দুঃখের অন্তরে সুখের আগুন, নিভানো কি যায়?
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
মানুষের জীবনে দুঃখ নতুন কিছু নয়। জন্মের পর থেকেই মানুষ সংগ্রামের মধ্যে বড় হয়। কেউ অভাবের সঙ্গে লড়াই করে, কেউ সম্পর্কের ভাঙনে ভেঙে পড়ে, কেউ প্রিয়জন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়ায়, আবার কেউ নিজের ভেতরের একাকিত্বের কাছে প্রতিদিন পরাজিত হয়। তবু আশ্চর্য জনক ভাবে মানুষ বেঁচে থাকে। শুধু বেঁচেই থাকে না, নতুন স্বপ্নও দেখে। ভাঙা হৃদয় নিয়েও ভালোবাসে। অপমান ভুলে আবার নতুন করে পথচলা শুরু করে। প্রশ্ন হলোÑমানুষ এই শক্তি কোথা থেকে পায়?
সম্ভবত মানুষের ভেতরে এমন এক অদৃশ্য আগুন আছে, যা সব দুঃখের পরও নিভে যায় না। সেই আগুনের নাম সুখের আকাক্সক্ষা, আশার আলো, বেঁচে থাকার ইচ্ছা। পৃথিবীর সবচেয়ে হতাশ মানুষটিও কোনো না কোনো জায়গায় একটু আলো খুঁজে বেড়ায়। কেউ সন্তানের মুখে, কেউ মায়ের দোয়ায়, কেউ ভালোবাসার মানুষটির অপেক্ষায়, কেউ আবার ভবিষ্যতের কোনো অজানা সম্ভাবনায়।
এই কারণেই মানুষ কাঁদতে কাঁদতেও বেঁচে থাকে।আজকের পৃথিবীতে মানুষের বাহ্যিক উন্নতি যত বেড়েছে, ভেতরের অস্থিরতাও যেন তত বেড়েছে। উঁচু দালান, আধুনিক প্রযুক্তি, বিলাসী জীবনÑসবকিছুর মাঝেও মানুষের মনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা শুধু অর্থ দিয়ে পূরণ হয় না। কারণ মানুষের ভেতরের সুখ কোনো বাজারে বিক্রি হয় না।একসময় মানুষ সুখ খুঁজত পরিবারের মধ্যে। সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া, উঠানে গল্প করা, গ্রামের মেঠোপথে হাঁটা কিংবা ঈদের নতুন জামায় হাসিÑএসব ছিল সুখের অংশ। এখন সুখের সংজ্ঞা বদলে গেছে। মানুষ এখন সুখকে সামাজিক মর্যাদা, দামি মোবাইল, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইক-কমেন্টের মধ্যে খুঁজছে। এই পরিবর্তনের ফলে মানুষ বাহ্যিকভাবে সফল হলেও ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। কারণ সুখ যখন তুলনার বিষয় হয়ে যায়, তখন তা আর সুখ থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য সাজানো হাসিমুখ দেখি। কেউ বিদেশ ভ্রমণে, কেউ নতুন গাড়ির পাশে, কেউ সুখী পরিবারের ছবিতে। এসব দেখে অনেকের মনে হয়, পৃথিবীর সবাই সুখী, শুধু সে-ই অসুখী। অথচ বাস্তবতা হলো, ছবির হাসির পেছনেও অজস্র কান্না লুকিয়ে থাকে। আজ মানুষ নিজের দুঃখ প্রকাশ করতেও ভয় পায়। কারণ সমাজ দুর্বল মানুষকে সহজে গ্রহণ করে না। সবাইকে শক্ত থাকার অভিনয় করতে হয়। এই অভিনয় একসময় মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। দুঃখকে আমরা সাধারণত অভিশাপ মনে করি। কিন্তু জীবনের গভীর সত্য হলো, দুঃখ মানুষকে এমন কিছু শিক্ষা দেয়, যা সুখ কখনো দিতে পারে না।একজন মানুষ যখন কষ্টের ভেতর দিয়ে যায়, তখন সে অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখে। অভাব মানুষকে বিনয়ী করে, ব্যর্থতা মানুষকে ধৈর্য শেখায়, অপমান মানুষকে আত্মসম্মানের মূল্য বোঝায়।
জীবনের সবচেয়ে বড় সাহিত্য, সবচেয়ে গভীর গান, সবচেয়ে শক্তিশালী কবিতাÑসবই এসেছে মানুষের দুঃখ থেকে। পৃথিবীর বড় বড় শিল্পী ও সাহিত্যিকরা তাদের ব্যক্তিগত বেদনা থেকেই সৃষ্টি করেছেন অমর শিল্প।কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্য, বৈষম্য আর অবহেলার আগুন থেকে বিদ্রোহের ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একের পর এক প্রিয়জন হারিয়েও জীবনের গান লিখেছেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন নিঃসঙ্গতা আছে, তেমনি আছে বেঁচে থাকার এক নীরব আকুতি। দুঃখ মানুষকে গভীর করে। সুখ মানুষকে আনন্দ দেয়, কিন্তু দুঃখ মানুষকে চিনতে শেখায়।
বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে গেলে এখনো দেখা যায়, দুঃখের মাঝেও মানুষ কী অসাধারণভাবে জীবনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচে। একজন কৃষক সারাবছর পরিশ্রম করে। কখনো খরা, কখনো বন্যা, কখনো ঘূর্ণিঝড় তার ফসল নষ্ট করে দেয়। ঋণের বোঝা বাড়ে। তবু পরের মৌসুমে আবার সে জমিতে বীজ ফেলে। কারণ সে জানে, আশা ছাড়া জীবন চলে না। উপকূলের মানুষদের জীবন আরও কঠিন। একেকটি ঘূর্ণিঝড় শুধু ঘরবাড়ি ভাঙে না, মানুষের স্বপ্নও ভেঙে দেয়। তারপরও তারা নদীর পাড়ে নতুন ঘর তোলে। কারণ মানুষ স্বভাবতই আশাবাদী। একজন দিনমজুর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে।
ঘরে ফিরে হয়তো সন্তানের জন্য এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে আসে। সেই মুহূর্তে সন্তানের হাসিই তার সুখ। এই ছোট ছোট সুখই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। বাংলাদেশের লাখো মানুষ জীবিকার তাগিদে বিদেশে যায়। বাইরে থেকে অনেকের জীবনকে চকচকে মনে হলেও বাস্তবে প্রবাসজীবন অসংখ্য ত্যাগ ও কষ্টের গল্প। প্রবাসীরা বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থাকে। সন্তানের জন্ম, বাবার মৃত্যু, মায়ের অসুস্থতাÑসব খবর তারা দূরদেশে বসে ফোনে শোনে। অনেকেই অপমান, অমানবিক শ্রম আর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটান। তবু তারা ভেঙে পড়েন না। কারণ তাদের বুকের ভেতরে একটি স্বপ্ন জ্বলেÑপরিবারকে ভালো রাখার স্বপ্ন। প্রবাসীর পাঠানো টাকায় গ্রামের ঘর ওঠে, সন্তানের পড়াশোনা হয়, পরিবারের মুখে হাসি ফোটে। সেই হাসিই তাদের দুঃখের ভেতরের সুখের আগুন। একসময় পরিবার ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
এখন সেই পরিবারেও দূরত্ব বাড়ছে। একই ঘরে থেকেও মানুষ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। বাবা মোবাইলে ব্যস্ত, সন্তান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, মা সংসারের চাপে ক্লান্ত। কথা কমছে, অনুভূতি কমছে, সম্পর্ক যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক পরিবারে অর্থ আছে, কিন্তু শান্তি নেই। সন্তানদের দামি স্কুলে পড়ানো হয়, কিন্তু তাদের সঙ্গে বসে গল্প করার সময় নেই। বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানদের জন্য জীবন কাটান, কিন্তু বার্ধক্যে এসে একাকিত্বে ভোগেন। এই সমাজে মানুষ ধীরে ধীরে আবেগ হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু সুখের মূল উপাদান তো সম্পর্ক। মানুষ টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতে পারে, কিন্তু মানসিক শান্তি কিনতে পারে না।
মানুষ বড় বাড়ি বানাতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার পরিবার তৈরি করতে পারে না। আজ পৃথিবীতে নীরব এক মহামারি ছড়িয়ে পড়েছেÑমানসিক অবসাদ।হতাশা, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আত্মহত্যার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। অনেক মানুষ বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমাদের সমাজ এখনো মানসিক কষ্টকে গুরুত্ব দিতে শেখেনি। কেউ যদি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়, সবাই সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু কেউ মানসিক কষ্টের কথা বললে তাকে দুর্বল ভাবা হয়।ফলে অনেক মানুষ নিজের ভেতরের যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখে। একসময় সেই যন্ত্রণা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আমাদের পরিবার, শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থায় এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহানুভূতির শিক্ষা।
একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষ দাঁড়ানো। শুধু বিচার না করে শোনা। শুধু উপদেশ না দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা।কারণ কখনো কখনো একটি আন্তরিক কথাই একজন মানুষকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। মানুষ সারাজীবন সুখ খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু সুখ কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নেই। সুখ কখনো সন্তানের প্রথম ডাক, কখনো মায়ের মুখের হাসি, কখনো প্রিয় মানুষের অপেক্ষা, কখনো বৃষ্টিভেজা বিকেল, কখনো দীর্ঘ কষ্টের পর পাওয়া সামান্য শান্তি। সুখের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলোÑএটি খুব ছোট ছোট জিনিসে লুকিয়ে থাকে। যে মানুষ ছোট ছোট আনন্দকে অনুভব করতে পারে, সে জীবনকে ভালোবাসতে পারে। আর যে মানুষ শুধু বড় সাফল্যের অপেক্ষায় থাকে, তার জীবনে অপূর্ণতা থেকেই যায়। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম ও দর্শনই মানুষকে ধৈর্য, আশা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। মানুষের ভেতরে যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও আশা আছে, সেটিই তাকে টিকিয়ে রাখে।
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির অভাব দেখা যাচ্ছে, তা হলো সহমর্মিতা। মানুষ এখন অন্যের কষ্ট দেখেও নির্লিপ্ত থাকতে শিখছে। দুর্ঘটনা ঘটলে সাহায্যের আগে ভিডিও করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল ও বিদ্রƒপ এখন বিনোদনের অংশ হয়ে গেছে। কারণ মানুষ যদি মানুষের পাশে না দাঁড়ায়, তবে সমাজ শুধু ইট-পাথরের কাঠামো হয়ে যাবে। একটি মানবিক সমাজ তৈরি করতে হলে পরিবার থেকেই শিক্ষা শুরু করতে হবে। সন্তানকে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, সহানুভূতি শেখাতে হবে। শুধু সফল হওয়ার শিক্ষা নয়, ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে।
বাংলার মানুষের জীবন সংগ্রামের। তবু এই বাংলায় ভাটিয়ালি আছে, বাউল গান আছে, কবিতা আছে। একজন জেলে নদীতে জাল ফেলতে ফেলতে গান গায়। একজন রিকশাচালক ক্লান্ত শরীর নিয়েও রেডিও শুনে হাসে। একজন গৃহবধূ সংসারের হাজার কষ্টের মাঝেও ঈদের সকালে সন্তানকে নতুন জামা পরিয়ে আনন্দ পান। এই আনন্দই মানুষের অদম্য শক্তি। মানুষ কাঁদে, কিন্তু পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। কারণ মানুষের ভেতরে সুখের একটি অমর আগুন আছে।
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ভয়ংকর এক মানসিক চাপে বড় হচ্ছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের সামনে সফলতার এমন মানদ- দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। চাকরি নেই, অনিশ্চয়তা আছে, সম্পর্কের স্থায়িত্ব কমেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় বাড়ছে। ফলে অনেক তরুণ হতাশ হয়ে পড়ছে। কিন্তু তরুণদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আশার ভাষা। তাদের বুঝতে হবে, জীবন শুধু প্রতিযোগিতা নয়। ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়।যে মানুষ পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, শেষ পর্যন্ত জয় তারই হয়।
দুঃখ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ তা এড়িয়ে যেতে পারে না। কিন্তু দুঃখ কখনো মানুষের সব আলো নিভিয়ে দিতে পারে না। কারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে সুখের যে আগুন জ্বলে, তা সহজে নিভে না। কখনো তা ক্ষীণ হয়, কখনো ঝড়ের মধ্যে কাঁপে, কিন্তু আবার জ্বলে ওঠে।
একজন মা সন্তানের মুখ দেখে বাঁচেন। একজন কৃষক নতুন ফসলের স্বপ্নে বাঁচেন। একজন প্রবাসী পরিবারের সুখের জন্য বাঁচেন। একজন প্রেমহারা মানুষও একদিন নতুন ভোরের অপেক্ষা করেন।
জীবন আসলে এই অপেক্ষার নাম। এই আশার নাম। অন্ধকার যত গভীর হোক, মানুষ তবু আলো খোঁজে। কারণ মানুষের ভেতরের সুখের আগুন কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না। আর যতদিন সেই আগুন জ্বলবে, ততদিন মানুষ কাঁদবে, হাসবে, ভাঙবে, আবার গড়বেÑতবু বেঁচে থাকবে।
লেখক: সংবাদকর্মী












