হারানো উৎসব, বদলে যাওয়া আশাশুনি
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: সাতক্ষীরা-বাংলার গ্রামীণ জনপদ একসময় ছিল উৎসব, ঐতিহ্য আর মানবিক বন্ধনের এক অপূর্ব মিলনস্থল। সেই চিরচেনা গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে দেখা যেত সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায়। নবান্নের আনন্দ, নৌকাবাইচের উল্লাস, যাত্রাপালার আবেগ কিংবা বৈশাখী মেলার প্রাণচাঞ্চল্য-সব মিলিয়ে এটি ছিল এক জীবন্ত সংস্কৃতির আধার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ সেই ঐতিহ্য যেন হারিয়ে যাওয়ার পথে। এক সময় আশাশুনির গ্রামগুলোতে অগ্রহায়ণ এলেই শুরু হতো নবান্নের উৎসব। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি হতো নানা রকম পিঠা-পুলি। বাড়ি বাড়ি চলত আদান-প্রদান, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত উৎসবের আমেজ। আনুলিয়া ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল গফুর (৭৫) স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে নবান্ন মানেই ছিল উৎসব। তিন-চার দিন ধরে পিঠা বানাতো বাড়ির মেয়েরা। এখন আর সেই পরিবেশ নেই, সব কিছুই ছোট হয়ে গেছে। বর্তমানে নবান্ন পালিত হলেও তা অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্বও কমে গেছে। বর্ষা মৌসুমে কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীতে বসত নৌকাবাইচের আসর। শত শত বৈঠার ছন্দে নদী মুখরিত হতো, দুই পাড়ে হাজারো দর্শকের ভিড় জমত। বুধহাটা এলাকার মাঝি হাশেম আলী (৬০) বলেন, “আগে বর্ষা মানেই নৌকা বাইচ। এখন নদীতে পানি নাই, আয়োজনও নেই। ছেলেপুলেরা আর আগ্রহ দেখায় না।” নদীর নাব্যতা সংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং আধুনিক বিনোদনের কারণে এই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তপ্রায়। শীতের রাত মানেই ছিল যাত্রাপালা। গ্রামের খোলা মাঠে বসত আসর, যেখানে মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা মগ্ন থাকত। একইভাবে পুঁথি পাঠ, বায়োস্কোপ, সাপ খেলা, লাঠিখেলা ছিল গ্রামীণ বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। বুধহাটার ব্যবসায়ী গৌতম ব্যানার্জী বলেন, আমরা ছোটবেলায় যাত্রা না দেখে শীত কাটাইনি। এখন বাচ্চারা মোবাইলেই ব্যস্ত, যাত্রা কী-তাই জানে না। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আশাশুনির বিভিন্ন স্থানে বসত বৈশাখী মেলা। হালখাতা, গ্রামীণ পণ্যের দোকান, লোকজ খেলাধুলা-সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি সার্বজনীন উৎসব। বড়দল বাজারের নিতাই চন্দ্র বলেন, আগের মেলায় মানুষের ভিড়, আনন্দ-সবই ছিল আলাদা। এখন মেলা হয় ঠিকই, কিন্তু সেই প্রাণটা আর নেই। বর্তমানে মেলাগুলো অনেকটাই বাণিজ্যিক হয়ে গেছে, হারিয়েছে ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের প্রসার মানুষের জীবনধারায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। সহজেই মানুষ বিদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে স্থান করে নিচ্ছে স্থানীয় সংস্কৃতির জায়গায়। আশাশুনির কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী রুবেল হোসেন বলেন, আমরা এখন অনলাইনে বেশি সময় কাটাই। গ্রামের পুরোনো খেলাধুলা বা উৎসবগুলো তেমন আকর্ষণ করে না। এই পরিবর্তন শুধু সংস্কৃতিতেই নয়, সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। আগে যেখানে উৎসব মানেই ছিল সম্মিলিত অংশগ্রহণ, এখন সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বেড়েছে। সংস্কৃতি রক্ষায় প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ। স্থানীয়ভাবে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম জোরদার করা এবং তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। আশাশুনি উপজেলা সাংস্কৃতিক কর্মী অসিম দত্ত বলেন, “আমরা যদি এখনই উদ্যোগ না নিই, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ে পড়ে এসব জানবে। বাস্তবে কিছুই থাকবে না।” সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়। আশাশুনির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য শুধু একটি অঞ্চলের ক্ষতি নয়, এটি পুরো বাঙালি জাতিসত্তার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি আমাদের শিকড়কে ধরে রাখতে হবে। আজ প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস-তবেই হয়তো আবার নবান্নের গন্ধে ভরে উঠবে গ্রাম, নদীতে ফিরবে নৌকাবাইচের ঢেউ, আর আশাশুনি ফিরে পাবে তার হারানো প্রাণ।









