র‌্যালি বের করা হয়। পরে হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী প্রশান্ত কুমার পাল স্বাগত বক্তব্য দেন। এ সময় জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা এস এম আমিনুল ইসলাম, পৌর বিএনপির সভাপতি আসলাম পারভেজসহ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

সাতক্ষীরায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে প্রদর্শনী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩৩ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে প্রদর্শনী

সংবাদদাতা: ‘হাত ধোয়ার নায়ক হোন’ প্রতিপাদ্যে সাতক্ষীরায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সাতক্ষীরা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রধান অতিথি হিসেবে বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক কাওছার আজিজ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) রিপন বিশ্বাস।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম টুকু, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের একাংশের সভাপতি জি এম মনিরুল ইসলাম মনি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান মনির, এস্টিমেটর মো. মফিজুর রহমান, প্রধান সহকারী মো. ইব্রাহিম হোসেন রিপন ও ক্যাশিয়ার শংকর কুমার বিশ্বাস। এ ছাড়া উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের উপপরিচালক মনিরুজ্জামান মনি, নবদিগন্ত সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. বজলুর রহমান এবং হাই সোয়া সংস্থার জেলা প্রতিনিধি মো. মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা সুস্থ ও নিরাময়ী জীবনযাপনে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়ার সঠিক পদ্ধতি প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।