প্রসঙ্গ: সুন্দরবনের মধু-যাত্রা: শঙ্কা ও সাহসের অন্তহীন লড়াই
সম্পাদকীয়
সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে দ্বিতীয় দফার মধু সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু করেছেন মৌয়ালরা। বাঘের গর্জন আর বিষধর সাপের ভয় তো আছেই, তার ওপর যোগ হয়েছে বনদস্যুর নতুন আতঙ্ক। জীবন-মৃত্যুর এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শুরু হওয়া এই মধু-যাত্রা কেবল একটি পেশা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াই। পেটের তাগিদে মৌয়ালদের এই মরণপণ ঝুঁকি নেওয়ার গল্পটি যতটা সাহসের, তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্বেগের।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ সংলগ্ন গ্রামগুলোর মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বললে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠেÑপ্রকৃতির চেয়ে এখন তারা মানুষের তৈরি সংকটেই বেশি ভীত। এক দশকেরও বেশি সময় বনদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের সেই স্বস্তি যেন আবার ফিকে হতে শুরু করেছে। মৌয়ালদের অভিযোগ, বনের গহিনে দস্যুরা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে এবং মধু সংগ্রহের এই ভরা মৌসুমে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া প্রথম দফার অভিযানে ৫৮৪ কুইন্টালের বেশি মধু সংগৃহীত হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। কিন্তু এই সোনালি মধুর গন্ধে এখন মিশে আছে দস্যু আতঙ্ক আর দাদনের বোঝা।
মৌয়ালদের এই ঝুঁকির পেছনে বড় একটি কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য। অধিকাংশ মৌয়াল মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ‘দাদন’ বা আগাম ঋণ নিয়ে বনের সরঞ্জাম কেনেন। এই ঋণের জালে তারা এমনভাবে আটকা পড়েন যে, জীবনের ঝুঁকি জেনেও তাদের বনে যেতেই হয়। যদি পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহ করা না যায়, তবে ঋণের দায়ে পুরো পরিবারকে পথে বসতে হবে। জীবিকার এই কঠোর বাস্তবতাই তাদের বাঘের মুখের সামনে ঠেলে দিচ্ছে।
বন বিভাগ নিরাপত্তার স্বার্থে টহল জোরদারের কথা বললেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। বনজীবীদের অভিযোগ, দস্যুদের নজরদারি বাড়লেও সেই তুলনায় বনরক্ষীদের তৎপরতা পর্যাপ্ত নয়। মনে রাখতে হবে, সুন্দরবন কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ঢাল নয়, এটি হাজার হাজার মানুষের জীবিকার উৎস। যদি মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি যেমন হুমকির মুখে পড়বে, তেমনি সরকারও হারাবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
আমরা মনে করি, মৌয়ালদের এই আজন্ম লড়াইকে কেবল ‘ভাগ্য’ হিসেবে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রথমত, সুন্দরবনের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও আধুনিক ও সক্রিয় করে দস্যুতার যেকোনো অপচেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মৌয়ালদের দাদনের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। বনের মধু সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্যে কেনার নিশ্চয়তা দিলে মৌয়ালরা মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ থেকে মুক্তি পাবেন।
সুন্দরবনের সোনালি মধু আমাদের গর্ব। কিন্তু সেই মধু আহরণ করতে গিয়ে যাতে আর কোনো প্রাণ অকালে ঝরে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। শঙ্কা নয়, সাহস আর নিরাপত্তাই হোক মৌয়ালদের নতুন মধু-যাত্রার সঙ্গী।









