তেল ছাড়াই ছুটছে গাড়ি: সাতক্ষীরার ফারুক হোসেনের উদ্ভাবনীতে চমক, উঠছে বাস্তবতার প্রশ্ন
0-0x0-0-0#
মিলন বিশ্বাস: দেশজুড়ে যখন জ্বালানি তেলের সংকট চরমে, পেট্রোল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না-ঠিক এমন সময় ব্যতিক্রমী এক উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনায় এসেছেন সাতক্ষীরার শেখ ফারুক হোসেন। তেল ছাড়াই চলতে পারে-এমন একটি প্রাইভেটকার তৈরি করে তিনি এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার থানাঘাটা গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেন (৫৫)। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষা না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতির প্রতি আগ্রহ তাকে গড়ে তুলেছে একজন স্বশিক্ষিত উদ্ভাবক হিসেবে। দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতায় তিনি একের পর এক ব্যতিক্রমী কাজ করে আসছেন।
সম্প্রতি তার তৈরি তেলবিহীন গাড়িটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ায় বাড়ছে আগ্রহ—সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের।
ফারুক হোসেন জানান, ১৯৮০ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন মেকানিক্যাল কাজের সঙ্গে যুক্ত। এর আগে তুষ কাঠ, ফিল্টার পানি, ফার্নিচার এমনকি পলিথিন থেকে পেট্রোল-ডিজেল তৈরির কাজও করেছেন। ২০২২ সালে তিনি ‘টাইগার বাইক’ তৈরি করেন, যা তেল ও বিদ্যুৎ ছাড়াই চলার দাবি করা হয়। এবার তৈরি করেছেন তেলবিহীন প্রাইভেটকার।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িটি ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম। এতে ব্যবহৃত হয়েছে পাঁচটি ৬০ ভোল্টের ব্যাটারি এবং একটি ৬০ ভোল্টের মোটর। প্রথমে ব্যাটারি থেকে শক্তি নিয়ে গাড়িটি চালু হয়, পরে মোটরের মাধ্যমে নিজেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে ব্যাটারি চার্জ হতে থাকে-এমনটাই দাবি তার। তিনি বলেন, “গাড়িটি যত চলবে, ততই নিজে নিজে শক্তি উৎপন্ন করবে।”
গাড়িটি তৈরি করতে তার প্রায় দুই মাস সময় লেগেছে বলেও জানান তিনি। একই প্রযুক্তিতে ছয় চাকার গাড়ি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যার সম্ভাব্য খরচ ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।
গাড়িটি পরিদর্শনে আসা ইঞ্জিনিয়ার জাহিদুল হক বলেন, “আমরা চালিয়ে দেখেছি। তেল ছাড়াই চলা এবং নিজে চার্জ হওয়া বিষয়টি আকর্ষণীয়। উন্নয়ন করা গেলে এটি দেশের জন্য ভালো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।”
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান মনে করেন, জ্বালানি সংকটের সময়ে এমন উদ্যোগ মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে। অন্যদিকে হাফিজুর রহমান বলেন, “আমাদের এলাকার একজন এমন কাজ করেছেন, এটা গর্বের বিষয়।”
তবে বিষয়টি নিয়ে সংশয়ও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। সাতক্ষীরা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ইন্সট্রাক্টর মো. মেহেদী হাসান বলেন, “বাইরের কোনো উৎস ছাড়া ব্যাটারি চার্জ হয়ে চলা অনেকটা ‘ফ্রি এনার্জি’র মতো শোনায়। তাই বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা জরুরি।”
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত জানান, বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের আশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও গবেষণার মাধ্যমে যদি এই প্রযুক্তির সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে এটি দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এমন দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
উদ্ভাবনটি যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়-গবেষণার আলোয় এই উদ্ভাবন কতটা বাস্তবতা।







